‘মীরের মিরাকল’ এবং পরিবারতান্ত্রিক দাসত্বের ঢেঁকিকলে ফেঁসে যাওয়া জাতির ভবিষ্যত

Reporter Name
    সময় : বৃহস্পতিবার, জুন ১৮, ২০২৬, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ
  • ১০৩ Time View
এফ শাহজাহান : 
‘শাহেনশাহ মীর শাহে আলম’ যে কাজটা করেছেন সেটাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এজন্য আরেকবার জাতীয় সংসদে সমস্বরে ‘শাহেনশাহকে’ বাহবা দেওয়া উচিত। তবে এবার বসে থেকে শুধু টেবিল চাপড়ে নয়, এমপিগণ ‘শাহেনশাহ মীর শাহে আলমের সম্মানার্থে একযোগে দাঁড়িয়ে তাকে করতালির মাধ্যমে সংবর্ধিত করতে পারেন।
বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ‘রাজনৈতিক দুর্নীতি’র বাড়-বাড়ন্ত অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দিন যতই যাচ্ছে,ততই এই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
এতো লড়াই সংগ্রাম, এতো বিপ্লব বিদ্রোহ, এতো রক্ত-ত্যাগ আর জীবন বিসর্জন দেওয়ার পরেও দেশের এই অধপতনের মূল কারণ কী ?
এর উত্তর একটাই,‘পারিবারিক রাজনীতি’র খপ্পড় থেকে বের হতে না পারা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দাসত্ব যতদিন পারিবারিক অন্দরমহলে ঘুরপাক খাবে তততিন এই দুষ্টচক্রের কবল থেকে দেশবাসি রেহাই পাবে না। পারিবারিক রাজনীতির দুষ্টচক্রে এভাবে ঘুরপাক খেতে খেতে একটা ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হচ্ছি আমরা।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের নটিংহ্যাম ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ফার্নান্দো ক্যাসাল বের্তোয়া বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করে প্রধান তিনটি সমস্যা খুঁজে পেয়েছেন । সেগুলো হলো-
১. দুর্নীতি
২.দুর্বল দলীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং
৩.নারীর সীমিত প্রতিনিধিত্ব।
এই তিনটি বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন।
ইউরোপের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করে এই অধ্যাপক দেখিয়েছেন, শক্তিশালী ও স্থিতিশীল দলীয় ব্যবস্থা ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হয় না। অথচ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থা এখন এতোই নাজুক যে ক্ষমতাসীন দল মানেই দেশকে নিজের পৈত্রিক সম্পত্তি মনে করেন।
এখানেই এই গবেষকের সঙ্গে আমার ভিন্নমত। আমার মতে বাংলাদেশের রাজনীতির একটাই সমস্যা। সেটা হলো ‘রাজবংশীয় দাসত্বের দস্তখত’।
সহজ করে বললে রাজনীতির পারিবারিকীকরণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় এবং প্রধান সমস্যা।
দাস প্রথা উচ্ছেদ হলেও বাংলাদেশর আম জনতা এখনো রাজনৈতিক দাসত্বের খপ্পড় থেকে বের হতে পারেনি। যার কারণে বার বার ‘শেখ পরিবার’ এবং ‘জিয়া পরিবার’ এই দুই খোয়াড়ের খপ্পড়ে পড়ে সর্বশান্ত হচ্ছে জাতির ভাগ্য।
অতি ধুরন্ধর লোকেরা ‘জিয়া পরিবার’ এবং ‘বিএনপি পরিবার’ নামে রাজনৈতিক দলও তৈরি করে ফেলেছে। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেই ‘শাহেনশাহ মীর শাহে আলম’ আরেক ধাপ অগ্রসর হয়ে নিজের পরিবার পরিজনদের নামে ইউনিয়ন পরিষদের নাম রাখা শুরু করেছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতির পারবিারিকীকরণের ধরণ বুঝতে হলে আপনাকে ‘শাহেনশাহ মীর শাহে আলমের’ বাড়ির নামে এবং দুই ছেলে এবং ভাতিজীর নামে ৪টি ইউনিয়নের নাকরণের দৃষ্টান্ত বিশ্লেষণ করতে হবে।
ক্ষমতাসীন বিএনপির একজন স্থানীয় নেতার ‘বাদশাহগিরি’ দেখার পর বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যার সেই ভয়ঙ্কর অবস্থা কিছুটা টের পাবেন।
এই সময়ে বিএনপির সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাধর প্রতিমন্ত্রী ‘শাহেনশাহ’ মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাসভবন ‘মীরবাড়ী’র নামে শিবগঞ্জ উপজেলার নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে ‘মীরবাড়ী ইউনিয়ন’। অন্যদিকে তাঁর দুই ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামানুসারে মোকামতলা উপজেলার নবগঠিত দুটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে যথাক্রমে ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’ ও ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’। তার লন্ডন প্রবাসী ভাতিজি স্বর্নের নামে করেছেন ‘স্বর্নগ্রাম ইউনিয়ন’।
প্রতিমন্ত্রী সংসদে এই পারিবারিক নামকরণের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন এটা মিরাকেল। নতুন ইউনিয়নের নাম অলৌকিকভাবে তাঁর দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিলে গেছে, এটা শুনে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাঁকে উৎসাহিত করেছেন।মার সাহেবের বাদশাহগিরিতে তারা বেশ উজ্জীবিত বোধ করছেন।
তার মানে, সরকারি দলের এমপিরাও নিজেদের বাপ-দাদা,ছেলে-মেয়ে এবং নাতি-পুতির নামে দেশটা লিখে দেওয়ার মানসিকতা লালন করছেন।
শাহেনশাহ মীর শাহে আলমও বাংলাদেশের রাজনীতির সেই মোক্ষম ধারাটি বেশ ভালোভাবেই ধারণ করেছেন। তিনি বুঝে গেছেন, রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে রাজনীতির পারিবারিকীকরণ করতে হবে। তিনি জেনে গেছেন,‘ ডাইনেস্টি ইজ দ্যা সুপ্রিম পাওয়ার ’।
…………………………………………………
এফ শাহজাহান
ক্রাইসিস অ্যানালাইসিস
১৯ জুন ২০২৬
……………………………………………..

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com