প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে সংবাদপত্র বিক্রেতা মিজানের জীবনসংগ্রাম

Reporter Name
    সময় : বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০২৬, ১২:২২ অপরাহ্ণ
  • ৫২৫ Time View

পার্বতীপুর (দিনাজপুর) থেকে ওসমান আলী :

বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হলেও সমাজ কিংবা পরিবারের বোঝা হয়ে না থেকে পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের জীবিকার পথ তৈরি করেছেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর পৌরসভার যুবক মোঃ মিজানুর রহমান (২৯)। সবার কাছে তিনি মিজান নামেই পরিচিত। প্রতিদিন সংবাদপত্র বিক্রি ও সরবরাহের কাজে ব্যস্ত থেকে তিনি প্রমাণ করে চলেছেন—প্রতিবন্ধকতা কখনো কর্মস্পৃহা ও আত্মবিশ্বাসের কাছে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশনখ্যাত পার্বতীপুর উপজেলা শহরের সংবাদপত্র পাঠকদের কাছে মিজান এক পরিচিত মুখ। হাতে সংবাদপত্র নিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছুটে চলা এই যুবকের জীবন যেন সংগ্রাম আর আত্মমর্যাদার এক অনন্য গল্প।

পার্বতীপুর উপজেলার পৌরসভাধীন ইসলামপুর (কালীবাড়ি) এলাকার বাসিন্দা মিজান বংশানুক্রমেই সংবাদপত্র বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। তার বাবা মরহুম আবুল হোসেন ছিলেন পার্বতীপুর শহরের একজন পরিচিত ও নামকরা সংবাদপত্র বিক্রেতা। দীর্ঘদিন সংবাদপত্র বিক্রি ও সরবরাহের মাধ্যমে তিনি পাঠকদের কাছে পরিচিতি লাভ করেছিলেন।

বাবার মৃত্যুর পরও পরিবারের সঙ্গে সংবাদপত্র ব্যবসার সেই সম্পর্ক অটুট রয়েছে। মিজানের বড় ভাই মোঃ মোস্তাকিন সরকার বর্তমানে একজন সংবাদপত্র এজেন্ট ও সাংবাদিক। তার এজেন্সির মাধ্যমে পার্বতীপুরের বিভিন্ন এলাকায় সংবাদপত্র সরবরাহ করা হয়। ছোট ভাই মিজানও তার সঙ্গে থেকে সংবাদপত্র সরবরাহের কাজে সহযোগিতা করেন এবং নিজ উদ্যোগে সংবাদপত্র বিক্রি করে আয় করেন।

তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে মিজান সবার ছোট। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কর্মবিমুখ নন। সামান্য সরকারি ভাতা পেলেও তার জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস সংবাদপত্র বিক্রি। অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ঘরে বসে থাকার পরিবর্তে তিনি নিজের শ্রম ও কর্মকে জীবনের অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

প্রতিদিনের পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি তিনি পরিবারের সদস্যদের কাছেও বোঝা হয়ে থাকেননি। বরং কর্মের মাধ্যমে তিনি সমাজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছেন—প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের করুণা নয়, প্রয়োজন সুযোগ, সহযোগিতা ও কর্মের পরিবেশ।

স্থানীয় সংবাদপত্র পাঠকদের কাছে মিজান অত্যন্ত পরিচিত। নিয়মিত সংবাদপত্র পৌঁছে দেওয়া ও বিক্রির মাধ্যমে তিনি পাঠকদের আস্থা অর্জন করেছেন। তার সততা, সরলতা ও কর্মনিষ্ঠার কথা অনেকেই প্রশংসার সঙ্গে উল্লেখ করেন।

মিজানের বড় ভাই, সংবাদপত্র এজেন্ট ও সাংবাদিক মোস্তাকিন সরকার বলেন, “আমার স্নেহের ছোট ভাই মিজান বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হলেও সে ঘরে বসে থাকে না। সংবাদপত্র সরবরাহের কাজে আমাকে সহযোগিতা করে এবং নিজেও সংবাদপত্র বিক্রি করে। সে অত্যন্ত সৎ ও ধর্মভীরু একজন যুবক।”

প্রতিবন্ধিতা যে জীবনের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারে না, তার বাস্তব উদাহরণ পার্বতীপুরের মিজান। শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি আত্মসম্মান, পরিশ্রম ও সততাকে পুঁজি করে জীবনের পথে এগিয়ে চলেছেন।

মিজানের মতো কর্মঠ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা গেলে তারা সমাজ ও দেশের উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন। মিজানের জীবনসংগ্রাম তাই শুধু একজন সংবাদপত্র বিক্রেতার গল্প নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, শ্রম ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার এক অনুপ্রেরণার গল্প।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com