মুহাররম-আশূরা ও কারবালা : গুরুত্ব, তাৎপর্য ও শিক্ষা

মুহাদ্দিস ডক্টর এনামুল হক :
    সময় : সোমবার, জুলাই ১৫, ২০২৪, ১১:০২ পূর্বাহ্ণ
  • ৭৫৮ Time View

আল্লাহ তা‘আলা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই বারো মাসে বছর নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ মাস সমূহের মধ্যে প্রথম মাস হলো মুহাররম মাস। মুহাররম মাসের সাথে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা জড়িত আছে। এ মাসের এক দিকে যেমন রয়েছে অনেক মর্তবা তেমনি অন্য দিকেও রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। আবার এ মাসকে কেন্দ্র করে সমাজে কিছু কুসংস্কার ও সুন্নাহ বিরোধী কাজ প্রচলিত আছে। নি¤েœ এ বিষয়ে আলোচনা পেশ করা হলো।

মুহাররম মাসের ফজীলত : ইসলামী শরী‘আতের আলোকে মুহাররম মাসের অনেক ফজীলত রয়েছে। যেমন:

১. হারাম বা সম্মানিত মাস: চারটি হারাম তথা সম্মানিত মাসের মধ্যে অন্যতম হলো মুহাররম। আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আসমান ও যমীন সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে আল্লাহর বিধানে মাস সমূহের গণনা হ’ল বারোটি। যার মধ্যে চারটি মাস হ’ল ‘হারাম’ বা মহাসম্মানিত। এটিই হ’ল প্রতিষ্ঠিত বিধান’ (সূরা আত তাওবা, আয়াত: ৩৬)। আবূ বাকরা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা) বলেন, ‘‘আল্লাহ যেদিন আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, সেদিন হ’তে সময় যেভাবে আবর্তিত হচ্ছিল আজও তা সেভাবে আবর্তিত হচ্ছে। বারো মাসে এক বছর। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। যুল-ক্বা‘দাহ, যুল-হিজ্জাহ ও মুহাররাম। তিনটি মাস পরস্পর রয়েছে। আর একটি মাস হ’ল রজব-ই-মুজার আরবের মুজার সম্প্রদায় অন্যান্য সম্প্রদায় অপেক্ষা রজব মাসের সম্মান প্রদর্শনে অতি কঠোর ছিল। তাই এ মাসটিকে তাদের দিকে সম্বন্ধিত করে হাদীছে ‘রজব-ই মুজার’ বলা হয়েছে। যা জুমাদা ও শা‘বান মাসের মাঝে অবস্থিত।’ সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৩০২৫, ৪১৪৪, ৪৩৮৫, ৫২৩০, ৭০০৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৪৭৭; আবূ দাঊদ হাদীস নং ১৯৪৭; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৫৯৭৪, ৫৯৭৫; সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং ১৯৪৯; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ২০৩৮৬; মুসনাদুল বাযযার, হাদীস নং ৩৬১৫; সুনানুল বাইহাক্বী, হাদীস নং ৯৫৫৪; সুনানুন নাসাঈ আল কুবরা, হাদীস নং ৪২১৫।

২. এ মাসের সিয়াম রমাজানের পরে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ: আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘রমাজান মাসের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের সিয়াম হচ্ছে সর্বোত্তম এবং ফরজ সালাতের পর রাতের সালাতই সর্বোত্তম।’ সহীহ মুসলিম হাদীস নং ২৮১২, ২৮১৩; জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪৮, ৭৪০; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৬৩৬; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ১১৩৪, ২০৭৬; সুনানু আবী দাঊদ হাদীস নং ২৪৩১; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ৮৫৩৪; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ২১৩৯৭; আল মুসতাদরাক আলাস সহীহাইন লিল হাকিম নিশাপুরী, হাদীস নং ১১৫৫।

৩. এ মাস আল্লাহর মাস: বছরের সব মাস আল্লাহর হ’লেও মুহাররমকে আল্লাহ নিজের মাস বলে ঘোষণা দিয়েছেন। (সহীহ মুসলিম হাদীস নং ২৮১২, ২৮১৩; জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪৮, ৭৪০; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৬৩৬; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ১১৩৪, ২০৭৬; সুনানু আবী দাঊদ হাদীস নং ২৪৩১; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ৮৫৩৪; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ২১৩৯৭; আল মুসতাদরাক আলাস সহীহাইন লিল হাকিম নিশাপুরী, হাদীস নং ১১৫৫)

আশূরার পরিচয়: আরবী ‘আশারা শব্দ থেকে এসেছে ‘আশূরা। ‘আশারা অর্থ দশ আর ‘আশূরা অর্থ দশম, মাসের দশম দিন। হিজরী সনের প্রথম মাস মুহাররমের দশ তারিখকে আশূরা বা আশূরায়ে মুহাররম বলা হয়।

মহররম ও আশূরার করণীয়: মুহাররম ও আশূরাকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে বিভিন্ন আমলের প্রচলন দেখা যায়। যার সবগুলো ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামের আলোকে মহররম ও আশূরায় করণীয় হ’ল-
১. হারাম মাস হিসেবে এ মাসকে সম্মান করা: মুহাররম মাস বছরের চারটি হারাম মাসের অন্যতম। অন্যান্য হারাম মাসের ন্যায় এ মাসে বিভিন্ন নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থেকে এ মাসকে সম্মান করতে হবে। আবূ জামরা (রহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনু আববাস (রাঃ)-এর সাথে বসতাম। তিনি আমাকে তাঁর আসনে বসাতেন। একবার তিনি বললেন, তুমি আমার কাছে থেকে যাও, আমি তোমাকে আমার ধন-সম্পদ হ’তে কিয়দংশ প্রদান করব। আমি তাঁর সাথে দু’মাস থাকলাম। অতঃপর একদা তিনি বললেন, আব্দুল কায়েস গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল আল্লাহর রাসূল (সা) এর নিকট আগমন করলে তিনি বললেন, তোমরা কোন গোত্রের? কিংবা বললেন, কোন প্রতিনিধি দলের? তারা বলল, ‘রাবী‘আ গোত্রের’। তিনি বললেন, স্বাগতম সে গোত্র বা সে প্রতিনিধি দলের প্রতি, যারা অপদস্থ ও লজ্জিত না হয়েই আগমন করেছে। তারা বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সা)! হারাম মাস ব্যতীত অন্য কোন সময় আমরা আপনার নিকট আগমন করতে পারি না। আমাদের এবং আপনার মধ্যে মুযার গোত্রীয় কাফেরদের বসবাস। তাই আমাদের কিছু স্পষ্ট নির্দেশ দিন, যাতে করে আমরা যাদের পিছনে ছেড়ে এসেছি তাদের অবগত করতে পারি এবং যাতে করে আমরা জান্নাতে দাখিল হ’তে পারি।’ সহীহুল বুখারী হাদীস নং ৫৩, ৮৭, ১৩৩৪, ৩৩১৯, ৪১১১, ৬৮৩৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২৪, ১২৫, ১২৭; সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং ৩৬৯৪; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ১৫৭, ১৭২, ৪৫৪১; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২২৪৫; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা, হাদীস নং ৩০৩১০।

২. সিয়াম পালন করা: এ মাসের অন্যতম কাজ হ’ল এ মাসের দশ তারিখে সিয়াম পালন করা। রসূলুল্লাহ (সা) মক্কাতে অবস্থান কালে এ সিয়াম পালন করতেন। মক্কার কুরায়শরাও এ দিনকে সম্মান করত ও সিয়াম পালন করত। ইবনুল ক্বাইয়িম (৬৬১-৭৫১ হিঃ), যাদুল মা‘আদ ২ খ-, পৃ: ৬৭। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘জাহেলী যুগে কুরায়শরা আশূরার সিয়াম পালন করত এবং আল্লাহর রাসূল (সা)ও এ সিয়াম পালন করতেন। যখন তিনি মদীনায় আগমন করেন তখনও এ সিয়াম পালন করেন এবং তা পালনের নির্দেশ দেন। যখন রমাজানের সিয়াম ফরজ করা হ’ল তখন আশূরার সিয়াম ছেড়ে দেয়া হলো। যার ইচ্ছা সে পালন করবে, আর যার ইচ্ছা পালন করবে না’। সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ১৭৯৩, ১৮৯৭, ১৮৯৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৯৬, ২৭০৮; সুনানু আবী দাঊদ, হাদীস নং ২৪৪৪, সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৬২১; আল মু’জামুল কবীর, হাদীস নং ১৮৬৯; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৮১৯২, ৮১৯৬; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা, হাদীস নং ৯৩৫৭, ৯৩৫৮; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ৭৮৪৪, ৭৮৪৫; মুয়াত্বা ইমাম মালিক, হাদীস নং ১০৫২; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ৪৪৮৩, ২০৯০৮, ২১০০৮, ২৬১০৭।
মদীনায় হিজরতের পর তিনি এ সিয়াম পালন করতেন ও সাহাবায়ি কিরামকে সিয়াম পালনের নির্দেশ দেন। ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী করীম (সা) মদীনায় আগমন করে দেখতে পেলেন যে, ইহুদীরা আশূরার দিনে সিয়াম পালন করে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার? (তোমরা এ দিনে সিয়াম পালন কর কেন?) তারা বলল, এটি অতি উত্তম দিন। এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর কবল হ’তে নাজাত দান করেছেন। ফলে এ দিনে মূসা (আঃ) সিয়াম পালন করতেন। রাসূল (সা) বললেন, আমি তোমাদের অপেক্ষা মূসার অধিক নিকটবর্তী। এরপর তিনি এ দিনে সিছয়াম পালন করেন এবং (লোকদেরকে) সিয়াম পালনের নির্দেশ দেন।’ সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ১৯০০, ৪৪০৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭১৪; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৭৩৪; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ২৬৪৪, ২৮৩১, ৮৭১৭; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ২৪২৪৬; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ৩৭৭৬; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৮১৮০; সুনানুন নাসাঈ আল কুবরা, হাদীস নং ২৮৩৫।

রমাজানের সিয়াম ফরয হওয়ার আগে রসূলুল্লাহ (সা) মুহাররম মাসের দশ তারিখে সিয়াম পালনে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। সাহাবীগণও আশূরার সিয়াম পালনের ব্যাপারে গুরুত্ব দিতেন। রুবাইয়ি‘ বিনতু মু‘আবিবয (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আশূরার সকালে আল্লাহর রাসূল (সা) আনসারদের সকল পল্লীতে এ নির্দেশ দিলেন, যে ব্যক্তি সিয়াম পালন করেনি সে যেন দিনের বাকী অংশ না খেয়ে থাকে। আর যার সিয়াম অবস্থায় সকাল হয়েছে, সে যেন ছিয়াম পূর্ণ করে। তিনি (রুবাইয়ি‘) (রা) বলেন, পরবর্তীতে আমরা ঐ দিন সিয়াম পালন করতাম এবং আমাদের শিশুদের সিয়াম পালন করাতাম। আমরা তাদের জন্য পশমের খেলনা তৈরি করে দিতাম। তাদের কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে তাকে ঐ খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতাম। আর এভাবেই ইফতারের সময় হয়ে যেত।’ সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ১৮৫৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭২৫; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৬২০; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২০৮৮; আল মু’জামুল কবীর, হাদীস নং ৭০০; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৮১৯১; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ৩৭৭৭। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘যখন তারা আমাদের কাছে খাবার চাইত, আমরা তাদের খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতাম যতক্ষণ না তারা তাদের ছিয়াম পূর্ণ করত’। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭২৬; শারহু মাআনিল আছার, হাদীস নং ৩০২৭)

আল হাকাম ইবনুল আ‘রাজ (রহ) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবন আববাস (রা) এর নিকট এলাম। এ সময় তিনি মাসজিদুল হারামে তার চাদরে হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন। আমি তাকে আশূরার সিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, যখন তুমি মুহাররমের নতুন চাঁদ দেখবে, তখন থেকে গণনা করতে থাকবে। এভাবে যখন নবম দিন আসবে তখন সিয়াম অবস্থায় ভোর করবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মুহাম্মাদ (সা) কি এভাবে সিয়াম রাখতেন? তিনি বলেন, মুহাম্মাদ (সা) এভাবেই সিয়াম রাখতেন’। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭২০; জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ৭৫৪; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ২২১৪; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২০৯৬, ২০৯৮; সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং ২৪৪৮; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ২১৩৫, ২৫৪১, ৩২১৩, ৩৩৯৩; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা, হাদীস নং ৯৩৮০; আল মু’জামুল কবীর, হাদীস নং ১২৯২৫; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৮১৮৬।

আশূরার সিয়ামের বিধান: আশূরার সিয়াম পালন করা সুন্নাত। হুমাইদ ইবন আব্দুর রহমান (রহ) থেকে বর্ণিত, যে বছর মু‘আবিয়া (রা) হাজ্জ করেন, সে বছর আশূরার দিনে (মাসজিদে নববীর) মিম্বরে তিনি (রাবী) তাঁকে বলতে শুনেছেন যে, ‘হে মদীনাবাসীগণ! তোমাদের আলিমগণ কোথায়? আমি আল্লাহর রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছি যে, আজকে আশূরার দিন, আল্লাহ তা‘আলা এর সিয়াম তোমাদের উপর ফরজ করেননি বটে, তবে আমি সিয়াম পালন করছি। যার ইচ্ছা সে সিয়াম পালন করুক, যার ইচ্ছা সে পালন না করুক।’ সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ১৮৯৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭০৯; সহীহ ইবন হিববান, হাদীস নং ৩৬২৬; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২০৮৫; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ৭৮৩৪; মুয়াত্বা ইমাম মালিক, হাদীস নং ১০৫৩; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ১৬৮৭৬, ১৬৮৯১; আল মু’জামুল আওসাত্ব, হাদীস নং ৮৭৬১; আল মু’জামুল কবীর, হাদীস নং ৭১৬, ৭৪৮, ৭৪৯,, ৭৫২, ৭৫৩।

আশূরার সিয়ামের মর্তবা: ১. রসূলুল্লাহ (সা) এ দিনের সিয়ামকে বেশী প্রাধান্য দিতেন। ইবন আববাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি নবী করীম (সা) কে আশূরার দিনের সিয়ামের উপরে অন্য কোন দিনের সিয়ামকে প্রাধান্য দিতে দেখিনি এবং এ মাস অর্থাৎ রমাজান মাস (এর উপর অন্য মাসের গুরুত্ব প্রদান করতেও দেখিনি)।’ সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ১৯০২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৩২; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ৩৪৭৫; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ৭৮৩৭; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৮১৮১; শারহু মাআনিল আছার, হাদীস নং ৩০৩৯; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ৩৭৭৯।

ইবন আববাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী করীম (সা) রমাজানের সিয়ামের পর আশূরার দিন ছাড়া কোন দিনকে অন্য দিন অপেক্ষা মাহাত্ম্যপূর্ণ মনে করতেন না।’ আল মু’জামুল কবীর লিত ত্বাবারানী, হাদীস নং ১১২৫৫; আল মু’জামুল আওসাত্ব, হাদীস নং ২৭২০; সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ১০২০।

২. এক বছরের গুনাহের কাফফারা: আশূরার সিয়াম পূর্ববর্তী এক বছরের সগীরা গুনাহের কাফফারা স্বরূপ। আবু ক্বাতাদা (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘আর আশূরার সিয়াম, আমি আশা করি (এর বিনিময়) বিগত এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করা হবে’। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮০৪; সুনাুন আবী দাঊদ, হাদীস নং ২৪২৭; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৬৩২; জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ৭৫২; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ২২৬৫০; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ১২০৮৩; সুনানু ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৭৩৮; শারহু মাআনিল আছার, হাদীস নং ৩০৪৯; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ৩৭৬১, ৩৮৪৪; সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ১০১৭।

আশূরার সিয়ামের সংখ্যা: রসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় ও মদীনায় প্রথম দিকে মুহাররম মাসে এক দিন সিয়াম পালন করতেন। সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ২০০৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১২৫; সুনানু আবী দাঊদ, হাদীস নং ২৪৪২) পরবর্তীতে ইহুদীদের বিরোধিতা করার জন্য ৯ তারিখসহ দুই দিন সিয়াম পালনের আশা প্রকাশ করেন। আব্দুল্লাহ ইবন আববাস (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা) যখন নিজে আশূরার দিন সিয়াম রাখলেন এবং আমাদেরকেও এ সিয়াম পালনের নির্দেশ দেন, তখন লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রসূল (সা)! ইহুদী ও খৃষ্টানরা এ দিনটিকে সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ‘আগামী বছর আসলে আমরা নবম দিনেও সিয়াম পালন করব। কিন্তু আগামী বছর না আসতেই রসূলুল্লাহ (সা) ইন্তিকাল করেন।’ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭২২; সুনানু আবী দাঊদ, হাদীস নং ২৪৪৭; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৮১৮৪ ইবন আববাস (রা) থেকে বর্ণিত, ‘তোমরা ৯ ও ১০ তারীখে সিয়াম রাখ এবং ইহুদীদের বৈপরীত্য কর।’ জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ৭৫৫; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২০৯৫; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ৭৮৩৯; সুনানুল বায়হাক্বী, হাদীস নং ৮১৮৭; শারহু মাআনিল আছার, হাদীস নং ৩০৫৬; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ৩৭৮৭, ৩৭৮৮; শু‘আইব আরনাউত্ব একে ছহীহ (তাহক্বীক যাদুল মা‘আদ, ২ খ-, পৃ: ৬৬) বলেছেন। সুতরাং মুহাররমের দু’টি সিয়াম পালন করা উত্তম। এক্ষেত্রে দশ তারিখের আগের দিন বা পরের দিন সিয়াম রাখা যেতে পারে। ইবন আববাস (রা) থেকে বর্ণিত, ‘তোমরা আশূরার সিয়াম পালন কর এবং ইহুদীদের বিরোধিতা করা। তোমরা আশূরার আগের দিন অথবা পরের দিন সিয়াম পালন কর।’ মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ২১৫৪; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২০৯৫; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৮১৮৯; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ৩৭৮৯; জামি‘উছ সগীর, হাদীস নং ৫০৫।

আশূরার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহের অন্যতম হলো ফিরাঊনের জাতি। আল্লাহ তাদেরকে হিদায়াতের জন্য মূসা (আ) ও তাঁর ভাই হারূন (আ) কে নবী হিসাবে প্রেরণ করেন। আর আসমানী কিতাব তাওরাত নাযিল করেন। মূসা (আ) এর জন্মের পূর্ব থেকেই বণী ইসরাঈলের ওপর ফিরাউন অত্যাচার করত। ফেরাউন নিজেকে ইলাহ দাবী করল এবং মূসা (আঃ) এর কওমের ওপর অত্যাচার আরো বৃদ্ধি করে দিল। ফলে মূসা (আ) আল্লাহর আদেশে একরাতে (সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৭৭, সূরা আশ শু‘আরা, আয়াত: ৫২) তাঁর অনুসারীদের নিয়ে চলে যাওয়ার সময় সমুদ্র বাধা হয়ে দাঁড়াল। মহান আল্লাহ মূসাকে লাঠি দ্বারা সাগরে আঘাত করার আদেশ দিলে সাগর ভাগ হ’ল এবং প্রত্যেক ভাগ বিশাল পর্বতের মত হয়ে গেল’ (সূরা আশ শূ‘আরা, আয়াত: ৬৩)। সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় ফেরাঊন তাদের পিছনে ধাওয়া করল। মহান আল্লাহ মূসা ও তাঁর জাতিকে আল্লাহ রক্ষা করলেন আর ফেরাঊন ও তার জাতিকে পানিতে নিমজ্জিত করে ধ্বংস করলেন (সূরা আল বাক্বারা, আয়াত: ৫০)।

আল্লাহ বলেন, ‘আর আমরা বনু ইসরাঈলকে সাগর পার করে দিলাম। তারপর তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল ফেরাঊন ও তার সেনাবাহিনী হঠকারিতা ও বাড়াবাড়ি বশে। অতঃপর যখন সে ডুবতে লাগল তখন বলে উঠল, আমি ঈমান আনলাম এ মর্মে যে, কোন উপাস্য নেই তিনি ব্যতীত যার উপরে বনু ইস্রাঈলগণ ঈমান এনেছে। আর আমি তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত। (আল্লাহ বললেন) এখন? অথচ ইতিপূর্বে তুমি অবাধ্যতা করেছিলে এবং ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।’ সূরা ইউনুস, আয়াত: ৯০-৯১

এ মহান দিনটি ছিল মুহাররম মাসের দশ তারিখ তথা আশূরার দিন। ইহুদীরা এই দিনকে সম্মান করত ও গুরুত্ব দিত। আবূ মূসা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আশূরার দিনকে ইহুদীগণ ঈদ (উৎসবের দিন) মনে করত। নবী করীম (সা) (সাহাবীগণকে) বললেন, তোমরাও এ দিনের ছিয়াম পালন কর।’ সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ১৯০১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৩১ আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘খায়বারের ইহুদীরা আশূরার দিন সিয়াম পালন করত। তারা এ দিনকে ঈদরূপে বরণ করত এবং তারা তাদের মহিলাদেরকে অলংকার ও উত্তম পোষাকে সুসজ্জিত করত। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তোমরাও এ দিনে সিয়াম পালন কর’। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭১৭, ২৫২৮, ২৫২৭; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৮১৯৭; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ২৪২৪৯)

আশূরা সম্পর্কিত জয়ীফ ও বানোয়াট বর্ণনা:
আব্দুল্লাহ ইবন মাস‘ঊদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আশূরার দিন নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য উদার হস্তে খরচ করবে আল্লাহ তা‘আলা সারা বছর উদারহস্তে তাকে দান করবেন। সুফিয়ান ছাওরী বলেন, আমরা এর পরীক্ষা করেছি এবং কথার সত্যতার প্রমাণ পেয়েছি।’ সুনানুল বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, হাদীস নং ৩৭৯৫। হাদীসটি জঈফ। জঈফাহ হাদীস নং ৬৮২৪; জঈফুল জামি‘ হাদীস নং ৫৮৭৩) আবূ হুরাইরা (রা) হ’তে বর্ণিত, ‘আশূরা হ’ল তোমাদের পূর্ববর্তী নবীদের ঈদের দিন। সুতরাং তোমরা এ দিন সিয়াম পালন কর।’ সুয়ূতী, জামিউছ সাগীর, হাদীস নং ৫৩৪৭; মুসনাদুল বাযযার, হাদীস নং ৯৮১৩; দায়লামী, আল-ফেরদৌস, হাদীস নং ৮৯৮৯। আলবানী হাদীসটিকে জঈফ বলেছেন। সিলসিলাতুয জঈফাহ, হাদীস নং ৩৮৫১; জঈফুল জামে‘, হাদীস নং ৩৬৭০। হায়ছামী হাদীছটিকে যঈফ বলেছেন। মাজমা‘উয যাওয়ায়িদ, ৩য় খ-, পৃ: ১৮৮)

এছাড়াও ওয়াজ-মাহফিলে, জুম‘আর খুতবায় বিভিন্ন আলোচকের মুখে মহররম ও আশূরাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ঘটনা শোনা যায়। যার কোনো সহীহ সূবুত ও ভিত্তি পাওয়া যায় না।

আশূরা কেন্দ্রিক শরী‘আত বিরোধী কাজ:
১. হুসাইন (রা) এর মৃত্যুবার্ষিকী পালন: কোন মুসলিম ব্যক্তি ইন্তিকাল করলে তার মৃত্যুর খবরে ‘ইন্না লিল্লা-হি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘ঊন’ পাঠ করে (সূরা আল বাক্বারা, আয়াত: ১৫৬) তার জন্য দো‘আ করা, তার জানাযা ও দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করা অন্য মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব। সুনানুন নাসাঈ, হাদীস নং ১৯৩৮; জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ২৭৩৭; সহীহাহ, হাদীস নং ৮৩২) আর তার মৃত্যুতে সর্বোচ্চ তিন দিন শোক পালন করা যাবে। যদিও তারা পিতা-মাতা, ছেলে-মেয়ে হয়। তবে স্ত্রী স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করবেন এবং বিবাহ, সাজগোজ থেকে বিরত থাকবেন।’ সূরা আল বাক্বারা, আয়াত: ২৩৪

যায়নাব বিনতু আবূ সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন সিরিয়া হ’তে আবূ সুফিয়ান (রাঃ)-এর মৃত্যুর খবর পৌঁছল, তার তৃতীয় দিবসে উম্মু হাবীবা (রা) হলুদ বর্ণের সুগন্ধি আনয়ন করলেন এবং তাঁর উভয় গন্ড ও বাহুতে মাখলেন। অতঃপর বললেন, অবশ্য আমার এর কোন প্রয়োজন ছিল না, যদি আমি নবী করীম (সা) কে এ কথা বলতে না শুনতাম যে, যে স্ত্রীলোক আল্লাহ এবং ক্বিয়ামাত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে তার পক্ষে স্বামী ব্যতীত অন্য কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক পালন করা বৈধ নয়। অবশ্য স্বামীর জন্য সে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে।’ সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ১২৮০, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪৮৬।

কোন মুসলমান ইন্তিকাল বা শাহাদতবরণ করলে তার জন্য মৃত্যুবার্ষিকী পালনের বিধান ইসলামে নেই। রাসূল (সা) ও সাহাবায়ি কিরাম কখনো কারো জন্ম বা মৃত্যু বার্ষিকী পালন করেননি। হুসাইন (রা) এর শাহাদত বরণের মর্মান্তিক ঘটনাটিও আশূরার দিনে অর্থাৎ ১০ই মুহাররম ঘটেছিল। যা মুসলমানদের জন্য নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। কিন্তু এর জন্য সেদিন শোক দিবস হিসাবে পালন করা শরী‘আত সম্মত নয়।

আববাসীয় খলীফা মুত্বী‘ বিন মুকতাদিরের সময়ে (৩৩৪-৩৬৩ হিঃ/৯৪৬-৯৭৪ খৃ.) তার শক্তিশালী শী‘আ আমীর মু‘ইযযুদ্দৌলা হুসাইন (রা) এর শাহাদতের স্মরণে ৩৫২ হিজরীর ১০ মুহাররমকে ‘শোক দিবস’ ঘোষণা করেন এবং সকল দোকান-পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত বন্ধ করে দেন। তিনি মহিলাদের শোকে চুল ছিঁড়তে, চেহারা কালো করতে, রাস্তায় নেমে শোকগাথা গেয়ে চলতে বাধ্য করেন। শহরে ও গ্রামে সর্বত্র সকলকে শোক মিছিলে যোগদান করতে নির্দেশ দেন। শী‘আরা খুশী মনে এ নির্দেশ পালন করে। কিন্তু সুন্নীরা চুপ হয়ে যান। পরে সুন্নীদের উপরে এ ফরমান জারী হ’লে ৩৫৩ হিজরীতে উভয় দলে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ফলে বাগদাদে তীব্র নাগরিক অসন্তোষ ও সামাজিক বিশৃংখলা ছড়িয়ে পড়ে।

২. মাতম করা: আশূরার দিনকে কেন্দ্র করে অনেকে ‘হায় হোসেন’ ‘হায় হোসেন’ বলে বিলাপ করেন, বুক চাপড়ান ও মাথায় কালো কাপড় বেঁধে শোক প্রকাশ করেন, যা সম্পূর্ণভাবে হারাম ও কবীরা গুনাহ। ইমাম যাহাবী, আল কাবায়ের, কবীরা গুনাহ হাদীস নং নং ৪৭ পৃ: ৩৫৮) সকল আলিম একমত যে, আওয়াজ করে মৃত ব্যক্তির জন্য কান্নাকাটি করা জায়েয নয়। সাইয়িদ সাবেক, ফিকহুস সুন্নাহ, ১ম খ-. পৃ: ৩৭১) আবূ হুরাইরা (রা) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে দু’টো আচরণ এমন পাওয়া যায়, যা তাদের ক্ষেত্রে কুফরীমূলক কর্ম; বংশে খোঁটা দেয়া ও মৃতের জন্য মাতম করে কান্না করা’। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৭; জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ১০০১; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ৭৮৪৮। আবূ বুরদা, ইবন আবূ মূসা (রহ) থেকে বর্ণিত, একবার আমার পিতা আবূ মূসা অজ্ঞান হয়ে গেলেন। এতে (আমার বিমাতা) তাঁর স্ত্রী আব্দুল্লাহর মাতা বিলাপ করতে লাগল। অতঃপর তিনি সংজ্ঞা লাভ করলেন এবং আব্দুল্লাহর মাকে বললেন, তুমি কি জানো না? তারপর তিনি একটি হাদীস বর্ণনা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘আমি তার সাথে সম্পর্কহীন যে মাথার চুল ছিঁড়ে, উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করে এবং জামার গলা ফাঁড়ে।’ (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৪; সুনানু নাসাঈ, হাদীস নং ১৮৬৩; সুনানু ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৫৮৬)

৩. মর্ছিয়া করা: মর্ছিয়া আরবী শব্দ, এর অর্থ- শোকগাথা, শোকসঙ্গীত। আমাদের সমাজে কারবালার ইতিহাসকে নিয়ে বিভিন্ন রকম কবিতা, জারী গান, বিভিন্ন নভেল-নাটক ও গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে। যার অধিকাংশ ভিত্তিহীন ও মনগড়া। মীর মোশাররফ হোসেন কর্তৃক রচিত ‘বিষাদ সিন্ধু’কে কারবালার ইতিহাস গ্রন্থ মনে করা হয়। অথচ এই উপন্যাসের অধিকাংশ তথ্যই মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। ইসলামে মৃত ব্যক্তিকে কেন্দ্র্র করে এসকল কার্যকলাপ কখনো জায়েয নয়।

৪. তা‘জিয়া করা: তা‘জিয়া শব্দের অর্থ- সান্তনা দান, শোক প্রকাশ। আশূরার দিন হুসাইন (রা) এর কাল্পনিক কবর তৈরী করে তা‘যিয়া বা শোক মিছিল করা হয়। ঐ ভুয়া কবরগুলিকে ‘আত্মা সমূহের অবতরণস্থল’ বলে ধারণা করা হয়। সেখানে হুসাইনের রূহ হাজির হয় কল্পনা করে তাকে সালাম দেয়া হয়। তার সামনে মাথা ঝুঁকানো হয়। সেখানে সিজদা করা হয়, মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য প্রার্থনা করা হয়। এগুলো স্পষ্ট শিরক।

৫. নিজের উপর আঘাত করা ও কাপড় ছেঁড়া: আশূরার দিন অনেকে হুসাইন (রা) এর মৃত্যুকে স্মরণ করে, তার শোকে বিভিন্ন ধারালো জিনিস দিয়ে নিজের দেহকে আঘাত করে রক্তাক্ত করে এবং নিজের গায়ের কাপড় ছিঁড়ে ফেলে। এটা ইসলাম সমর্থন করে না। আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (সা) ইরশাদ করেছেন, ‘যারা শোকে মুখে চপেটাঘাত করে, জামা ছিন্ন করে ও জাহিলী যুগের মত চিৎকার করে, তারা আমাদের দলভুক্ত নয়’। (সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ১২৯৭)

৬. বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা : আশূরার নামে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হয়। যেমন, রাস্তা-ঘাট বিভিন্ন রঙে সাজানো, লাঠি, তীর, বল্লম নিয়ে যুদ্ধের মহড়া দেয়া, হুসাইন (আ) এর নামে কেক ও পাউরুটি বানিয়ে ‘বরকতের পিঠা’ বলে বিক্রি করা ইত্যাদি।

আশুরার দিন সহীহ হাদীস সমর্থিত আমল ছাড়া যেহেতু অন্য কোনো আমল পাওয়া যায় না, তাই আমাদের দেশে আশুরার দিনে যেসব রেওয়াজ বা রুসম রয়েছে, তা থেকে বিরত থাকতে হবে। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে খিচুড়ি পাকানো, শিয়াদের আবিষ্কৃত কু-প্রথা ও বিদয়াতগুলো যেমন- তাজিয়া (মাজারের সাদৃশ্য করে হুসাইন (রা) এর নকল কবর তৈরি করা), ঢাকঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো, হায় হাসান-হায় হুসাইন! বলে মাতম করা, ছুরি মেরে নিজের বুক-পিঠ থেকে রক্ত বের করে বুক চাপড়ানো, শোকের পোশাক পরা ইত্যাদি। এসব করা যেমন নাজায়েজ, তেমনি এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করাও নাজায়েজ।
কারবালার ঐতিহাসিক ঘটনা:
এ সব ঘটনার সাথে হিজরি ৬১ সনের একই দিনে কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনাও যোগ হয়েছে। কারবালার ঘটনা সংঘটিত হওয়ার আগেই ইসলাম আশুরার গুরুত্ব দিয়েছে। এ কারণেই রমাজান মাসের সিয়ামের আগে মুসলমানদেরকে এ দিনে ফরজ হিসেবে রোজা রাখতে হয়েছে- যা ইহুদি ধর্মের বিধানেও আছে। তবে কারবালার মর্মান্তিক হত্যাকা-ের পর মুসলিম সমাজে আশুরা শোকাবহ দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী ইবন আবী তালিব (রা) এর পর মুয়াবিয়া মুসলিম জাহানের আমীর বা শাসক নিযুক্ত হন। আর আলী (রা) তনয় ও মহানবী (সা) এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা) চুক্তি অনুযায়ী মুয়াবিয়ার খিলাফতের উত্তরাধিকারী মনোনীত হন। কিন্তু আমীরে মুয়াবিয়ার ইন্তিকালের পর তার পুত্র ইয়াজিদ চুক্তি ভঙ্গ করে অন্যায়ভাবে খিলাফতের দায়িত্ব নেন এবং শাসন ব্যবস্থায় স্বৈরাচার নীতি অবলম্বন করেন। এতে মুসলিম জাহানে বিবাদ-বিশৃঙ্খলা বেড়ে যায়। এহেন পরিস্থিতিতে খেলাফতের ন্যায্য দাবিদার ইমাম হুসাইন (রা) বাধ্য হয়ে সত্য-ন্যায়ের পক্ষে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। একদিকে ক্ষমতায় মদমত্ত স্বৈরাচার ইয়াজিদ অন্যদিকে খেলাফতের ন্যায্য দাবিদার মহানবী (সা) দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা)। ইয়াজিদের সরকারি বিশাল বাহিনী অন্যদিকে ইমাম হুসাইন (রা) এর পক্ষে মুষ্টিমেয় সত্যের সৈনিক। অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে সত্য-ন্যায় প্রতিষ্ঠার লড়াই। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের খিলাফত প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। একদিকে ইয়াজিদের বিপুল সমরাস্ত্র অন্যদিকে ইমাম হুসাইন (রা) নিরস্ত্র। অধিকন্তু ইয়াজিদের সৈন্যদের দ্বারা ফোরাতের তীরও অবরুদ্ধ। ইমাম হুসাইন (রা) ও তার সৈনিকেরা তৃষ্ণায় কাতর। এমতাবস্থায় ইমাম হুসাইন (রা) কে আত্মসমর্পণের জন্য ইয়াজিদ প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু ইয়াজিদের অন্যায়-অসত্য ও স্বৈরাচারী শক্তির কাছে মাথা নত না করে তিনি তাঁর অবস্থানে অটল থেকে যান। এ অসম যুদ্ধে স্বভাবতই ইমাম হুসাইন (রা) পরাজিত হন। আর বিজয়ী ইয়াজিদ পাশবিক উম্মাদনায় মেতে উঠেন। তিনি পরাজিত ইমাম হুসাইন (রা) ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করেন। সাধারণভাবে যুদ্ধে বিজয়ী প্রশংসিত কিন্তু কারবালা যুদ্ধের ইতিহাস ভিন্ন। ন্যায়-অন্যায় বিবেচনায় কারবালা যুদ্ধের বিজিত নন্দিত অন্যদিকে বিজয়ী ঘৃণিত। নৃশংসতা-নির্মমতার কারণে ইয়াজিদ নিন্দনীয়। আর ইমাম হুসাইন পরাজিত হয়েও ইতিহাসে স্মরণীয়। অন্যায়-অসত্যের কাছে মাথা নত না করার জন্য তিনি বিশ্ব বরণীয়। সত্য-ন্যায়ের ঝা-া সমুন্নত রাখার জন্য তাঁর আদর্শ অনুকরণীয়। কারবালার নিষ্ঠুর হত্যাকা-ের প্রায় ১৪ শত বছর অতিক্রান্ত হলেও আজও ইমাম হুসাইন (রা) সমগ্র মুসলমান উম্মাহর অন্তরে স্মৃতিময় হয়ে আছেন। একইভাবে ইয়াজিদের প্রেতাত্মাও বিদ্যমান আছে। তাই সময়-স্থানের ব্যাপক ব্যবধান সত্ত্বেও কারবালার প্রেক্ষাপট আর আজকের প্রেক্ষাপট প্রায় অভিন্ন। কারণ সত্য-মিথ্যার চিরন্তন দ্বন্ধ। এ দ্বন্ধে সত্যপন্থী ও ন্যায়বাদীদের ত্যাগ-কুরবানী পেশ করতেই হবে।

মুহাররম আশুরা দিবসের আগমন ঘটলেই কিছু পুরাতন বিতর্কের অবতরণ ঘটে। অধুনা একজন মিডিয়া জগতে সুপরিচিত আলেমের পোস্টে দেখা গেছে যে, তিনি অবলীলায় হুসাইন ইবন আলী (রা) এর সমালোচনা করছেন যে তিনি ষাটজন সাহাবার পরামর্শ উপেক্ষা করে কারবালা প্রান্তরে গিয়ে যুদ্ধ করে নবী (সা) এর আদর্শের পরিপন্থী কাজ করেছেন। (আসতাগফিরুল্লাহিল আজীম) মুয়াবিয়া (রা) ইজতিহাদের আলোকে চুক্তিভঙ্গ করে মজলিসে শুরার উপর পরবর্তী খলীফা নিযুক্তির দায়িত্ব অর্পণ করেন নি। এ দিকে আবার হুসাইন ইবন আলী (রা) ইজতিহাদ করে ইয়াযিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন যে তিনি অবৈধ শাসক। কেননা তিনি শূরাভিত্তিক নিযুক্ত খলীফা নন। হোসাইন ইবন আলী (রা) বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা) এর কেবল প্রাণপ্রিয় দৌহিত্রই নন বরং তিনি ও তাঁর সহোদর হাসান ইবন আলী (রা) সকল জান্নাতী যুবকদের নেতা। (যৌবনকালীন সময়ে যারা ঈমানের ওপর ইন্তিকাল করেছেন তাদের সকলের)। (আল জামিঈ লিত তিরমিযী, হাদীস নং ৩৭৬৮; ৩৭৮১; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ১০৯৯৯, ১১৫৯৪, ১১৬১৮, ১১৭৭৭, ২৩৩৩০; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৬৯৫৯৬৯৬; সুনানু ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১১৮; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা, হাদীস নং ৩২১৭৬, ৩২১৭৭, ৩২১৭৯)। মুয়াবিয়া (রা) হতে হাসান ও হুসাইন (রা) এর মর্যাদা অনেক অনেকগুণ বেশি। আর ইয়াজিদের সাথে তো তাদের তুলনাই অবৈধ। সুতরাং আহলে বাইতের প্রতি আমাদের আরো অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন জরুরী। ইমাম শাফিয়ী (রহ) আহলে বাইতের প্রতিটি সদস্যকে অগাধ ভালবাসতেন। এমনকি এই প্রবল ভালবাসার কারণে তাঁকে কিছু লোক রাফেজী বা শীয়া পর্যন্ত অপবাদ দিয়েছিলেন। ফলে তিনি তাদের উত্তরে বলেনঃ মুহাম্মাদ (সা) এর পরিবারবর্গকে ভালবাসার নাম যদি রাফেজী হয় তবে জ্বিন-ইনসান সকলেই সাক্ষী থাকুক যে আমি নিঃসন্দেহে রাফেজী।”

আবার কেউ কেউ কারবালা প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (রা) এর শাহাদাতের ঘটনা কেন্দ্রীক ন্যায়-অন্যায় ও হক্ব-বাতিলে লড়াই বিষয়ে অবান্তর, অর্বাচীন ও অযৌক্তিক মন্তব্য করে থাকেন। যা অত্যন্ত দু:খজনক। ইক্বামাতে দীনের আন্দোলনে নবীয়ানা কাজে ময়দানে সম্পৃক্ত না থেকে এসি রুমে বসে ইসলাম বিরোধী ও বিদ্বেষী চক্রের পেইড এজেন্ট ও ক্রীড়নক হয়ে এসব প্রলাপ নি:সন্দেহে ইসলাম প্রিয় তৌহিদী জনতা ও মুসলিম উম্মাহ ঘুণাভরে প্রত্যাখ্যান করছে।

পরিশেষে বলা যায় যে আশুরার ব্যাপারে রাসুল (সা‬) এর দিক নির্দেশনা থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হচ্ছে, সিয়াম পালন ও ঈমানী চেতনায় উদ্ভুদ্ধ হওয়া। আশুরার দিনে কারবালায় ইমাম হুসাইন (রা) এর ঘটনা থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হচ্ছে- অন্যায় ও জুলুমের সাথে আপোষহীন মনোভাব বজায় রাখা। মুসলিমগণের তাৎপর্যময় দিনে কারবালার বিষাদময় ঘটনায় লুকিয়ে আছে ত্যাগের মহিমা আর সত্য-ন্যায় প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। তাই শুধু মর্সিয়া-মাতম নয় বরং সত্য-ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও ইসলামী সমাজ বিনির্মানে জান এবং মালের সর্বোচ্চ ত্যাগ-কুরবানী হোক আশুরার প্রধান শিক্ষা। মহান আল্লাহ আমাদের তাউফীক দান করুন। আমীন!

মুহাদ্দিস ডক্টর এনামুল হক
প্রধান মুহাদ্দিস (সহকারী অধ্যাপক)
বিজুল দারুল হুদা কামিল স্নাতকোত্তর মাদরাসা, বিরামপুর, দিনাজপুর।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com