কুর’আন অনুধাবনের এপ্রোচ

বাপ্পা আজিজুল :
    সময় : শুক্রবার, মে ২৪, ২০২৪, ১:২৮ অপরাহ্ণ
  • ৩৯৯ Time View

ভূমিকা
কুর’আন অনুধাবনের জন্য দুটি বিষয় খুব জরুরী।

এক. উন্মুক্ত মস্তিষ্কে কুর’আন বুঝার চেষ্টা করা। অর্থাৎ কোন প্রিজুডিস থাকা যাবে না। অন্তরে মোহর বা তালা থাকা যাবে না (আবুল আ’লা, তাফহিমুল কুর’আনের ভূমিকা)।

দুই. কুর’আন, হাদিস, সিরাত সরাসরি অধ্যয়ন করা (নঈম সিদ্দিকী, চরিত্র গঠনের মৌলিক উপাদান)। সরাসরি অধ্যয়নের দুটি দিক- a. সংশ্লিষ্ট ভাষা অর্থাৎ আরবিতে অধ্যয়ন করা। b. উৎসের কাছাকাছি গিয়ে অধ্যয়ন করা। অর্থাৎ কুর’আন নাযিলের সময়ের যত কাছাকাছি সময়ে যাওয়া যাবে তত অথেনটিক সোর্স। বিশেষ করে গত ২শ বছরে লিখিত কিতাবসমূহ বিভিন্ন মতবাদ, ফিরকা দ্বারা প্রভাবিত।

মূলভাগ
কুর’আনের তাযাক্কুর ও তাদাব্বুরের হক আদায়ের জন্য বিভিন্ন রকম এপ্রোচ হতে পারে-
১. একদম বিগেনার যারা তাদের ক্ষেত্রে-
– তাফহিমুল কুর’আন বিগেনারদের জন্য সবচেয়ে সহজ ও উপযুক্ত তাফসির। প্রথমে তাফহিম থেকে কমপক্ষে ৫ আয়াত কিংবা ১ রুকু তিলাওয়াত করুন।
– শব্দে শব্দে আল কুর’আন/শব্দার্থে আল কুর’আন যেকোন একটি থেকে প্রতিটি শব্দ বাই শব্দ অর্থ জেনে নিন।
– আবার তাফহিমে ব্যাক করুন। তাফহিমের বাংলা অর্থ পড়ুন। এরপর টীকা পড়ে নিন।
– পড়ুন। নোট করুন। চিন্তা করুন। সময় নিন। তাড়াহুড়া করার দরকার নাই। হযরত উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর প্রমুখ সাহাবিদের সূরা বাকারা শেষ করতে ৮-১০ বছর সময় লেগেছিল।
– কুর’আন বুঝার জন্য সিহাহ সিত্তাহগুলোর হাদিস ও সিরাত চোখের সামনে রাখুন।

২. যারা প্রাথমিক ধাপ পেরিয়ে এসেছেন অর্থাৎ একবার তাফহিম খতম দিয়েছেন। কুর’আনের আলোকে আন্দোলনের গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন, তারা এখন জ্ঞানার্জনের দিকে মনোনিয়োগ করুন-
– ২য় তাফসির হিসেবে প্রধান ও প্রথম চয়েস অবশ্যই ইবনে কাসির। রুহানি খোরাক মিলবে। অনেকেই ফি যিলালিল কুর’আনকে বেছে নেন। এতে আপনার সময় ক্ষেপন হবে বেশি, ইনপুট কম হবে। কেননা তাফহিমের মতো একই স্পিরিটের তাফসির। তবে এতে কুর’আনের সাহিত্য সৌন্দর্য, আধুনিক কিছু ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে।
– সেকেন্ড লাইন চয়েস হিসেবে মা’আরিফুল কুর’আন নিতে পারেন। উপমহাদেশীয় প্রেক্ষিতে এর গুরুত্ব আছে। তাবলীগের লোকজন একে বেশি ফলো করে। এতে ইবনে কাসির ও কাজী সানাউল্লাহ পানিপথীর ‘রুহুল মা’আনি’ থেকে বেশি কোট করা হয়েছে। সৌদি প্রিন্টের সংক্ষিপ্তটি নয়, ইফা প্রকাশিত ৮ খন্ডেরটি পাঠ্যতালিকায় নিতে পারেন।

৩. যারা এডভান্সড লার্নার, তাদের ক্ষেত্রে-
– কুর’আনের একটি আয়াতের মাল্টিফ্যাসেট মিনিং থাকে। একটা তাফসির এট এ টাইম একটি আয়াতকে বুঝতে সাফিসিয়েন্ট না। তাই কুর’আনকে মোটামুটি অনুধাবনের জন্য কমপক্ষে ৪/৫ টি তাফসির ফলো করা দরকার।
– একটি আয়াত/রুকু/সূরা পড়ে ৪/৫টি তাফসিরে কি ব্যাখ্যা আছে তা জেনে নিতে হবে। অনেক কমন বিষয় থাকলেও বেশকিছু ডিফরেন্ট অপিনিয়ন পাওয়া যায়। এতে করে পাঠকের নিজস্ব ইনসাইট তৈরি হয়।
– এরকম ৪/৫ টি তাফসির নিতে গেলে কোনটা কোনটা রাখবেন? Category-A: তাফসিরে ইবনে আব্বাস/তাবারী/ইবনে কাসির/কুরতুবি/আহকামুল কুর’আন আল জাসসাস। ক্যাটাগরি-এ থেকে যেকোন ১/২টি রাখুন। সবগুলো পিডিএফ আছে।
– Category- B: তাফহিম/ফি যিলালিল কুর’আন। এক্ষেত্রে তাফহিম রাখাই ভালো।
– Category-C: মা’আরিফুল কুর’আন/রুহুল মা’আনি/জালালাইন/তাওযীহুল কুর’আন প্রভৃতি একই ক্যাটাগরির। কওমি ও সফট সুফি টাচের। কেউ যদি সুফি ধাঁচের আরও ডিপ তাফসির পড়তে চান তাহলে তাফসিরে লাতাইফ, তসতুরি, তাফসিরে সানাই ইত্যাদি পড়তে পারেন। অথবা সালাফিদের তাফসিরে জাকারিয়া, ড. গালিবের তাফসির নিতে পারেন পাঠ্যতালিকায়।
– Category D: The message of Quran/Scientific indication in the holy Quran. মেসেজ অব কুর’আন আল্লামা আসাদের অনবদ্য সৃষ্টি। শর্ট কিন্তু ইনফরমেটিভ। আল কুর’আনে বিজ্ঞান, ইফাবা থেকে প্রকাশিত বাংলা/ইংরেজি দুটোই আছে। ইংরেজিটাই ভালো। বাংলা অনুবাদ ভালো হয়নি। এতে বিজ্ঞানভিত্তিক তাফসির পাওয়া যাবে।

সাহাবিদের এপ্রোচ অনেকটা এরকম ছিল। তাঁরা ১ টি আয়াত পড়তেন। সেটি নিয়ে এভেইলেবল সকল তথ্য-উপাত্ত, হাদিস সংগ্রহ করতেন বা জেনে নিতেন। চিন্তা-ভাবনা করতেন। সেটির শিক্ষা অনুযায়ী আমল করতেন। তারপর অন্য একটি আয়াত পড়তেন।

৪. যারা কুর’আন নিয়ে গবেষণা করতে চান, কুর’আন পড়ে ডোপামিন নিতে চান-
– ৩ নং এপ্রোচ +
– তাদাব্বুরে কুর’আন তাফসির হাতে নিন। পৃথিবীতে ২ ধরনের তাফসির পদ্ধতি আছে। একটা হল চিরায়ত। যেটা উপরে উল্লিখিত সব তাফসির ফলো করেছে। ২য় হল নাজম-আল-কুর’আন পদ্ধতি। যা তাদাব্বুরে কুর’আন অর্থাৎ আল্লামা আমিন আহসান ইসলাহী, তাঁর উস্তাদ ইমাম ফারাহি, আল্লামা শিবলি নুমানি, ডা. ইসরার আহমেদ প্রমুখ ফলো করেছেন। তাদাব্বুর আপনার কুর’আনের বুঝ ও চিন্তাকে নাড়া দেবে,পালটে দেবে। আপনি কুর’আনকে নতুন চোখে নতুন করে ভাবতে শিখবেন। মজা পাবেন কারণ প্রচুর ডোপামিন রিলিজ হবে।

৫. ইন্টিগ্রেটেড এপ্রোচ
– আপনার এখন কুর’আনের তাফসির নিয়ে বেশ জানাশোনা। আপনি ইন্টিগ্রেশন করুন। একটি টপিক, আয়াত বা শব্দ নিয়ে পুরো কুর’আন সার্চ করুন। সিমিলারিটিজ/ডিসিমিলারিটিজ খুঁজুন।
– উল্লিখিত টপিক/আয়াত বা শব্দ নিয়ে কোন তাফসির কী বলেছে, অন্তত ৮/১০ টা তাফসির পড়ে নিন।
– যেমন, কারা ক্ষতিগ্রস্ত বা খসিরুন এর অন্তর্ভুক্ত তা নিয়ে কুর’আনে যতগুলো আয়াত আছে, সেগুলো সব তাফসির থেকে পড়ুন। নোট নিন। অনুরূপ আল্লাহ কাদের ভালোবাসেন, মুমিনদের উল্লেখ করে পুরো কুর’আনে কি বলেছেন ইত্যাদি।

৬. রুট মেথড/ব্যাকরণ/অলংকার বুঝা
– এপ্রোচ ৫ কমপ্লিট করলে আপনি অটোমেটিক কুর’আনের ম্যাক্সিমাম শব্দের অর্থ, ফরমেট বুঝে যাবেন। এখানে এসে আরবি ব্যাকরণ শিখে নিতে হবে। আরও আগে শিখলে আরও ভালো। তবে মাদ্রাসার জটিলতর সিস্টেমে না পড়েও ব্যাকরণ শেখা যাবে। আরবি শব্দ এত মজার, বহু অর্থবোধক তা কেবল ধাতু শিখলে জানতে পারবেন। যেকোন আয়াতের যে চাবি শব্দ থাকবে সেগুলোর রুট ও প্রয়োগ জানলে আপনি একই আয়াতের অনেক মিনিং করতে পারবেন। আল্লাহ তায়ালা চাইলে এর মাধ্যমে আপনি কুর’আনের পথে কয়েক ধাপ অগ্রসর হতে পারবেন।

যবনিকা
এরপরের এপ্রোচগুলো আরও স্কলারলি হবে। উপরে বর্ণিত এপ্রোচসমূহ খুব একটা কঠিন নয়। একটু পরিকল্পনা করে সময় নিয়ে আগালে খুবই সহজ। আমরা আন্দোলনের কর্মিরা বছরের পর বছর কেবল তাফহিমের গণ্ডির মধ্যে আটকে আছি। অথচ কুর’আন নিয়ে কত কী জানার, বুঝার বাকি আছে! একটি এপ্রোচে ৩-৫ বছর সময় দিলে ১৮-৩০ বছরে কুর’আন অনুধাবন নিয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন সম্ভব। আমাদের আন্দোলনের সাথে যুক্ত হওয়ার বয়স অনেকেরই ২০/৩০/৪০ হয়ে গেছে কিন্তু আমরা কুর’আন নিয়ে এখনও মক্তব লেভেলে পড়ে আছি। আল্লাহ আমাদের জন্য কুর’আন বুঝা সহজ করে দিন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com