এফ শাহজাহান / মনছুর রহমান
ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক নবান্ন উৎসবে মুখরিত হয়ে উঠেছে জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বেগুনগ্রাম চিশতীয়া পীরের আস্তানা।
অর্ধশত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই নবান্ন উৎসবে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৩০ হাজার লোকের সমাগম হয়েছে। উৎসবে বিশেষভাবে রান্না করা প্রায় দেড় হাজার মন ‘ক্ষীর’ দিয়ে আপ্যায়ন করা হবে পীর ভক্তদের। নবান্ন উৎসবকে ঘিরে কালাই উপজেলা জুড়ে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ ।
ঐতিহ্যবাহি এই নবান্ন উৎসবে এবার ১০৫ মন চাল,২০০ মন দুধ, ৯৮ মন গুড় এবং দেড় হাজার নারিকেল দিয়ে প্রায় দেড় হাজার মন ওজনের ক্ষীর রান্না করা হচ্ছে। ৪০০ জন স্বেচ্ছাসেবি রাতভর পরিশ্রম করে সকাল থেকে ৩২টি চুলায় ক্ষীর রান্নায় ব্যস্ত রয়েছেন। শুক্রবার রাতে হালকা জিকির শেষে ভক্তদের মাঝে ক্ষীর পরিবেশন করা হবে।
আস্তানা পরিচালনা কমিটির সহ-সাধারন সম্পাদক সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, এবার লোকজনের সমাগম বেশী। ক্ষীর ছাড়াও দুপুরে খাবারের জন্য ৪০ মণ চালের ভাত, ২৫০ কেজি খাসির মাংস ও ৪৫ মণ আলু দিয়ে রানা করা হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী আলুঘাটি। জুমার নামাজের পর দুপুরে ভক্তদের মাঝে খাবার পরিবেশন করা হবে।
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এতো বড় আকারের বিশেষায়িত নবান্ন উৎসব পালিত হওয়ার কোন রেকর্ড এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।
ত্রয়োদশ শতাব্দীর পারস্য বংশোদ্ভূত এবং ভারতের আজমীর শরীফের বিখ্যাত সুফি সাধক গরীবে নেওয়াজ খাজা মইনুদ্দিন চিশতী (রহ.) এর অনুসারী হযরত খাজা শাহ মাওলানা মো.আব্দুল গফুর চিশতী (রা.)। তিনি ১৯৬৫ সালে বেগুন গ্রামে অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার থেকে ভক্তদের সম্মিলিত আয়োজনে এই নবান্ন উৎসব পালনের সূচনা করেন। সেই থেকে আজও নবান্ন উৎসব চলমান রয়েছে।’
নবান্ন উৎসবের বর্নাঢ্য আয়োজন সাধারণত গ্রামীণ জনপদগুলোতে হয়ে থাকে। এর মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে নবান্ন উৎসব পালিত হয় বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদে।
বাংলাদেশের মধ্যে বগুড়ার শিবগঞ্জের পিরব, জামুরহাট ও বুড়িগঞ্জহাট সহ বিভিন্ন অঞ্চলে ‘জামাই মেলা’ নামে পরিচিত বিশাল মেলার আয়োজন করা হয় নবান্ন উপলক্ষ্যে। সেখানে বড় বড় মাছের দোকান বসে। নতুন ধান কাটা উপলক্ষে মাছের মেলা, পিঠাপুলি, বাউল গান, লোকনৃত্য ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে ব্যাপক ও ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসব উদযাপন করা হয়। যা শেকড়ের সংস্কৃতির এক বিশাল মিলনক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশের জয়পুরহাট জেলার কালাইয়ের বেগুনগ্রামে চিশতিয়া তরিকার পীরের আস্তানায় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে অনুষ্ঠানিকভাবে সবচেয়ে বড় নবান্ন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ৫০ বছর আগে থেকে। এটি ভারতীয় উপমমহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় নবান্ন উৎসব হিসেবে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। এখানকার নবান্ন উৎসবের বিশেষ আকর্ষন চালের সঙ্গে গুড়-নারকেল-দুধ মিশিয়ে রান্না করা ‘ক্ষীর’।
বাংলা বর্ষের অগ্রাহয়ণ মাসের প্রথম বৃহস্পতিবারে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার বেগুনগ্রামে চিশতীয়া তরিকার পীরের আস্তানায় নবান্ন উৎসবের আয়োজন করেছেন পীরের ভক্ত অনুরাগীরা।
আগের দিন বুধবার থেকেই চলছে তাদের নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতি। শুক্রবার সকাল থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত চলবে এই নবান্ন উৎসব।
পীরের আস্তানার ভান্ডার খানার তথ্য মতে, ক্ষীর রান্নার প্রধান উপকরণ চাল, গুড়, দুধ ও নারিকেল। ক্ষীর রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশাল দুটি হাউস। ক্ষীর রান্নার কাজে সহযোগিতার জন্য ৪শ জন ভক্ত স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন।
সরেজমিনে গিয়ে আস্তানা দেখা যায় ,বেগুনগ্রাম চিশতীয়া তরিকার পীর আব্দুল গফুর চিশতী (রা:)। তার অনুসারীদের যেন ব্যস্ততার শেষ নেই। সকাল থেকে দূর দূরান্ত থেকে আসতে শুরু করেছের হাজার হাজার ভক্ত।
একসঙ্গে ৩২টি চুলায় রান্না করা হচ্ছে ক্ষীর। সকাল থেকে রান্না শুরু হলেও চলবে ২০ নভেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত। স্বেচ্ছাসেবীদের দম ফেলানোর সময় নেই। কেউ গুড়, কেউ নারিকেল ভাঙছেন আবার কেউ রান্না করে চলেছেন। রান্না হয়ে গেলে হাউসে রাখা হচ্ছে সেই ক্ষীর।
নবান্ন উৎসবে পীরের আস্তানায় বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার ভক্ত জমায়েত হয়েছেন। নবান্ন উপলক্ষ্যে এই গ্রামের মানুষরা তাদের জামাই-মেয়েসহ আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত করেছেন। উৎসবকে কেন্দ্র করে চলছে নবান্ন মেলা।
প্রতিটি ঘরে ঘরে চলছে ক্ষীর, পায়েস, মাছ ও মাংস রান্না। এই মেলাকে ঘিরে রাস্তার দুই পাশে বসেছে খাবার সামগ্রী ও মিষ্টান্নের দোকান। এছাড়াও সাংসারিক নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের দোকানও বসেছে।
বেগুনগ্রাম চৌধুরীপাড়ার বাসিন্দা ও পীরভক্ত তোতা চৌধুরী বলেন,‘প্রায় শত বছর আগে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষে থাকা অবস্থায় কুমিল্লা জেলার হযরত খাজা শাহ মাওলানা মো.আব্দুল গফুর চিশতী (রা:) বেগুনগ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। সে সময় এই এলাকার মানুষরা অভাবগ্রস্থ ছিলেন। বছরে প্রতি বিঘায় আমন ধান হতো ৬-৮ মণ। এরফলে এলাকায় অভাব অনটন বিরাজ করতো।
এই এলাকার মানুষের উপর আল্লাহর রহমত ও বরকতের মাধ্যমে অভাব-অনটন দূর করার জন্য অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার হালকায়ে জিকিরের আয়োজন করতেন পীর সাহেব। হালকায়ে জিকির শেষে এলাকার মানুষের মাঝে নতুন চাল ও গুড় দিয়ে তৈরি ক্ষীর সবার মাঝে বিতরণ করতেন। সেই থেকে এই আস্তানায় নবান্ন উৎসবে ক্ষীর রান্নার আয়োজন চলে আসছে।
বাবুর্চি আব্দুল মান্নান বলেন, একযোগে ৩২টি চুলায় ক্ষীর রান্না করা হচ্ছে। ফজরের নামাজের পর থেকে শুরু হয়েছে। এই ক্ষীরগুলো রাতে পীর সাহেবের ভক্তদের খাওয়ানো হবে।
নবান্ন উৎসব কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন বলেন, বেগুনগ্রাম পীরের মাজারে যে নবান্ন উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তা শুধু কোন নির্দিষ্ট এলাকা ভিত্তিক নয়, পুরো উত্তরবঙ্গের জনপ্রিয় এই নবান্ন উৎসব।
পীরের ভক্ত আহসান চৌধুরী বলেন, এই নবান্ন অনুষ্ঠান অনেক পুরনো। এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। আস্তানায় নবান্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাম বাংলার সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছেন পীরের ভক্তরা।
কালাই থানার ওসি জাহিদ হোসেন বলেন, নবান্ন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মাজার এলাকায় আইনশৃংখলা পরিস্থতি ঠিক রাখার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যাতে করে আস্তানা এলাকায় কোনো অঘটন না ঘটে।
Leave a Reply