মামুনার রশীদ :
আর মাত্র কয়েকদিন।আসছে ১৭ জুন পবিত্র ঈদুল
আজহা।জিলহজ মাসের চাঁদ আকাশে।আস্তে আস্তে জমতে শুরু করেছে গরু-ছাগলের হাট,কেনাবেচা।কোরবানি উপলক্ষে হাটে যে গরু-ছাগল বিক্রি হয় তাকে প্রচলিত ভাষায় পশুর হাট বলে কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে পশুর হাট বলার বিপক্ষে।কারণ বিশিষ্ট সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় বলেন,’ বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’ আর আমি বলবো যেসব চার পা ওয়ালা আমাদের গৃহে লালিত-পালিত হয় আমাদের সেবায় ও ভালোবাসায়,সেগুলো পশু নয় বরং প্রাণি।এ কারণে পূর্বের পশুসম্পদ অধিদপ্তরের নাম পরিবর্তন করে এখন বলা হয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
গরু-ছাগলের হাটকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নানা অভিযোগ আসছে।গত ১১ জুন, ২০২৪ তারিখে বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় নওগাঁর গরু-ছাগলের হাটগুলো থেকে সরকার নির্ধারিত খাজনার বেশি আদায় করা হচ্ছে- মর্মে অনেক লেখালেখি হচ্ছে।এদিক থেকে বগুড়াবাসী আমাদের সম্মানিত জেলা প্রশাসক মহোদয়কে (মো. সাইফুল ইসলাম) একটা আন্তরিক অভিনন্দন জানাতেই পারি। বগুড়ায় আজ পর্যন্ত এমন অভিযোগ আসে নি কিন্তু তারপূর্বে ই তিনি হাট ইজারাদারদের এ ব্যাপারে সর্তক করেছেন।
বগুড়ায় গরু-ছাগলের হাটে(পশুর হাটে) অতিরিক্ত খাজনা আদায় করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারী দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম। রবিবার (৯ জুন) বেলা সাড়ে ১১ টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের করতোয়া হলরুমে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
এতে সভাপতিত্ব করেন বগুড়া জেলা প্রশাসক মো: সাইফুল ইসলাম।
সভার সভাপতি জেলা প্রশাসক বলেন, কোরবানি পশুর হাটে চাঁদাবাজি করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। পশুর হাটে বিশৃংখলা, জাল নোট ছড়ানো, যানজট মুক্ত থাকবে। এ ছাড়া পশুর জন্য নির্ধারিত হাসিলে বেশি গ্রহন বা অতিরিক্ত খাজনা নিলে সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী অফিসার ও ম্যাজিষ্ট্রেট কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুশিয়ারী দেন তিনি। আশা করি তাঁর কথার কথার প্রতি হাট কর্তপক্ষ সম্মান প্রদর্শন করবেন।
বগুড়ায় ছোট-বড় মোট হাট-বাজার আছে ২৪৩ টি।মোট গো-হাটি আছে ৮০ টি।এছাড়াও কিছু জায়গায় অস্থায়ী হিসেবে গরু-ছাগল বেচাকেনা হয়।বগুড়া জেলার মোট উপজেলা ১২ টি তন্মধ্যে সোনাতলায় গরু-ছাগলের হাট আছে ৭ টি,সারিয়াকান্দিতে ৫ টি,শিবগঞ্জে ১০ টি,আদমদিঘীতে ৬ টি,দুপচাঁচিয়াতে ৬ টি,কাহালু উপজেলায় আছে ৬ টি,নন্দীগ্রামে আছে ৮ টি,শেরপুরে আছে ৫ টি,ধনুটে আছে ৫ টি, সদরে আছে ৭ টি,গাবতলীতে আছে ১১ টি আর শাজাহানপুরে আছে ৪ টি।মানুষ তাদের প্রয়োজন মিটাতে বেচাকেনার জন্য এসব হাটে ক্রয়-বিক্রয় করতে আসে।বর্তমান সরকারকে,প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে,কৃষি মন্ত্রণালয়কে আমরা আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি যে কোরবানি উপলক্ষে আমাদেরকে আর প্রতিবেশি দেশের উপরে নির্ভর করতে হয় না।আমরা এখন গরু-ছাগল উৎপাদনে অনেকটা স্বাবলম্বী হয়েছি।২০২৩ সালের বগুড়া প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভাষামতে এখানে খামারির সংখ্যা প্রায় ৪৪ হাজারের উপরে।এছাড়াও,আগ্রহী প্রাণিপ্রেমীগণ বাড়িতে বাড়িতে গরু-ছাগল পালন শুরু করেছে।এর মাধ্যমে সহস্র বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে,বেকারত্ব দূর হয়েছে।কিন্তু সমস্যা হলো গো-খাবারের দাম নিত্যদিন বেড়ে যাচ্ছে তবু আশাবাদী খামারিগণ এই পেশাকে আগলে রেখেছে।সেখানে সারাবছর গরু-ছাগল লালন-পালন করে যদি তাদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় -তাহলে এ খামার একদিন ধ্বংসের মুখে পড়বে।
গরু-ছাগল বেচাকেনার উদ্দেশ্য নিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তায় অনেক চাঁদাবাজি হয়।পদে পদে তাদেরকে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।হাটে গিয়ে দেখা যায় সরকার নির্ধারিত খাজনার চেয়ে বেশি আদায় করা হয়।ক্রেতার থেকেও টাকা নেওয়া হয় আবার বিক্রেতাকেও বাধ্য করা হয়।যা রীতিমতো নিয়ম বিরুদ্ধ।এছাড়াও আছে,জাল টাকার ভয়, হয়রানি, পকেটমার আর রাস্তায় ছিনতাই।সব মিলিয়ে হাটে আসে ক্রেতা-বিক্রেতাগণ একটা সমস্যা ও শঙ্কার ভেতর থাকে।ক্রেতা আর বিক্রেতাগণের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং হাটে নৈরাজ্যের পরিবেশ নির্মূল করতে হবে।আমি আবারও বগুড়ার জেলা প্রশাসক মহোদয়কে ধন্যবাদ জানাবো যে তিনি বিষয়টি আগেই অনুধাবন করে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে।
দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতাবিক্রেতাগণ আসে – তাদেরকে নিরাপত্তা দেওয়া এবং তাদের সাথে জুলুম না করা হবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।পশু ক্রয় করতে বা বিক্রয় করতে এসে যেন কেউ পশুত্বের শিকার না হয় – এদিকে হাট কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর দেওয়া উচিত।একটা গরু সারাবছর লালন-পালন করে হয়তো খুব বেশি লাভবান কেউ হয় না সেক্ষেত্রে যদি সে প্রতারক চক্রের দ্বারা প্রতারিত হয়,জাল টাকা পায় কিম্বা তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা উশুল করা হয় তবে তা আত্মঘাতীর শামিল।সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের মতে,’ বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে” বন্যের চার পা ওয়ালা পশু,আশা করি মানব পশুর প্রতারণার শিকার হওয়া থেকে আমাদের ক্রেতা-বিক্রেতাগণ রক্ষা পাবেন।
প্রতি বছর কোরবানি আসে আর আমরা মুসলিম সমাজ ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হই।আমরা আমাদের সাধ্যের ভেতর থেকে মহান রবকে খুশি করার চেষ্টা করি।আর গরু-ছাগল পালনকারীরা আমাদের সেই ত্যাগের মহিমায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে।একজন কৃষককে,একজন খামারিকে সামাজিক নিরাপত্তার মাধ্যমে তাদের পাশে থাকলে হয়তো আমাদের কৃষির উন্নতি,আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি; সর্বোপরি কথা আমাদের বেকারত্ব দূর হবে এবং কর্ম সংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।সার্বিক দিক বিবেচনা করে আমরা আশা করি কোরবানি উপলক্ষে সকল হাটে নৈরাজ্যের পরিবেশ থাকবে না।হাট থেকে শুধু গরু-ছাগল পালনকারীরাই লাভবান হয় না বরং এটা আমাদের রাজস্বখাতের আয়ের অন্যতম উৎস।
আশার কথা হলো গত ৬ জুন ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় সংসদে মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী নতুন যে বাজেট প্রস্তাব করেন সেখানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ৪ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা।আশা করি আমার খামারিরা এই বাজেট থেকে লাভবান হবে এবং গরু-ছাগল (পশু-পালন) উৎসাহিত হবেন। জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তৃণমূলকে গুরুত্ব দিতে হবে। সোনার বাংলাদেশের, ডিজিটাল বাংলাদেশের জনগণ ই হোক সোনার খনি।
Leave a Reply