এফ শাহজাহান :
বিশ্বজুড়ে যখন ইসরায়েলকে বয়কটের ডাক, তখন ইসরাইলের প্রতি ভারতের সমর্থনকে ‘পাগলাটে ভালোবাসা’ বললেন নেতানিয়াহু । গত ২৯ মে শুক্রবার এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলের বর্তমান কূটনৈতিক সংকটের কথা স্বীকার করে ভারতের সঙ্গে তাদের গভীর ও উষ্ণ সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আনেন।
নেতানিয়াহু বলেন, “বিশ্বের বহু অংশে আমরা আজ বৈধতা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি,কিন্তু ভারতে এমনটা মোটেও ঘটছে না। ভারতের মতো একটি বিশাল শক্তির সাথে আমাদের অত্যন্ত অনন্য ও বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। সেখানে ইসরায়েলের প্রতি মানুষের এক অভূতপূর্ব ও পাগলাটে ভালোবাসা রয়েছে, সত্যিই দারুণ এক ভালোবাসা।”
নেতানিয়াহুর এই মন্তব্যটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে, তা হলো ভারতের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কেন ইসরাইলের প্রতি এতটা সহানুভূতিশীল, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ? গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যেখানে যুদ্ধবাজ,গণ.হত্যাকারী ইসরাইলকে ঘৃণা করে, সেখানে ভারতের লোকজন ইসরাইলকে পাগলের মতো ভালোবাসে কেনো ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল বর্তমান রাজনীতি নয়, বরং ইতিহাস, জাতীয়তাবাদ, নিরাপত্তা, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ধর্মীয় পরিচয়, প্রযুক্তিগত সাফল্য এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের মতো নানা বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
ভারতের সব নাগরিক যে ইসরাইলকে সমর্থন করেন, তা নয়। বরং ভারতীয় সমাজে এ নিয়ে উল্লেখযোগ্য মতভেদ রয়েছে। তবুও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে গত দুই দশকে ভারতের জনপরিসরে ইসরাইলের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। সেটা হলো : ফিলিস্তিনপন্থা থেকে ইসরাইল-ঘনিষ্ঠতা।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ভারত ফিলিস্তিনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছে। জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী এবং পরবর্তী কংগ্রেস সরকারগুলো মূলত আরবপন্থী অবস্থান বজায় রেখেছিল।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের আদর্শ ঔপনিবেশিকবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান। আরব বিশ্বের সঙ্গে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক। ভারতের বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক গুরুত্ব।
তবে ১৯৯২ সালে প্রধানমন্ত্রী পি. ভি. নরসিমা রাওয়ের সরকার ইসরাইলের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতা ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে পরিবর্তন করতে শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে দুই দেশের সম্পর্ক গভীর হতে থাকে।
আজ ভারত ও ইসরাইলের সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক নয়; এটি প্রতিরক্ষা, কৃষি, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো বহু ক্ষেত্রে বিস্তৃত। ভারতের লোকজন ইসরাইলকে পাগলের মতো ভালোবাসার অনেকগুলো কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১০টি কারণ নিচে আলোচনা করা হয়েছে।
প্রথমমত : মুসলিম নি.ধন
বিশ্বব্যাপি মুসলিম নিধ.নে এখন সবচেয়ে আগ্রাসী ভূমিকা পালন করছে ইস.রাইল। অন্যদিকে ভারতও তাদের ভূখন্ডে মুসলিম নিধ.নে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইসরাইল এবং ভারতের এক ও অভিন্ন শত্রু মুসলমানরা। এই দুই দেশই মুসলিম নিধ.নে বদ্ধ পরিকর। ইসরাইল যেমন মুসলিম নিধ.নের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে অব্রাহাম অ্যাকোর্ড অনুযায়ী বৃহত্তর ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়,ভারতও তেমনি উপমহাদেশে মুসলিম নিধ.নের মাধ্যমে অখন্ড ভারতে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। একারণেই ভারতের লোকেরা বিশেষ করে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ইসরাইলকে পাগলের মতো ভালোবাসে।
এ ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনের একটি বর্ণনার সত্যতা প্রমানিত হচ্ছে। পবিত্র কুরআনে সূরা আল-মায়িদার ৫২ নং আয়াতে আল্লাহ সুস্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, অবশ্যই আপনি ঈমানদারদের সাথে শত্রুতার ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে ইহুদি এবং মুশরিকদেরকেই সবচেয়ে কঠোর পাবেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বয়ান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীরের সশস্ত্র আন্দোলন এবং সীমান্তপারের জঙ্গিবাদকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে ইসরাইল হামাস, ইসলামিক জিহাদ এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামকে সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ওয়াল্টার রাসেল মিড একবার লিখেছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই নিজেদের নিরাপত্তা নীতিকে নৈতিক বৈধতা দিতে “সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ” ধারণা ব্যবহার করে।
ভারতের অনেক নাগরিক এই অভিন্ন বয়ানের মধ্যে নিজেদের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখতে পান। ফলে ইসরাইলকে তারা কেবল একটি বিদেশি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একই ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা একটি অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
দ্বিতীয়ত : হিন্দুত্ববাদ ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ক্রিস্টোফ জ্যাফ্রেলটসহ অনেক গবেষক উল্লেখ করেছেন যে, বিজেপির উত্থানের পর ভারতীয় জাতীয়তাবাদের চরিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক বয়ান অনেক ক্ষেত্রে ইসরাইলকে একটি সফল জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে।
জায়নবাদ এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদ সম্পূর্ণ অভিন্ন মতাদর্শ নয়। তাদের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তবে উভয়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে রাখার প্রবণতা রয়েছে বলে অনেক গবেষক মত দেন। এই কারণে ভারতের ডানপন্থী রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে ইসরাইলকে প্রায়ই একটি আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
তৃতীয়ত : শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রতি আকর্ষণ
নরেন্দ্র মোদি এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু,উভয়েই নিজেদেরকে শক্তিশালী, সিদ্ধান্তমূলক এবং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগের যুগে ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই মোদি ও নেতানিয়াহুর যৌথ ছবি, বক্তব্য এবং কূটনৈতিক সাক্ষাৎ ব্যাপক প্রচার পায়।
ফলে অনেক ভারতীয় নাগরিকের কাছে নেতানিয়াহু এমন একজন নেতা, যিনি দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে আপসহীন। এবং নেতানিয়াহু যেমন মুসলিম নিধনে আপসহীন,তেমনি মোদীও। একারণেই ভারতের উগ্র হিন্দুত্বাদীরা ইসরাইলকে পাগলের মতো ভালোবাসে।
চতুর্থত : সামরিক শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীগুলোর একটি ইসরাইলের। মাত্র প্রায় এক কোটিরও কম জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইসরাইল উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। আয়রন ডেম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা,আ্ররো মিসাইল সিস্টেম, উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি,সাইবার যুদ্ধ সক্ষমতা এবং বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। ভারতের অনেক নাগরিক ইসরাইলকে “শক্তির মাধ্যমে টিকে থাকা রাষ্ট্র” হিসেবে দেখেন। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই ভাবমূর্তি অত্যন্ত জনপ্রিয়। একারণেও তারা ইসরাইলকে পাগলের মতো ভালোবাসে।
পঞ্চমত : ভারত-ইসরাইল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা
বর্তমানে ভারত ইসরাইলি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির অন্যতম বড় ক্রেতা। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসআইপিআরআই-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত দুই দশকে ভারত ইসরাইলি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে। ভারত যেসব ক্ষেত্রে ইসরাইলের সঙ্গে কাজ করছে- ড্রোন; রাডার; আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা; নজরদারি প্রযুক্তি; ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।
কারগিল যুদ্ধের সময় ইসরাইল ভারতের জন্য জরুরি সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছিল,এই বিষয়টি ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ইসরাইল সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।
ষষ্ঠত: প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের বিস্ময়
বিশ্ব অর্থনীতিতে ইসরাইলকে প্রায়ই “স্টার্টআপ ন্যাশন” বলা হয়। জনসংখ্যার তুলনায় বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয়; প্রযুক্তি স্টার্টআপের ঘনত্বে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি; কৃষি প্রযুক্তি ও পানি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বনেতৃত্ব; সাইবার নিরাপত্তা খাতে অসাধারণ অগ্রগতি।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল পোর্টার একবার বলেছিলেন, ইসরাইলের উদ্ভাবনী অর্থনীতি প্রমাণ করে যে প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, মানবসম্পদই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। ভারতের তরুণ প্রযুক্তিপ্রেমী জনগোষ্ঠীর কাছে এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি মডেল।
সপ্তমত: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমিক প্রভাব
বর্তমান যুগে জনমত তৈরির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে যে ফেসবুক, এক্স, ইউটিউব এবং ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদম প্রায়ই আবেগপ্রবণ ও সংঘাতকেন্দ্রিক কনটেন্টকে বেশি প্রচার করে।
ফলে গাজা যুদ্ধ বা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে একপাক্ষিক তথ্য অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ভারতীয় ব্যবহারকারী এমন তথ্যপরিবেশে অবস্থান করেন যেখানে ইসরাইলকে নিরাপত্তার রক্ষক এবং প্রতিপক্ষকে শুধুমাত্র সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবতা অবশ্য অনেক বেশি জটিল। তবুও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো ইসরাইলপ্রীতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
অষ্টমত: মুসলিম বিশ্বের প্রতি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।অনেক ক্ষেত্রে ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাতকে মানবাধিকার, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব কিংবা আন্তর্জাতিক আইন দিয়ে নয়, বরং ধর্মীয় পরিচয়ের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়। এই প্রবণতা বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি দেখা যায়।ফলে কিছু জনগোষ্ঠীর কাছে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন এক ধরনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
নবমমত: গণমাধ্যমে ইসরাইলের সফল ব্র্যান্ডিং
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ জোসেফ নাই ‘সফট পাওয়ার’ ধারণাটি জনপ্রিয় করেন।সফট পাওয়ার বলতে বোঝায় এমন প্রভাব, যা সামরিক শক্তি নয় বরং আকর্ষণ, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং ভাবমূর্তির মাধ্যমে অর্জিত হয়। ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত জনসংযোগে বিনিয়োগ করেছে। বিশ্বের বহু গণমাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের গল্প ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেও প্রায়ই ইসরাইলের সামরিক অভিযান, গোয়েন্দা দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত সাফল্যকে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়।ফলে ইসরাইলের একটি শক্তিশালী ইতিবাচক ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি হয়েছে। একারণেই মুসলিম বিদ্বেষী ভারতীয়রা ইসরাইলে পাগলের মতো রভালোবাসছে।
দশমত: মোদি-নেতানিয়াহু যুগের কূটনৈতিক রসায়ন
২০১৭ সালে নরেন্দ্র মোদির ইসরাইল সফর ছিল ঐতিহাসিক।এটি ছিল কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ইসরাইল সফর। পরবর্তীতে নেতানিয়াহুও ভারত সফর করেন। দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে প্রায়ই দেখা গেছে যে রাষ্ট্রনেতাদের ব্যক্তিগত রসায়ন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। মোদি-নেতানিয়াহু সম্পর্কও তার ব্যতিক্রম নয়।
তবে ভারতের বহু শিক্ষাবিদ, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক দল ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেয়। দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা, হায়দরাবাদসহ বিভিন্ন শহরে ফিলিস্তিন সংহতি কর্মসূচিও দেখা গেছে। অতএব, ভারতের জনমত একমুখী নয়; বরং বহুমাত্রিক। শুধু উগ্র হিন্দুত্ববাদীরাই মুসলিম বিরোধী অবস্থানের কারণে ইসরাইলকে অন্ধভাবে ভালোবাসে।
আবেগের পেছনে রয়েছে বাস্তব রাজনীতি
নেতানিয়াহুর মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় শোনালেও এর পেছনে কিছু বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। ভারতের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী কেন ইসরাইলকে সমর্থন করে, তার কারণ কেবল ধর্মীয় নয়, কেবল রাজনৈতিকও নয়। এর পেছনে রয়েছে নিরাপত্তা উদ্বেগ, জাতীয়তাবাদী রাজনীতি,প্রযুক্তিগত মুগ্ধতা,সামরিক সক্ষমতার প্রতি শ্রদ্ধা,সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব,কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা।
তবে একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগৎ সাদা-কালো নয়। ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগ যেমন বাস্তব, তেমনি ফিলিস্তিনি জনগণের রাষ্ট্রীয় অধিকার, মানবিক নিরাপত্তা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিও আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সুতরাং ভারতের ইসরাইলপ্রীতিকে যদি বুঝতে হয়, তাহলে সেটিকে কেবল আবেগের বিষয় হিসেবে নয়, বরং ২১শ শতকের জাতীয়তাবাদ, নিরাপত্তা রাজনীতি, প্রযুক্তিগত আধুনিকতা এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সম্মিলিত ফল হিসেবে দেখতে হবে। নেতানিয়াহুর মন্তব্য সেই বাস্তবতারই একটি রাজনৈতিক প্রতিফলন, যার শিকড় ভারত-ইসরাইল সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার মধ্যে নিহিত।
Leave a Reply