মর্যাদাপূর্ণ আরাফা : গুরুত্ব ও ফজীলত

Author মুহাদ্দিস ডক্টর এনামুল হক :
    সময় : শুক্রবার, জুন ১৪, ২০২৪, ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ
  • ৭৪৭ Time View

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম মানাসিকে হাজ্জ। যিলহাজ্জ মাসের ৯ তারিখ সূর্যোদয়ের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফা ময়দানে চিহ্নিত সীমানার মধ্যে অবস্থান করা মানাসিকে হাজ্জের প্রধান রুকন। এ দিনকেই ‘আরাফার দিন বলা হয়। ‘আরাফার ময়দান হারাম এলাকার বাইরে অবস্থিত। কাবা শরীফ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, মাসজিদুল হারাম রোড হয়ে ২২ কিলোমিটার দূরে ১০.৪ কি.মি. জায়গা জুড়ে বিস্তৃত আরাফার এ ময়দান। চতুর্দিকে সীমানা-নির্ধারণমূলক উঁচু ফলক রয়েছে। ৯ যিলহাজ্জ ভোরে ফজরের সালাত মিনায় আদায় করে সূর্যোদয়ের পর ‘তালবিয়া’ পড়া অবস্থায় রওয়ানা হতে হয় আরাফা অভিমুখে। এ দিনটি অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও মর্যাদাপূর্ণ। এ দিনের গুরুত্ব ও ফজীলত সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হ’ল।

‘আরাফা দিবসের মর্যাদা
এ দিবসটি অনেক ফজীলত সম্পন্ন ও অধিক মর্যাদার অধিকারী। যে সকল কারণে এ দিবসটির এত মর্যাদা তার কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হ’ল;
১) এ দিবস ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ ও বিশ্ব মুসলিমের প্রতি আল্লাহর নি‘য়ামাতের পরিপূর্ণতা প্রাপ্তির দিন। হাদীসে এসেছে,
عَنْ طَارِقِ بْنِ شِهَابٍ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رضي الله عنه أَنَّ رَجُلاً مِنَ الْيَهُودِ قَالَ لَهُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، آيَةٌ فِى كِتَابِكُمْ تَقْرَءُونَهَا لَوْ عَلَيْنَا مَعْشَرَ الْيَهُودِ نَزَلَتْ لاَتَّخَذْنَا ذَلِكَ الْيَوْمَ عِيدًا. قَالَ أَىُّ آيَةٍ قَالَ (الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِى وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا). قَالَ عُمَرُ قَدْ عَرَفْنَا ذَلِكَ الْيَوْمَ وَالْمَكَانَ الَّذِى نَزَلَتْ فِيهِ عَلَى النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ قَائِمٌ بِعَرَفَةَ يَوْمَ جُمُعَةٍ.
“তারিক বিন শিহাব (রহ) হ’তে বর্ণিত, এক ইহুদী লোক উমর (রা) কে বলল, হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনাদের কিতাবে আপনারা এমন একটি আয়াত তিলাওয়াত করে থাকেন যদি সে আয়াতটি আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হ’ত তাহ’লে আমরা সে দিনটিকে ঈদ হিসাবে উদযাপন করতাম। তিনি বললেন, সে আয়াত কোনটি? লোকটি বলল, আয়াতটি হ’ল-اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلاَمَ دِيْنًا ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জীবন বিধান হিসাবে মনোনীত করলাম। (সূরা আল মায়িদা, আয়াত: ৩)। উমর (রা) এ কথা শুনে বললেন, আমি অবশ্যই জানি কখন তা অবতীর্ণ হয়েছে ও কোথায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং অবতীর্ণ হওয়ার সময় রসূলুল্লাহ (সা) কোথায় ছিলেন। সে দিনটি হ’ল জুম‘আর দিন। তিনি সে দিন ‘আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।” সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৪৫, ৪১৪৫, ৬৮৪০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৭১০, ৭৭১১, ৭৭১২; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ১৮৮; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ৩৩, ৪০৬৭; সুনানুন নাসাঈ, হাদীস নং ৫০১২; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৯২৬১, ৯২৬২; মুসনাদুল হুমাইদী, হাদীস নং ৩১; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ৪৩৫০।
২) আরেক হাদীসের ভাষ্যে এ দিন হ’ল ঈদের দিন সমূহের মধ্যে একটি দিন। হাদীসের ভাষ্যে;
عَنْ عُقْبَةَ بْنَ عَامِرٍ رضي الله عنه قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمُ عَرَفَةَ وَيَوْمُ النَّحْرِ وَأَيَّامُ التَّشْرِيقِ عِيدُنَا أَهْلَ الإِسْلاَمِ وَهِىَ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ.
“উকবা ইবন ‘আমির (রা) হ’তে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘আরাফার দিবস, কুরবানীর দিন ও আইয়ামে তাশরীক (কুরবানী পরবর্তী তিন দিন) আমাদের ইসলামের অনুসারীদের জন্য ‘ঈদের দিন। আর এ দিনগুলো খাওয়া-দাওয়া ও পানাহারের দিন।” জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ৭৭৩; সুনানু আবী দাঊদ, হাদীস নং ২৪২১; সুনানুন নাসাঈ, হাদীস নং ৩০০৪; আল মুসতাদরাক আলাস সহীহাইন, হাদীস নং ১৫৮৬; আল মু’জামুল কবীর, হাদীস নং ৮০৩; সুনানুদ দারিমী, হাদীস নং ১৭৬৪; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৬০৩; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২১০০; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ১৭৩৭৯, ১৭৩৮৩; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা, হাদীস নং ১৫২৭০; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৮২৪৫; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ২৩৯১৫। সনদ: সহীহ
‘উমর (রা) বর্ণিত হাদীসের ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবন আববাস (রা) বলেন,
عن عمار بن أبي عمار قال قرأ ابن عباس رضي الله عنهما {اليوم أكملت لكم دينكم وأتممت عليكم نعمتي ورضيت لكم الإسلام دينا} وعنده يهودي فقال (لو أنزلت هذه علينا لا تخذنا يومها عيدا ) قال ابن عباس فإنها نزلت في يوم عيد في يوم جمعة ويوم عرفة. قال الشيخ الألباني : صحيح الإسناد
“আম্মার ইবন আবী আম্মার (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) সূরা মায়িদার উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করলেন, তখন তাঁর নিকট এক ইয়াহুদী বসে ছিলো। তিনি বলেন, যদি এ আয়াত আমাদের ইয়াহুদীদের ওপর নাযিল হতো, তাহলে আমরা সে দিনকে ‘ঈদের দিন হিসেবে গণ্য করতাম। তখন আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) বলেন, এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে দু’টো ‘ঈদের দিনে। তা হ’ল জুমু‘আর দিন ও ‘আরাফার দিন।” জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ৩০৪৪; আল মু’জামুল কবীর, হাদীস নং ১২৮৩৫; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ১৩৬৮; তাফসীরে ত্বাবারী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ: ৫২৫; তাফসীরে ইবন কাছীর, ৩য় খণ্ড, পৃ: ২৭। সনদ: সহীহ
এ ব্যাপারে অপর হাদীসে এসেছে,
عَنْ نُبَيْشَةَ رضي الله عنه قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم– أَلاَ وَإِنَّ هَذِهِ الأَيَّامَ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ وَذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.
“নুবাইশা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, —-মনে রেখো, এ দিনগুলো হলো পানাহারের দিন এবং মহামহিম আল্লাহর যিকর করার দিন।” সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং ২৮১৫; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ২০৭২৩, ২০৭২৮, ২০৭২৯; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ১২২০০, ১২২০১; সুনানুন নাসাঈ, হাদীস নং ৪২৩০; সুনানুল বাইহাক্বী, হাদীস নং ১৯০০১; শারহু মাআনিল আছার, হাদীস নং ৫৮০৯। হাদীসের মান: সহীহ
‘আরাফায় জোহর-আসর এক সাথে আদায়
যিলহাজ্জ মাসের ৯ তারিখ ফজরের সালাত মিনায় আদায় করে ‘আরাফাতের ময়দানের দিকে রওয়ানা হওয়া। ‘আরাফাতে সূর্য হেলার পর অর্থাৎ ১২টার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করা হাজ্জের গুরুত্বপূর্ণ ফরজ। ‘মাসজিদে নামিরায়’ জোহর ও আছরের জামাত এক আযান দুই ইক্বামাতে একত্রে আদায় করলে একত্রে দুই ওয়াক্ত আদায় হয়ে যায়, ওটার নাম ‘জমে তাক্বদীম’। কিন্তু তাঁবুতে বা অন্য কোন স্থানে একত্রে নয়। ভিন্ন সময়ে ভিন্নভাবে ওয়াক্ত মত আদায় করতে হবে। রসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবায়ি কিরামদেরকে নিয়ে জোহর ও আছর সালাত একসাথে আদায় করেন। বিদায় হাজ্জ সম্পর্কে দীর্ঘ সহীহ হাদীসে এসেছে,
عَنْ جَعْفَرِ بْنِ مُحَمَّدٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ دَخَلْنَا عَلَى جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ رضي الله عنه — أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَتَى بَطْنَ الْوَادِى فَخَطَبَ النَّاسَ وَقَالَ– ثُمَّ أَذَّنَ ثُمَّ أَقَامَ فَصَلَّى الظُّهْرَ ثُمَّ أَقَامَ فَصَلَّى الْعَصْرَ وَلَمْ يُصَلِّ بَيْنَهُمَا شَيْئًا.
“জাফর ইবন মুহাম্মদ (রা) বর্ণিত, তিনি তার পিতার নিকট নিকট হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি জাবির (রা) এর বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসে বর্ণনা করেছেন, —মহানাবী (রা) উপত্যকার মধ্যখানে এলেন। তিনি লোকজনকে লক্ষ্য করে খুতবা দিলেন। অতঃপর আযান দেয়া হল, ইক্বামত হল, এবং তিনি জোহরের সালাত আদায় করলেন। এরপর ইক্বামত হল এবং তিনি আছরের সালাত আদায় করলেন। এ দু’য়ের মাঝখানে অন্য কোনো সালাত আদায় করলেন না।” সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩০০৯; সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং ১৯০৭; সুনানুন নাসাঈ, হাদীস নং ৬০৪, ৬৫৫; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ১৪৫৭, ৩৯৪৪; সুনানু ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩০৭৪; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৯২৩৭; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ২৫৫৫। সনদ: সহীহ

‘আরাফা দিবসের ফজীলত
‘আরাফা দিবসের অনেক ফজীলত সহীহ রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে। যেমন;
১. ‘আরাফা দিবসের সিয়াম দু’বছরের গুণাহের কাফফারা
‘আরাফার দিন সিয়াম পালন করলে এক বছর পূর্বের এবং এক বছর পরের গুনাহ মাফ হয়। সহীহ হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِى قَتَادَةَ رَجُلٌ أَتَى النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ — صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ إِنِّى أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِى قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِى بَعْدَهُ-
“আবু ক্বাতাদাহ (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সা) কে ‘আরাফাহ দিবসের সিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি বলেন,‘আরাফার দিনের সিয়াম, আমি আশা করি বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হিসাবে গ্রহণ করা হয়ে থাকে।” সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮০৩; জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ৭৪৯; সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং ২৪২৭; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৬৩২; শারহু মাআনিল আছার, হাদীস নং ৩০২২; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ১২০৮৩; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ২০৪৪।
অন্য হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِى قَتَادَةَ الأَنْصَارِىِّ رضى الله عنه أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم— عَنْ صَوْمِ يَوْمِ عَرَفَةَ فَقَالَ يُكَفِّرُ السَّنَةَ الْمَاضِيَةَ وَالْبَاقِيَةَ.
“আবু ক্বাতাদাহ (রা) হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সা) কে ‘আরাফার সওম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, ‘আরাফার সওম পালন করলে বিগত একবছর ও আগামী এক বছরের গুণাহ মাফ হয়ে থাকে। এক বর্ণনায় বিগত দুই বছর ও আগামী দুই বছরের গুণাহ মাফ করা হয়ে থাকে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮০৪, মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ২২৫১৭, ২২৫৮৯, ২২৬৫০, ২৪৯৭০, সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৬৩১; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২০৮৭, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম, হাদীস নং ৪১৭৯, সুনানু ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৭৩০, মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা, হাদীস নং ১৩৩৮৮, কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ১২০৮১, ১২০৮২, ১২০৮৫, ২৪৫৬৫; সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ১০১০। সনদ: সহীহ

উল্লেখ্য যে, তবে এ সওম হাজীদের জন্য নয়, বরং যারা হাজ্জ করতে আসেনি তাদের জন্য। হাজীদের জন্য ‘আরাফার দিবসে সওম রাখা মাকরুহ। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বিদায় হাজ্জের সময় ‘আরাফা দিবসে সওম রাখেননি। বরং সবার সম্মুখে তিনি দুধ পান করেছেন। সহীহ সনদে এসেছে,
عَنْ أُمِّ الْفَضْلِ بِنْتِ الْحَارِثِ أَنَّ نَاسًا تَمَارَوْا عِنْدَهَا يَوْمَ عَرَفَةَ فِى صِيَامِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ بَعْضُهُمْ هُوَ صَائِمٌ وَقَالَ بَعْضُهُمْ لَيْسَ بِصَائِمٍ. فَأَرْسَلْتُ إِلَيْهِ بِقَدَحِ لَبَنٍ وَهُوَ وَاقِفٌ عَلَى بَعِيرِهِ بِعَرَفَةَ فَشَرِبَهُ.
“উম্মুল ফজল বিনত হারিস (রা) হতে বর্ণিত যে, লোকেরা ‘আরাফার দিন তার নিকট রসূলুল্লাহ (সা) এর সওম পালন (করা না করা) সম্পর্কে আলোচনা করছিলো। তাদের কেউ কেউ বললেন, তিনি সওমরত নন। এরপর আমি তার নিকট এক পেয়ালা দুধ পাঠালাম, তিনি ‘আরাফাতে উটের ওপর বসা অবস্থায় ছিলেন। দুধটুকু তিনি তখনই পান করলেন।” সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ১৫৭৮, ১৮৮৭, ৫২৯৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৮৮, ২৬৯১; আল মু’জামুল কবীর, হাদীস নং ৩৬; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৯২৫৩; মুয়াত্বা ইমাম মালিক, হাদীস নং ১৩৮৯; সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং ২৪৪৩; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৬০৬; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২৮২৮; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ২০৪২। সনদ: সহীহ
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে,
عَنْ عِكْرِمَةُ مَوْلَى ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ دَخَلْتُ عَلَى أَبِي هُرَيْرَةَ فِي بَيْتِهِ فَسَأَلْتُهُ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ عَرَفَةَ بِعَرَفَاتٍ فَقَالَ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ عَرَفَةَ بِعَرَفَاتٍ.
“ইকরামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হুরায়রা (রা) এর বাড়িতে প্রবেশ করে ‘আরাফা দিবসে ‘আরাফার ময়দানে থাকা অবস্থায় সওমের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) ‘আরাফার ময়দানে ‘আরাফা দিবসের সওম রাখতে নিষেধ করেছেন। ‘আরাফার দিনে সিয়াম পালন করবেন তারাই যারা হাজ্জব্রত পালন করেন না। অর্থাৎ ‘আরাফা ময়দানের বাইরে পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের মুসলিম এ সিয়াম পালন করবেন।” মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ৮০৩১; আল মুসতাদরাক আলাস সহীহাইন, হাদীস নং ১৫৮৭; আল মু’জামুল আওসাত্ব, হাদীস নং ২৫৫৬; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২১০১; সুনানু ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৭৩২; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা, হাদীস নং ১৩৩৮৫। সনদ: আহমাদ শাকির বলেন, সনদ: সহীহ, অন্যমতে, সনদ হাসান ও জয়ীফ

২. ‘আরাফা দিবস গুনাহ মাফ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের দিন
এ দিনে আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের মধ্য থেকে অধিক সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। হাদীসে এসেছে,
عَنِ ابْنِ الْمُسَيَّبِ قَالَ قَالَتْ عَائِشَةُ رضى الله عنها إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللَّهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النَّارِ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ وَإِنَّهُ لَيَدْنُو ثُمَّ يُبَاهِى بِهِمُ الْمَلاَئِكَةَ فَيَقُولُ مَا أَرَادَ هَؤُلاَءِ.
“‘আয়িশা (রা) হ’তে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘আরাফার দিন আল্লাহ রববুল ‘আলামীন তাঁর বান্দাদের এত অধিক সংখ্যক জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, যা অন্য কোনো দিনে দেন না। তিনি এ দিনে বান্দাদের নিকটবর্তী হন ও তাদের নিয়ে ফিরিশতাদের কাছে গর্ব করে বলেন, তোমরা কি বলতে পার আমার এ বান্দারা আমার কাছে কি চায়?” সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৩৫৪; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২৮২৭; আস সিলসিলাহ আস সহীহাহ, হাদীস নং ২৫৫১; সুনানু ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩০১৪; আল মু’জামুল আওসাত্ব লিত ত্বাবারানী, হাদীস নং ৯১৩৪; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৯২৬৩; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ৪০৬৮; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ১২০৭২; সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ১১৫৪; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ২৫৯৪। সনদ: সহীহ। ইমাম নববী (রহ) বলেন, এ হাদীসটি ‘আরাফা দিবসের ফজীলতের একটি স্পষ্ট প্রমাণ। ইবন আব্দুল বার (রহ) বলেন, এ দিনে মু’মিন বান্দারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হন। কেননা আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন গুনাহগারদের নিয়ে ফিরিশতাদের কাছে গর্ব করেন না। তবে তাওবা করার মাধ্যমে ক্ষমা-প্রাপ্তির পরই তা সম্ভব। হাদীসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضى الله عنه قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا كَانَ يَوْمُ عَرَفَةَ، إِنَّ اللهَ يَنْزِلُ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا، فَيُبَاهِيْ بِهِمُ الْمَلائِكَةَ، فَيَقُوْلُ : انْظُرُوْا إِلَى عِبَادِيْ أَتَوْنِيْ شُعْثًا غُبْرًا-
“আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলে কারীম (সা) বলেছেন, যখন ‘আরাফার দিন হয়, তখন আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন। অতঃপর তিনি আরাফায় অবস্থানকারীদের নিয়ে ফিরিশতাদের নিকটে গর্ব করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার এ সকল বান্দাদের দিকে চেয়ে দেখ। তারা এলোমেলো কেশ ও ধূলায় ধূসরিত হয়ে আমার কাছে এসেছে।” মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ৮০৪৭; আল মুসতাদরাক আলাস সহীহাইন, হাদীস নং ১৭০৮; আল মু’জামুস সগীর, হাদীস নং ৫৭৫; সুনানু ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৮০১; আস সিলসিলা আস হীহাহ হাদীস নং ৬৬১; সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ১১৩২, ১১৫২; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ৩৫১৯৬; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ২৬০১। সনদ: সহীহ

৩. ‘আরাফায় অবস্থানই হাজ্জ
এ কথা সহীহ বর্ণনায় এসেছে যে, আরাফায় অবস্থানই হাজ্জের মূল কাজ। ৯ যিলহাজ্জ ভোরে ফজরের সালাত মিনায় আদায় করে সূর্যোদয়ের পর ‘তালবিয়া’ পড়া অবস্থায় রওয়ানা হতে হয় আরাফা অভিমুখে। তবে সাধারণত হাজীদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ৯ যিলহাজ্জ রাতেই সৌদি মুয়াল্লিমগণ কর্তৃক হাজীদের আরাফায় পৌঁছানো হয়। হাদীসে এসেছে,
عن عبد الرَّحْمَنِ بْنَ يَعْمَرَ الدِّيلِيَّ يَقُولُ شَهِدْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ وَاقِفٌ بِعَرَفَةَ وَأَتَاهُ نَاسٌ مِنْ أَهْلِ نَجْدٍ فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ الْحَجُّ فَقَالَ الْحَجُّ عَرَفَةُ فَمَنْ جَاءَ قَبْلَ صَلَاةِ الْفَجْرِ مِنْ لَيْلَةِ جَمْعٍ فَقَدْ تَمَّ حَجُّهُ أَيَّامُ مِنًى ثَلَاثَةُ أَيَّامٍ { فَمَنْ تَعَجَّلَ فِي يَوْمَيْنِ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ وَمَنْ تَأَخَّرَ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ } ثُمَّ أَرْدَفَ رَجُلًا خَلْفَهُ فَجَعَلَ يُنَادِي بِهِنَّ. قال الشيخ الألباني : صحيح
“আব্দুর রহমান ইবন ইয়ামার আদ দায়লী (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সা) এর ‘আরাফাতে উপস্থিতকালে তার নিকট উপস্থিত ছিলাম। এমতাবস্থায় নাজদবাসী কিছু লোক তাঁর নিকটে আসলো। তারা হাজ্জ সম্পর্কে তাঁকে প্রশ্ন করলো এবং বললো ইয়া রসূলুল্লাহ (সা)! হাজ্জ কীভাবে সম্পন্ন হয়? তিনি বললেন, ‘আরাফায় অবস্থানই হচ্ছে হাজ্জ। অতএব যে ব্যক্তি মুযদালিফার রাতে ফজর সালাতের পূর্বেই ‘আরাফাতে এসে পৌঁছতে পারলো তার হাজ্জ পূর্ণ হলো। মিনায় তিন দিন (১১, ১২ ও ১৩ যিলহাজ্জ) অবস্থান করতে হয়। কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তি দুই দিন অবস্থান করে চলে আসে তাতে কোনো অপরাধ নেই। আর তিন দিন পর্যন্ত অবস্থানকে কোনো লোক বিলম্বিত করলে তাতেও কোনো সমস্যা নেই। অত:পর এক লোককে রসূলুল্লাহ (সা) তার পিছনে আরোহন করালেন এবং সে লোক তা উচ্চস্বরে ঘোষণা দিতে থাকলো।” মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ১৮৭৭৪; জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ৮৮৯; সুনানু ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩০১৫; আল মুসতাদরাক আলাস সহীহাইন, হাদীস নং ১৭০৩, ৩১০০; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৯৫৯৩; সুনানুদ দারি কুতনী, হাদীস নং ১৯; সুনানুন নাসাঈ, হাদীস নং ৩০১৬, ৩০৪৪; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২৮২২; মুসনাদুত ত্বায়ালিসী, হাদীস নং ১৩০৯; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা, হাদীস নং ১৩৬৮৩; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ১২০৬১, ১২০৬৫; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ২৭১৪। সনদ: সহীহ

৪. অধিক পরিমাণে দো‘আ ও যিকর করার উপযুক্ত সময়
ময়দানে ‘আরাফায় দোআ করাই হাজ্জের মুখ্যম ও অন্যতম ইবাদত। এ প্রসঙ্গে মহানাবী (সা) বলেছেন,
عَنْ طَلْحَةَ بْنِ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ كَرِيزعَائِشَةُ رضى الله عنه أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ خَيْرُالدُّعَاءِ دُعَاءُ يَوْمِ عَرَفَةَ وَخَيْرُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّوْنَ مِنْ قَبْلِى لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيْرٌ-
“ত্বালহা ইবন উবাইদুল্লাহ ইবন কারিয হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘সবচেয়ে উত্তম দো‘আ হ’ল ‘আরাফা দিবসের দো‘আ। আর সর্বশ্রেষ্ঠ কথা যা আমি বলি ও আমার পূর্ববর্তী নবীগণ বলেছেন। তা হ’ল, আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোন ইলাহ নেই, রাজত্ব তাঁরই, সকল প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য এবং তিনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান।” জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৮৫; সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ১৫৩৬; মুয়াত্বা ইমাম মালিক, হাদীস নং ৭২৬, ১৫৯৮; সুনানুল বাইহাক্বী আল কুবরা, হাদীস নং ৮১৭৪, ৯২৫৬; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ৪০৭২; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ৮১২৫; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ১২০৭৯; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ২৫৯৮, সনদ সহীহ।
অন্য হাদীসে এসেছে
عَنْ عَائِشَةَ رضى الله عنها قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَسْتَحِبُّ الْجَوَامِعَ مِنَ الدُّعَاءِ وَيَدَعُ مَا سِوَى ذَلِكَ. قال الألباني : صحيح .
“‘আয়িশা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) পরিব্যাপ্ত দো’আ পছন্দ করতেন ও অন্যগুলো ছেড়ে দিতেন।” সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং ১৪৮৪; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা, হাদীস নং ২৯১৬৫; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ৪৯১৯, ১৮০২১; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ২২৪৬। সনদ: সহীহ
অপর হাদীসে এসেছে,
عن ابن عباس رضى الله عنهما قال كان رسول الله صلى الله عليه و سلم إذا دعا جعل باطن كفه إلى وجهه.
“আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) দোআ করার সময় হাতের তালু চেহারার দিকে রাখতেন।” আল মু’জামুল কবীর, হাদীস নং ১২২৩৪; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ১৮০১৫।
এসব হাদীসের ব্যাখ্যায় ইবন আব্দুল বার (রহ) বলেন, এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ‘আরাফাহ দিবসের দো‘আ নিশ্চিতভাবে কবুল হবে। আর সর্বোত্তম যিকর হ’ল ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। ইবন আব্দুল বার, আত-তামহীদ।
ইমাম খাত্ত্বাবী (রহ) বলেন, এ হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, দো‘আ করার সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা ও তাঁর মহত্বের ঘোষণা করা উচিত। ইমাম খাত্ত্বাবী, আদ-দো‘আ, পৃ: ২০৬।

৫. উকুফে ‘আরাফা দিবস আল্লাহর দ্বীন ও নিয়ামত পরিপূর্ণতা প্রাপ্তির দিবস
‘আরাফার দিন মুসলমানদের জিম্মাদারী গ্রহণের দিন, মুসলিম উম্মার জন্য আল্লাহর দীন ও নিয়ামত পরিপূর্ণতা এবং দীনের প্রতি আল্লাহ তাআলার রেজামন্দী ঘোষিত হয়েছে। সহীহ সনদে এসেছে,
عن أنس بن مالك رضى الله عنه قال وقف النبي صلى الله عليه وسلم بعرفات وقد كادت الشمس أن تغرب فقال يا بلال أنصت لي الناس فقام بلال فقال أنصتوا لرسول الله صلى الله عليه وسلم فأنصت الناس فقال معشر الناس أتاني جبرائيل عليه السلام آنفا فأقرأني من ربي السلام وقال إن الله عز وجل غفر لاهل عرفات وأهل المشعر وضمن عنهم التبعات فقام عمر بن الخطاب رضي الله عنه فقال يا رسول الله هذا لنا خاصة قال هذا لكم ولمن أتى من بعدكم إلى يوم القيامة فقال عمر بن الخطاب رضي الله عنه كثر خير الله وطاب.
“আনাস ইবন মালিক (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রসূলুল্লাহ (ﷺ) ‘আরাফার ময়দানে সূর্যাস্তের পূর্বে বেলালকে (রা) নির্দেশ দিলেন মানুষদেরকে চুপ করাতে। বেলাল বললেন, আপনারা রসূলুল্লাহ (রা) এর জন্য নীরবতা অবলম্বন করুন। জনতা নীরব হল। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘হে লোকসকল! একটু পূর্বে জিবরাইল আমার কাছে এসেছেন। তিনি আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আহলে ‘আরাফা ও আহলে মুযদালিফার জন্য আমার কাছে সালাম পৌঁছিয়েছেন ও তাদের অন্যায়ের জিম্মাদারি নিয়েছেন। ‘উমর দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ)! এটা কি শুধুই আমাদের জন্য? তিনি বললেন, এটা তোমাদের জন্য ও তোমাদের পর ক্বিয়ামত পর্যন্ত যারা আসবে তাদের জন্য। ‘উমর (রা) বললেন, আল্লাহর অনুকম্পা অঢেল ও উত্তম।” সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ১১৫১। সনদ: সহীহ

৬. আদম সন্তান হতে প্রতিশ্রুতির দিন
এটি এমন দিন যেদিন আল্লাহ তাআলা বনী আদম থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন। হাদীসে এসেছে,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رضى الله عنهما عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ أَخَذَ اللَّهُ الْمِيثَاقَ مِنْ ظَهْرِ آدَمَ بِنَعْمَانَ يَعْنِي عَرَفَةَ فَأَخْرَجَ مِنْ صُلْبِهِ كُلَّ ذُرِّيَّةٍ ذَرَأَهَا فَنَثَرَهُمْ بَيْنَ يَدَيْهِ كَالذَّرِّ ثُمَّ كَلَّمَهُمْ قِبَلًا قَالَ { أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا أَنْ تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِينَ أَوْ تَقُولُوا إِنَّمَا أَشْرَكَ آبَاؤُنَا مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا ذُرِّيَّةً مِنْ بَعْدِهِمْ أَفَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ الْمُبْطِلُونَ }
“আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন যে, “নিশ্চয় আল্লাহ না’মানে অর্থাৎ ‘আরাফার ময়দানে আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। তিনি আদমের মেরুদন্ডে তাঁর যত বংশধরদের রেখেছেন তাদের সবাইকে বের করে এনে অণুর মত তাঁর সামনে ছড়িয়ে দেন। এরপর সরাসরি তাদের সাথে কথা বলেন। তিনি বলেন, আমি কি তোমাদের প্রভু নই? তারা সকলে বলে, হ্যাঁ অবশ্যই; আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি। এটা এ জন্যে যে, তোমরা যেন ক্বিয়ামতের দিন না বল, ‘আমরা তো এ বিষয়ে গাফেল ছিলাম। কিংবা তোমরা যেন না বল, আমাদের পিতৃপুরুষরাও তো আমাদের আগে শির্ক করেছে, আর আমরা তো তাদের পরবর্তী বংশধর; তবে কি (শিরকের মাধ্যমে) যারা তাদের আমলকে বাতিল করেছে তাদের কৃতকর্মের জন্য আপনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন।”[সূরা আল আরাফ, আয়াত: ১৭২-১৭৩] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ২৪৫৫; আস সিলসিলাতুস সহীহাহ, হাদীস নং ১৬২৩; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ১৫১২৪; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ১২১। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। অতএব, কতই না মহান সেই দিন এবং কতইনা মহান সে প্রতিশ্রুতি।

৭. ‘আরাফার ময়দানে হাজীদের করণীয় কাজগুলো
১) ‘আরাফায় পৌঁছে মাসজিদে ‘নামিরা’র কাছে অবস্থান করা মুস্তাহাব তথা উত্তম। সেখানে জায়গা না পেলে ‘আরাফার সীমানার ভিতরে যে কোন স্থানে অবস্থান করা যাবে, এতে কোন অসুবিধা নেই। তবে পাশেই ‘উরানা’ নামের একটি উপত্যকা আছে। সেটি ‘আরাফার চৌহদ্দির বাইরে। কাজেই সেখানে যাওয়া যাবে না। ঐখানে অবস্থান করা যাবে না।
২) জোহরের ওয়াক্ত হলে ইমাম সাহেব খুতবা দেবেন। খুতবার পর জোহরের ওয়াক্তেই জোহর ও আছরের সালাত একত্রে জমা করে পড়বেন। দুই সালাতেরই আযান একবার, কিন্তু ইকামাত দুইবার। কসর করে সালাত আদায়। অর্থাৎ জোহর দুই রাকআত এবং আছরও দুই রাকআত পড়া। জোহরের ওয়াক্তেই আছর আদায় করা। মহানাবী (সা) মাক্কাবাসী ও বহিরাগত সব হাজীকে নিয়ে একত্রে এভাবে সালাত আদায় করেছিলেন। এটা সফরের কসর নয়, বরং হাজ্জের কসর। কোন নফল-সুন্নাত সালাত আরাফায় আদায় করা হয় নাা। কারণ রসূলুল্লাহ (সা) তা করেননি।
৩) মাসজিদে নামিরায় যেতে না পারলে নিজ নিজ তাঁবুতেই উপরে বর্ণিত পদ্ধতিতে জামা‘আতের সাথে জোহর-আছর একত্রে জোহরের আউয়াল ওয়াক্তে দুই দুই রাক‘আত করে কসর ও জমা করে আদায় করা।
৪) ‘আরাফার ময়দানের সীমানা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে অবশ্যই ‘আরাফার পরিসীমার ভিতরে অবস্থান করতে হবে। ‘আরাফার সীমানা চিহ্নিত করে চতুষ্পার্শে অনেক পিলার দেয়া আছে। এর বাইরে অবস্থান করলে হাজ্জ হবে না।
৫) সুন্নাত হলো বেশী বেশী দোআ করা, দোআর সময় হাত উঠানো, অত্যন্ত বিনম্র হওয়া, যিকর করা, তাসবীহ পড়া, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়া, তাওবাহ-ইস্তিগফার করা, কান্নাকাটি করে গোনাহ মাফ চাওয়া, মাতা-পিতা, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, আপনজন ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য বেশী বেশী দোআ করা। তাছাড়া নীচের দো’আটি আরো বেশী বেশী পড়া উত্তম.
لاَ إِلٰهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَه لاَ شَرِيكَ لَه لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ১৭০৩, ২৮৩৩, ৩৮৯০, ৬০২২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৩৪৩; জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ৯৫০, ৩৫৮৫।
এছাড়া নীচের তাসবীহটি বেশী বেশী পড়া;
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهৃ وَسُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيْمِ
“সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী সুবহানাল্লাহিল আজীম।” সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৬০৪৩, ৬৩০৪, ৭১২৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭০২১, মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ৭১৬৭, জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪৬৭; সুনানু ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৮০৬; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা, হাদীস নং ২৯৪১৩, ৩৫০২৬; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৮৩১, ৮৪১। এতদসঙ্গে অন্যান্য মাসনূন দোআ সূর্যাস্ত পর্যন্ত করা যাবে। সওয়াব কমে যাবে এমন কোন কাজ করা থেকে সাবধান থাকতে হবে।
৬) যখন সূর্য ডুবে যাবে এবং সূর্য অস্ত গিয়েছে এরূপ নিশ্চিত হবেন তখন প্রশান্ত মনে ধীরে সুস্থে মুযদালিফায় রওয়ানা দিবেন। এ সময় বেশী বেশী তালবিয়াহ পড়তে থাকবেন। সাবধান, কোন অবস্থাতেই সূর্যাস্তের আগে ‘আরাফার ময়দান ত্যাগ করা যাবে না।

৮. ‘আরাফার সওম কোনদিন
‘আরাফার সওম কোনদিন রাখতে হবে, এ নিয়ে দু’টি মত পাওয়া যায়। এক: হাজী সাহেবগণ যেদিন ‘আরাফায় অবস্থান করবেন, সেদিনটিই গণ্য হবে। কেননা হাদীসে বলা হয়েছে, সওমু ইয়াওমি ‘আরাফা তথা ‘আরাফার দিবসের সাওম। দুই: হাজী সাহেবগণ ৯ যিলহাজ্জ ‘আরাফায় অবস্থান করেন, হেতু যে দেশের যেদিন ৯ যিলহাজ্জ হবে, সেদিন সেদেশে ‘আরাফার সওম রাখা। দু’মতের পক্ষেই দলীল ও যুক্তি নিহিত রয়েছে। তবে ‘আরাফার প্রথম দশদিন অত্যন্ত ফজীলত ও মর্যাদাপূর্ণ হেতু কেউ হাজীদের ‘আরাফায় অবস্থানের দিন এবং সংশ্লিষ্ট দেশের ৯ যিলহাজ্জ সওম পালন করে, তাহলে সেটিও উত্তম হতে পারে বলে ইসলামিক স্কলার্সগণ মতামত দিয়েছেন। ইসলামিক স্কলার্সগণ আরো বলেন, যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন অত্যন্ত ফজীলতপূর্ণ হওয়ায় ১ম যিলহাজ্জ হতে ৯ যিলহাজ্জ পর্যন্ত লাগাতর সিয়াম পালন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, হেতু এ দিবসসমূহে সিয়াম সহ বহুবিধ ‘আমল করার চেষ্টা করা দরকার।

অতএব, ‘আরাফা দিবসের গুরুত্ব ও ফজীলত অনুধাবন করতঃ এ দিবসে সিয়াম সহ বহুবিধ আমলে সবাইকে সচেষ্ট হওয়া দরকার। যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশকে ‘ইবাদতের ফজীলতও অত্যধিক। সে ব্যাপারেও আমাদেরকে যত্নবান হতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাউফীক দান করুন। আমীন।

মুহাদ্দিস ডক্টর এনামুল হক
সহকারী অধ্যাপক (প্রধান মুহাদ্দিস, কামিল হাদীস বিভাগ)
বিজুল দারুল হুদা কামিল স্নাতকোত্তর মাদরাসা
বিরামপুর, দিনাজপুর।
01716797974 (offline); 01959992914 (online)
dr.anambirampur@.Gmail.com

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com