শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ আর শিক্ষার্থী মিলিয়েই একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।ছাত্রহীন,শিক্ষকহীন একটা বিদ্যালয় আদৌ কল্পনা করা যায় না।শ্রেণিতে শিক্ষকের প্রবেশ,সমস্বরে অভিবাদন,কুশল বিনিময়; শিক্ষকের হাতে চক,পেন,হাজিরাখাতা,চকের ধূলোময়লা জমে যাওয়া ব্ল্যাকবোর্ডের নিচের অংশ,শ্রেণিতে সকলের পদধূলি -এগুলো ই শ্রেণিকক্ষের নিয়মিত দৃশ্য।কিন্তু শ্রেণিতে জমাট বাঁধা রক্ত, রক্তে-মাংসে গড়া শিক্ষক বুক ধরে পড়ে আছে শত ছাত্রের ভেতর! রক্তে ভিজে গেল শ্রেণি! আমরা এমনটা চিন্তাও করি না।অথচ,এমন ঘটনাই ঘটলো।গত শনিবার ভারতের (৬ জুলাই) আসামে ঘটলো এমন ঘটনা।টিভি চ্যানেল,দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় ও সামাজিক যোগাযোগে ঘটনাটি প্রকাশ পায়; এমন কি ভাইরালও হয়ে যায়।
আমরা একটু ঘটনার সূত্রপাত লক্ষ করি।শিক্ষক রাজেশ ওই ছাত্রকে (১৬) রসায়নে খারাপ পারফরম্যান্সের জন্য বকাঝকা করেছিলেন এবং তার বাবা-মাকে মিটিং এর জন্য স্কুলে আসতে বলেছিলেন। পরের দিন ওই শিক্ষার্থী ক্যাজুয়াল পোশাক পরে ক্লাসে আসে। শিক্ষক তাকে ক্লাস থেকে চলে যেতে বলেন। কিন্তু হঠাৎ করে ওই শিক্ষার্থী বেজাওয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ছুরি দিয়ে তাকে বারবার আঘাত করে।রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে কর্তব্যরত শিক্ষক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।চোখের পলকে একজন রসায়ন স্যার তাঁর জীবনের রসায়নে ব্যর্থ হয়ে পরলোকগত হলেন।নানা প্রশ্ন আসছে এ ব্যাপারে।কেমনে ইউনিফর্মহীন ছাত্র ক্লাসে আসলো,তার পকেটে কীভাবে চাকু আসলো এবং ছাত্র কেন এতটা রুক্ষ আর ক্ষিপ্ত হলো- এগুলোর ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই।
বাংলাদেশ এখন নানা ইস্যুতে সরগরম হয়ে উঠেছে।ভারত থেকে আসা বন্যার পানিতে ডুবে আছে বাংলার লন্ডনখ্যাত সিলেট আর উত্তরাঞ্চলের কয়েকটা জেলা।তার ভেতর বন্যার পানির চেয়েও মারাত্মক হয়ে আসলো শিক্ষক নিহতের ঘটনা।বাংলাদেশে এইচএসসি পরীক্ষা চলছে।পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীর নিকট গাঁজা পাওয়া গেল -কতটা নৈতিক অবক্ষয় হলে ছাত্রের মনুষ্য অধঃপতনের অতলতল দেশে পৌঁছে -তা আমরা কল্পনাও করতে পারবো না।নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে শিক্ষক আর ছাত্র আছে মহা বিপাকে।আমি কোটা আন্দোলন, পেনশন স্কিম, পিএসসি প্রশ্নপত্র ফাঁস, আবুল আর বেনজির নিয়ে কিছু বলবো না।আমি বলবো আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।
আমি তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি, কত বয়স ই বা হবে, বড় জোড় আট-নয়। বিজ্ঞান ক্লাস চলছিল আমার প্রিয় মোবারক স্যার ডাক নাম ফটু স্যার ক্লাস নিচ্ছিলেন। স্যার আমাদেরকে একটা প্রশ্ন দিলেন। আমি লিখে স্যারকে দেখিয়ে আমার সীটে বসলাম। স্যার তখনও ব্যস্ত অন্য ছাত্রদের খাতা দেখতে। হঠাৎ আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল শিষ ফোঁটার শব্দ। ব্যস, স্যার বললেন
–কে রে, কে শিষ ফোঁটালো,,,? আমি ভয়ে চুপ। পাশের জন ভয়েই বলে দিল। ব্যস, টেবিলের উপরে বেত ছিল, তিনি আমার কান ধরে মারতে শুরু করলেন। একটানা আঠারো মারলেন আমার বাম হাতের মাংসপেশির উপর। গায়ে সাদা হাফ শার্ট ছিল। কষ্ট পেয়েছিলাম তবে কাঁদিনি।
বাড়িতে ফিরে যখন শার্টটা না খুলেই খেতে বসি তখন মা বললেন,
–কী রে শার্ট খুললি না কেন,? শার্টটা খুলে ভাতটা খেতে বস,,,,
আমি ভয় ই করছিলাম। মা নিজের হাতেই শার্টটা খুলে দিলেন আর হঠাৎ চোখটা আমার হাতের দিকে দিয়ে বলল,
–কী রে, কী হইছে এখানে, স্যার মারছে, না,,,? কী করেছিস, বল কী করেছিস,,,,? এই বলে আরও দু’ চারটে মাইর দেওয়া শুরু করলো কিন্তু একবারও স্যারকে বকতে শুনিনি মায়ের কণ্ঠে। মা আমাকেই বকলেন,স্যারকে না। স্যার আজ আর পৃথিবীতে নেই কিন্তু স্যারের জন্য আজও মন থেকে দোয়া করি কারণ তাঁর জন্য আজও আমি আর শিষ দেইনি আমার মুখে। একটা বাজে অভ্যাস ত্যাগ করতে পেরেছি। এই হলো গুরুর হাতের বেতের শিক্ষা।
আর এখন আমি নিজেই শিক্ষক। কিন্তু কাউকে মারা তো দূরের কথা যদি বকাঝকা করি তবে অভিভাবক এসে বলে,
–আমার ছেলেকে বকছো কেন, তোমার বকা খাওয়ার জন্য আমার ছেলেকে পাঠাই নি, ও পারলে পারবে, না পারলে না পারবে, তুমি মারার কে,,,,,?
এই তো গেল অভিভাবকের কথা সাথে শিক্ষা অফিস বলে দেয় যে বেত নেওয়া যাবে না হাতে উপরন্ত স্কুল কমিটি তো সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। আমি, আমরা কী করবো শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবো যে আমার সোনার ছেলেরা কীভাবে ভুল পথে যায়,,,,।
একদিন এক অভিভাবককে বললাম,
;-,আপনার কয় ছেলে মেয়ে,,,?
–দুই ছেলে মেয়ে
–আচ্ছা, আপনি কখনো রাগ করে কখনো কাউকে বকা বা মাইর দেননি বা দেন না,,,,?
–হ্যাঁ দেই তো, দেব না কেন,,,? রোজ ই বকা দিতে হয়, না হলে তো কথা শোনে না।
তখন আমি তাকে বললাম
— দুইটা ছেলেকে মানুষমান করতে, দেখাশোনা করতে আপনার বকা দিতে হয় আর আমরা স্যাররা সাত থেকে আটশো ছেলে মেয়েকে রোজ ছয় ঘন্টা দেখি, বলেন তো এখানে কি একটুও বকা দিতে বা মাইর দিতে হয় না, বিবেচনা করে বলেন,,,? লোকটা চুপ থাকলেন কিছু বললেন না। আমি তাকে আরও বললাম,
— ধরুন, আপনার ছেলে একখণ্ড লোহদন্ডমাত্র। তাকে আপনি শিক্ষক নামক কর্মকারের কাছে দিয়েছেন। তিনি এই লোহাকে আগুনে পুঁড়িয়ে ছাঁচে হাতুরি দিয়ে যদি আঘাত না করে তবে কী করে সেই লোহখানা একটা উপকারি চাকু, দা, বটি বা প্রয়োজনীয় আসবাব হবে,,,,?
আমরা আপনার ছেলেকে বকি, শাসন করি শুধু ঐ ছেলেটাকে বা মেয়েটাকে সমাজ ও রাষ্ট্রের উপযোগী করে গড়ে তুলতে। ওর সাথে আমাদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নেই তো, এতটুকু তো বুঝেন, না কি,,,?
লোকটা কী বুঝলো, বুঝলাম না, শুধু কাছে ডেকে নিয়ে বললো,
–মাস্টার চা খাও আর ব্যাটাটাক একটু দেখ,,,,,,।
মনে রাখবেন, আপনার সন্তান, আমার আমানত। ও যদি ভালো কিছু তো আমরাই বেশি খুশি হবো আর ও যদি খারাপ কিছু করে আমরাও আপনার মত লজ্জা পাই,,,,,।
আমি শিক্ষক হতে পারবো না কারণ এতে অনেক যোগ্যতা লাগে তবে আমি তো আপনার ছেলের সেবক হতে পারি। আমি আজও ক্লাসে কোনোদিন বেত হাতে নিয়ে যাইনি, কাউকে পড়া না পারলে মাইর দেইনি তবে বিয়াদবি করলে তাকে প্রথমে নৈতিক শিক্ষামূলক কথা বলি না হলে বকা দিই আর এই শিক্ষা আমি পেয়েছি আমার প্রিয় প্রিন্সিপাল ম্যাডামের কাছ থেকে। তিনি কেউ ত্রুটি করলে শাসন করেন না বরং কাছে ডেকে বুঝান আর আমাকে বলেন,
–ভালোবাসা দিয়ে শাসন করতে হয় রে পাগলা,,,,,
তবে আমরাও তো মানুষ, মেজাজ সব সময় ঠিক থাকে না।তাই শাসনের অধিকার কেড়ে নিলে বিপদে আপনার সন্তান ই যাবে, ক্ষতিটা আপনার, আমার সবার,,,,,।বেতন নিয়ে শুধু মাসটা পার করার কোন ইচ্ছাই সবার থাকে না।
আদর, শাসন, বন্ধুত্ব, উপদেশ ও ভীতি= একজন শিক্ষক।
চারিদিকে নেশা, ফোনের ফাঁদ বিপদে আমরা সবাই। আসুন সন্তানদের খেয়াল রাখি আর শাসন ও ভালোবাসায় রাখি।অভিভাবক হতে পারলে আজ হয়তো রাজেস স্যারকে নিজের হাতে গড়া ছাত্রের হাতে জীবন দিতে হতো না। আমরাও আজ রাজেস স্যারের মতো জীবন নিয়ে ঝুঁকিতে আছি।তিনি মরে বেঁচে গেছেন আর আমরা বেঁচে মরে আছি। কে উদ্ধার করবে এই নৈতিক অবক্ষয়?
Leave a Reply