সময়ের কথা :
মামুনার রশীদ :
‘ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও ত্যাগের মহিমায় পালিত হলো মুসলমানদের দ্বিতীয় প্রধান ধর্মীয় উৎসব ‘ঈদল-উল-আজহা’। সংবাদপত্রে এমন শিরোনাম আমরা দেখতেই পাবো। আজ বরং আমি অন্যকিছু নিয়ে লেখি। ঈদের আবহ শুরু থেকে শেষ অবধি চোখে দেখা, কানে শোনা আর আমার অনুভূতি দিয়ে বোঝা ছোট ছোট বিষয় নিয়েই আজকের লেখা।
মূল কথা অবতারণার পূর্বে একটি কবিতার কিছু চরণ উল্লেখ করি।কবিতাটি রচনা করেছেন চির বিদ্রোহীখ্যাত,মুসলমানদের প্রথম সাহসী কলমী সৈনিক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি তাঁর কোরবানি কবিতায় বলেন,
“ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !
দুর্বল! ভীরু ! চুপ রহো, ওহে খামখা ক্ষুব্ধ মন !
ধ্বনি উঠে রণি’ দূর বাণীর, –
আজিকার এ খুন কোরবানীর !
দুম্বা-শির রুম্-বাসীর
শহীদের শির সেরা আজি !- রহমান কি রুদ্র নন ?
ব্যাস ! চুপ খামোশ রোদন !
আজ শোর ওঠে জোর “খুন দে, জান দে , শির দে বৎস” শোন !
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !”
নজরুলের কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণায় ‘কোরবানি’ শিরোনামে কবিতা আছে। কোরবানি নজরুলের বিখ্যাত কবিতার একটি। কবিতার শুরুতেই কবি বলেছেন ‘ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যগ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন। কোরবানির ইদকে অনেকে অহেতুক হত্যাযজ্ঞ মনে করে। ইসলামবিরোধী অনেকে ঈদের পশু কোরবানিকে কেন্দ্র করে অনেক আপত্তিকর লেখার অবতারণা করেছেন। একটি উদাহরণও দেয়া যেতে পারে। তৎকালে তরিকুল আলম ডেপুটি ম্যাজিস্ট্র্রেট ছিলেন। তিনি ১৩২৭ শ্রাবণের ‘সবুজপত্র’ পত্রিকায় ‘আজ ঈদ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। সেই প্রবন্ধে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ এই আনন্দ উৎসবে আনন্দের চেয়ে বিষাদের ভাগই মনের ওপর চাপ দিচ্ছে বেশি করে। যেদিকে তাকাচ্ছি, সেদিকে কেবল নিষ্ঠুরতার অভিনয়। অতীত ও বর্তমানের ইতিহাস চোখের সামনে অগণিত জীবের রক্তে ভিজে লাল হয়ে দেখা দিচ্ছে। এই লাল রঙ আকাশে-বাতাসে চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে যেন সমস্ত প্রকৃতি তার রক্ত নেত্রের ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে পৃথিবী বিভীষিকা করে তুলেছে। প্রাণ একেবারে হাঁপিয়ে উঠছে।’
অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খান বলেন, ‘তরিকুল আলম বলে একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্র্রেট কোরবানির বর্বর যুগের চিহ্ন বলে একটি প্রবন্ধ লিখেন। এ প্রবন্ধ পড়ে নজরুলের কলম গর্জে উঠলো। নব্য তুর্কিরা তখন স্বাধীনতার জন্য অকাতরে জান কোরবান করছিল। সে ব্যাপারের সাথে মিলিয়ে তিনি লিখলেন, ‘ওরে হত্যা নয়, আজ সত্যগ্রহ শক্তির উদ্বোধন’। নজরুলের উল্লিখিত কাব্য লাইনটি তরিকুল আলমসহ এ ধরনের সব মানুষের উপযুক্ত জবাব’।
হজরত ইবরাহিম আ:কে আল্লাহর প্রিয় বস্তু কোরবানি করার হুকুম দিয়েছিলেন। আল্লাহর হুকুম মোতাবেক হজরত ইবরাহিম আ: তার প্রিয় বস্তু শিশুপুত্র হজরত ইসমাইল আ:কে কোরবানি করার জন্য স্থির করেন। কবি আল্লাহর হুকুমকে ‘কোরবানি’ কবিতায় ব্যক্ত করেছেন, ‘এই ইবরাহিম আজ কোরবানি করো শ্রেষ্ঠ পুত্রধন’ (তথ্যসূত্রঃ মুকুল কেশরী,দৈনিক নয়া দিগন্ত, ৩১জুলাই,২০২০)।
কোরবানিকে ঘিরে এমন অবুঝ প্রতিবাদ আজও আছে এবং থাকবে। আমি তো নজরুল নই যে প্রতিবাদ করবো; আমি বরং আমার দেখা আমাদের মুসলিম সমাজে এই ঈদকে ঘিরে যা দেখতে পেলাম তাই নিয়েই লেখি। মহান শ্রমিক দিবসে একটা শ্লোগান প্রায়ই শুনি,’ দুনিয়ার মজদুর এক হও এক হও’ আর কোরবানি ঈদ আসলে হয়তো গোরুরাও বলে,” দুনিয়ার গোরু এক হও, এক হও”। তারাও এক হয়, দলে দলে হাজির হয় হাটে কিন্তু তাদের অব্যক্ত কথা কেউ বোঝে না বরং সহস্র গোরু দু’টো করে শিং নিয়ে পিছনে মানুষের নির্যাতন সহ্য করে। নির্যাতন বললাম এই কারণে যে, হাটে গিয়ে দেখবেন গোরুর ক্রেতা বা দালালরা প্রথমেই গোরুর লেজে বা পাছায় হাত দেয়, আঘাত করে কিন্তু গোরু তেমন কিছু বলে না। গোরু সম্ভবত: আল্লাহর হুকুমে তাঁর বান্দার জন্য নিজেকে সহনশীল জাতি হিসেবে উপস্থাপন করে।
গোরু কেনা শেষ এখন গোরু নিয়ে ফেরার পালা।হেঁটে অথবা গাড়িতে যেভাবেই আসেন না কেন আপনাকে শুনতে হবে হাজার বার আর বলতেও হবে হাজারবার’ ভাই কত হলো? চাচা কত হলো?” বলতে বলতে আপনি ততটাই ক্লান্ত যতটা গোরু বিক্রি হওয়ার পূর্বে তার পিছনে আঘাত পেয়ে ক্লান্ত।মজার ব্যাপার হলো কেউ কিন্তু বলে না স্পষ্ট করে,’ ভাই বা চাচা গোরুটা কত হলো বা দাম কত হলো? বলে,’ কত হলো?’ এতেই বুঝে নিতে হয় আর বলতে বলতে আপনি ক্লান্ত। গোরু আর ক্রেতার এমন অবস্থা দেখে আমার মনে পড়ে যায় নারী কবিতার সেই বিখ্যাত চরণ,” যুগের ধর্ম এই,কেউকে পীড়া দিলে সে পীড়ন পীড়া দিবে তোমাকেই।’ গোরু হয়তো মনে মনে খুশি হয়।
এবার আসুন ফোন আলাপে। গোরু কেনার পরে থেকে ঈদের রাত্রি পর্যন্ত চলে,
–‘ ভাই, আপনি কী?’
–আমি গোরু। আপনি?
–আমি খাসী।
ভদ্রলোকরা খুব দ্রুত সংক্ষেপে সবকিছু বলতে গিয়ে নিজে কেউ গোরু হচ্ছেন,কেউ খাসী হচ্ছেন। বিস্তারিত বলতে থাকেন, তুলনা করে চিন্তা করতে থাকেন কে দামে ঠকলো, কে দামে জিতলো।কার গোরুর কালার কেমন,কত ওজন হবে ইত্যাদি চলে কথায় আর বার্তায়।চলে গোরুর ছবি আদান প্রদান; এমন কি ফেসবুকে গোরুর সাথে সেলফি দিয়ে উপরে ক্যাপশনে লেখে,’ আমি আর বাহাদুর,আমাদের গোরুর সাথে আমি’! রিএ্যাক্ট, মজা আর মন্তব্যের উপরে চলতে থাকে ত্যাগের মহিমায় মুসলমানদের ঈদ!
ঈদের দিনের নানাচিত্রের ভেতর কয়েকটা কমন ব্যাপার একটু লক্ষ্য করি। শহরে,নগরে সকালে গোসল আর পোশাকের নানা বৈচিত্র্য নিয়ে যখন আমরা পরিবারের সদস্য নিয়ে ঈদগাহ মাঠের উদ্দেশ্যে রওনা দিই, তখন বাহিরে গাছে বা অন্যকিছুর সাথে বেঁধে রাখা উৎসর্গিত গোরু বা ছাগলগুলোকে নিবিরভাবে লক্ষ্য করে আমরা বলি,’ এটা কে নিয়েছে! বাহ! বেশ হয়েছে! দাম কত? এর চেয়ে তো আমাদেরটা সুন্দর হয়েছে, আমরা জিতে গেছি” এই যে জিতে গেছি – এই মানসিকতাটা কখনোই কোরবানির মূল বার্তার সাথে যায় না। এটা মুসলিম সেন্টিমেন্ট হতে পারে না কিন্তু আমরা এসব থেকে বের হতে পারি না। ঈদের মাঠে পৌঁছে নামাজের পূর্বেই কিছু ছবি উঠালাম আর নামাজ শেষে নিজেদের পছন্দের উঁচুস্তরের মানুষের সাথে কোলাকুলি করে ছবি উঠিয়ে বাড়ি ফিরি! কী অবাক সৌন্দর্য! অথচ,ঈদ কেন্দ্রীয় যতগুলো আচার বা কার্য আছে তা আমাদের উৎসব নয় বরং ইবাদতের অংশ। ইবাদত যখন উৎসব আর আনন্দের অংশ হয় তখন তা অর্থপূর্ণ থাকে কি না -জানি না।
বিশাল গোরু,ছোট গোরু,দুর্বল গোরু -এমন অনেক কথাই সংবাদপত্রে আমরা পড়ি। কোরবানির পশুর কোনো বিশালতা বা ছোটত্ব থাকে না। যত বড় গোরু,তত বড় সওয়াব — এমন কথা কোথাও নেই।নামাজ শেষে যখন গোরু বা ছাগলকে জবাই করার পালা! তখনো আরেক আমেজ যেন মজার সব চিত্র শরতের শুভ্র মেঘের মতো মানুষের চোখে মুখে ধরা দেয়।হুট হাট কানে আসে,’ আরেহ! এই গোরু ধরতে এতজন লাগে! চল চল,সবাই চল, আমাদের গোরু এ মহল্লার সবচেয়ে বড়, অনেক লোক লাগবে।’
আলহামদুলিল্লাহ।গ্রামের মানুষ এ দিক থেকে ভালো। তাঁরা অভাব অনটনে কোরবানি দিক আর না দিক কোরবানির গোরু ধরতে তাঁরা ছুটে আসে,কাজে সাহায্য করে।গোরু জবাই চলে, রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হয় তখন হয়তো আমরা কেউ সেলফি তুলি,আর মুমিন মনে মনে জবাইকৃত গোরু জন্য আর কোরবানি আল্লাহ কবুল করবে কি না সে চিন্তায় মগ্ন থাকে।
সবচেয়ে ভয়ানক দৃশ্য হলো কোরবানির গোস্ত যখন কোনো অসহায় মানুষ আমাদের কাছে চাইতে আসে তখন তার থালায় এক টুকরো গোস্ত নিক্ষেপ করে দিলাম অথচ যে বন্ধু বা আত্মীয় বড় একটা কোরবানি দিয়েছে তার বাসায় বড় একটা পোটলা পাঠালাম। এতক্ষণ গ্রামের যে মানুষগুলো পাশে বসে কাজ করে দিল তাকে দিলাম মনপুত কিছু গোস্ত! কোরবানি কার কবুল হলো আর হলো না -তা জানি না তবে, এই যে দৃশ্য বা চিত্রপট আমরা দেখলাম তা কোরবানির নামে মানবতার প্রতি একটা কৌতুকই আমরা সৃষ্টি করেছি। এই হীনমন্যতার সংস্কৃতি ও উৎসবপ্রীতি থেকে বের হয়ে কোরবানির প্রকৃত মাহাত্ম ফুটে উঠুক। কারণ এটি সামাজিক বা রাজনৈতিক কোনো সংস্কৃতি না, এটি ধর্মীয় বিধান আর আল্লাহর হুকুমে ব্যক্তিগত রঙ লাগাতে নেই। আল্লাহ আমাদের ভুলগুলোকে মার্জনা করুন, আমাদের কোরবানি কবুল করুন – সে দোয়াই করি।
Leave a Reply