১২ কারণে নির্বাচনে হারতে পারে বিএনপি

Reporter Name
    সময় : বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ৭:৩৫ অপরাহ্ণ
  • ৭০২ Time View
এফ শাহজাহান :
বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা। এই নির্বাচন বিএনপির জন্য যতটা না ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ, তার চেয়েও বেশি একটি কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে সামনে আসছে।
দীর্ঘ আন্দোলন, সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, এবং ভোটারদের একটি বড় অংশের পরিবর্তনের কারণে আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও বিএনপি ধীরে ধীরে জনসমর্থনের মাঠ হারাচ্ছে। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে বিএনপির রাজনৈতিক ভুলগুলো আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সব ন্যারেটিভ ভেঙ্গে দিয়েছে। জেন-জি’রা রক্ত ও জীবন দিয়ে এখন নতুন বাংলাদেশ গড়ার এমন এক ‘নিও-ন্যারেটিভ’ গড়ে তুলেছে,যা অনুধাবন করতে দেরি করে ফেলেছে বিএনপি।
এরফলে জুলাই বিপ্লবের পর থেকে এখন পর্যন্ত রাজনীতির মাঠে বিএনপি বেশ কিছু বড় বড় ভুল করে ফেলেছে। বিএনপিকে সেই সব ভুলের বড়-সড় খেসারত দিতে হতে পারে আসন্ন নির্বাচনে।
প্রথমত : জুলাই বিপ্লবের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান
জেন-জি’র জুলাই বিপ্লবকে বিএনপি কখনোই বিপ্লব হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনাও ধারণ করতে পারেনি। যে পরিবর্তনের জন্য মাত্র কয়েকদিনে ১৪০০ মানুষ জীবন দিয়েছেন, সেই পরিবর্তনের সঙ্গেও নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারেনি। ফলে জুলাই ঘোষণা, জুলাই জাতীয় সনদ এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি বার বার জুলাই বিপ্লবের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, আমাদের জুলাই সনদের প্রয়োজন নেই। একটি সংসদ প্রয়োজন, যারা গণতন্ত্রকে বাস্তবায়ন করবে। ১ নভেম্বর শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে মুক্তিযোদ্ধা দলের আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। ( ইত্তেফাক ডিজিটাল রিপোর্ট : ০১ নভেম্বর ২০২৫, ১৫:০৬ )( বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: ০১ নভেম্বর ২০২৫,৭:৪৬ পিএম )
চব্বিশের জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী বাস্তবতায় তরুণ ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক সংস্কার শুধু একটি স্লোগান নয়। এটি একটি দাবি। তারা চায় ক্ষমতার ভারসাম্য,জবাবদিহি এবং ফ্যাসিবাদী পুরনো রাজনৈতিক চক্রের অবসান। বিএনপি তরুনদের জুলাই বিপ্লবের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তরুণ ভোটারদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে তরুণদের একটি বড় অংশ বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ভোটবিমুখ হচ্ছে এবং জামায়াতসহ অন্যান্য শক্তির দিকে ঝুঁকছে।
জামায়াত এই ইস্যুতে শুরু থেকেই তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট অবস্থানে থেকেছে। তারা প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নিজেদের তুলে ধরছে—পরিবর্তনের পক্ষের শক্তি হিসেবে। জনগণের দাবির সঙ্গে সংযুক্ত দল হিসেবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি বিরোধী রাজনীতির নেতৃত্ব কার হাতে যাবে সেই লড়াইও। বিএনপি যদি নিজেদের ভুল সংশোধন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এই শূন্যতা পূরণ করবে জামায়াত।
রাজনীতিতে শুধু জনপ্রিয়তা নয়, সংগঠন, কৌশল ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই জয় নির্ধারণ করে। এই তিনটি জায়গায় জামায়াত এগিয়ে, আর সেখানেই বিএনপি পিছিয়ে পড়ছে।
দ্বিতীয়ত : গণভোটে দ্বিচারিতা
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একই দিনে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।দেশের অধিকাংশ মানুষ গণভোটে ‘হাঁ’ভোটের পক্ষে থাকলেও বিএনপি জনমতকে গুরুত্ব না দিয়ে শুরু থেকেই বেশ জোরালোভাবে ‘না’ ভোটের পক্ষ নিয়েছে। প্রথমে তারা জনগণের পালস বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। এখন পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাওয়ায় বিএনপির শীর্ষ নেতারা ‘হাঁ’ ভোটের কথা বললেও কর্মীরা এখনো ‘না’ ভোটের পক্ষেই প্রচারণা চালাচ্ছেন। গণভোট নিয়ে বিএনপির এই দ্বিচারিতার কারণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের ফলাফল খারাপ হতে পারে।
অবস্থা বেগতিক দেখে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি ‘হাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলার পরও বিএনপির নেতারা আগের সেই না ভোটের পক্ষেই এখনো প্রচারণা চালাচ্ছেন। এতে করে গণভোট নিয়ে বিএনপির দ্বিচারিতা ফাঁস হয়ে গছে।
সম্প্রতি ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান। গত ২৮ জানুয়ারি বুধবার রাতে নিজের ফেসবুক আইডিতে এই পোস্ট করেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে নাজিমুর রহমান লেখেন, ‘গণভোট প্রতারণার ফাঁদ, জোর করে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি না ভোটের পক্ষে। গণতন্ত্র আর দেশের স্বার্থে আপনিও না ভোট দিন।’ জানতে চাইলে না ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার কথা স্বীকার করেন নগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এমদাদুল হক মুকুল গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে ভোটারদের উদ্দেশে বলেছেন,“না” ভোট দিবেন।“হ্যাঁ” ভোট দিলে মুন্সিরঘর (মৌলভিদের) জয়যুক্ত হবে।’ দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি ধানের শীষের পাশাপাশি গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তার এমন প্রচারণার একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
২৩ জানুয়ারি শুক্রবার কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটারদের মাঝে প্রচারণা চালানোর সময় বিএনপি নেতা মুকুল ও তার সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরা নিজ দলের প্রতীক ধানের শীষের সঙ্গে গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালান। এ সময় তারা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কী হবে এবং ‘না’ ভোট দিলে কী হবে তা নিয়ে ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করেন।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবার শুধু সরকার গঠনের লড়াই নয়; একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া রাজনৈতিক সংস্কারবিষয়ক গণভোট এই নির্বাচনকে পরিণত করেছে একটি যুগান্তকারী রাজনৈতিক মুহূর্তে। দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক কাঠামো বদলের প্রবল জনআকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষাপটে এই গণভোটকে দেখছেন অনেকেই একটি নতুন রাজনৈতিক চুক্তি হিসেবে।
এই বাস্তবতায় দেশের বৃহৎ অংশের মানুষ যেখানে গণভোটে ‘হাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, সেখানে বিএনপি শুরুতেই ‘না’ ভোটের পক্ষে দাঁড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে জনমতের চাপ ও বাস্তবতার মুখে শীর্ষ নেতারা অবস্থান বদলালেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কারণ মাঠপর্যায়ে বিএনপির কর্মীরা এখনো ‘না’ ভোটের পক্ষেই প্রচারণা চালাচ্ছেন। এই দ্বিচারিতাই এখন বিএনপির জন্য একটি গুরুতর রাজনৈতিক সংকট হয়ে উঠছে।
জনমতের বিরুদ্ধে বিএনপির এই অবস্থান নির্বাচনে হারার প্রথম ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনীতিতে সব সিদ্ধান্তই যে জনপ্রিয় হবে, তা নয়। কিন্তু কোনো দল যখন একটি প্রবল ও দৃশ্যমান জনমতের বিপরীতে অবস্থান নেয়, তখন তার মূল্য দিতে হয়। রাজনৈতিক সংস্কার প্রশ্নে গণভোটে ‘হাঁ’ ভোটের পক্ষে সাধারণ মানুষের সমর্থন ছিল শুরু থেকেই স্পষ্ট।
বিএনপি এই জনমতকে গুরুত্ব না দিয়ে ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়ে যে বার্তা দিয়েছে, তা হলো-তারা সংস্কার নিয়ে আন্তরিক নয়। তারা বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এতে করে একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে,বিএনপি ক্ষমতায় গেলেও মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা সীমিত। এই ধারণা বিশেষ করে তরুণ, শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের মধ্যে বিএনপির প্রতি আস্থাহীনতা বাড়িয়েছে।
গণভোট ইস্যুতে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও তৃণমূলের বিপরীত অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়ায় বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি হয়েছে। রাজনীতিতে মত বদল নতুন কিছু নয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন-শীর্ষ নেতৃত্ব এক কথা বলেন আর তার বিপরীতে কর্মীরা আরেক কথা প্রচার করেন।গণভোট ইস্যুতে বিএনপির বর্তমান অবস্থান ঠিক সেটাই। শীর্ষ নেতারা এখন পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ‘হাঁ’ ভোটের কথা বলছেন। কিন্তু তৃণমূল কর্মীদের বড় অংশ এখনো ‘না’ ভোটের পক্ষে সক্রিয়।
এই দ্বিচারিতা ভোটারদের কাছে তিনটি নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। ভোটররা বুঝতে পারছেন যে, বিএনপির ভেতরে সিদ্ধান্তের ঐক্য নেই। বিএনপির শীর্ষ নেতারা কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছেন।
বিএনপি নেতৃবৃন্দের বর্তমান আচরণ দেখে মনে হচ্ছে,দলটি পরিস্থিতি বুঝে নয়, চাপের মুখে সিদ্ধান্ত বদলায়। এ ধরনের সংকেত নির্বাচনের আগে যেকোনো দলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। নির্বাচনের সন্নিকটে এ ধরনের আচরণ নির্বাচনে পরাজয়ে ইঙ্গিত দেয়।
গণভোট নিয়ে বিএনপির এই দ্বিচারিতার কারণে ভোটারদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে গভীর বিভ্রান্তি। কেউ শুনছেন বিএনপি ‘হাঁ’ বলছে, আবার মাঠে গিয়ে দেখছেন একই দলের কর্মীরা ‘না’ভোটের পক্ষে প্রচার করছে।
এই বিভ্রান্তির ফলাফল সাধারণত তিনভাবে দেখা দেয়। ভোটার ভোট দিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ভোটার বিকল্প প্রার্থী বেছে নেয় এবং ভোটার প্রতিবাদী ভোট দেয়। এই তিনটিই আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির জন্য মারাৎসক ক্ষতিকর। গণভোট ইস্যুতে এই বিভ্রান্তি বিএনপির কর্মীদের মধ্যেও উদ্দীপনা কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক কর্মীই বুঝতে পারছেন না, তারা কী প্রচার করবেন ? ভোটারকে কী বোঝাবেন ? নিজেরাই বা কোন অবস্থানে আছেন ?
এই বিভ্রান্তির ক্ষতিকর ফলাফল হচ্ছে-দুর্বল প্রচারণা। সমন্বয়হীন ক্যাম্পেইন। নির্বাচনী তৎপরতায় নিষ্ক্রিয়তা। যা সরাসরি জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
পুরনো বন্দোবস্তের পরিবর্তন না হলে পরিবর্তনের ভোট কেন দেব ? এটি একটি বিপজ্জনক প্রশ্ন। সবচেয়ে ভয়ংকর প্রভাবটি হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক। গণভোটে ‘না’ অবস্থান বিএনপির বিরুদ্ধে একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী প্রশ্ন তৈরি করেছে।
গণভোটে বিএনপির দ্বিচারিতা নিছক একটি নীতিগত বিভ্রান্তি নয়; এটি একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটের প্রতিফলন। একই দিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন হওয়ায় এই সংকট সরাসরি নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনীতিতে সময়ের দাবি বুঝতে না পারা, জনমতের বিপরীতে অবস্থান নেওয়া এবং পরে অগোছালোভাবে অবস্থান বদলানোর এই তিনটি ভুল একসঙ্গে কোনো দলের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়।
তৃতীয়ত : রাজনৈতিক সংস্কারের বিরোধীতা
বিএনপি রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে শুরু থেকেই বিরোধীতা করেছে। মানুষ যখন গণহত্যার বিচার,রাজনৈতিক সংস্কার নিশ্চিত করার পর জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছিল, বিএনপি তখন বিচার ও সংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে অনড় ছিল।
এরপর বিএনপি রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে বার বার নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি জানিয়ে এসেছেন। জুলাই ঘোষণা, জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরে বিষয়েও বিএনপি প্রবল আপত্তি জানিয়েছিল। দেশের অধিকাংশ মানুষ যখন পুরনো বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে,বিএনপি তখন সেই পুরনো বন্দোবস্তকেই টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মহিউদ্দীন আহমদ প্রথম আলোতে লিখেছেন, বিএনপি আর আওয়ামী লীগের মধ্যে অমিল যত, মিল তার চেয়েও বেশি। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ মিলে বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে পরপর পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করে আমাদের লজ্জায় ডুবিয়েছিল। আমরা দূরের অতীত ভুলে যাই, নিকট অতীতকে মনে রাখি বেশি।
তিনি আরো লিখেছেন, গত ৭৭ বছরে আমরা দেশ বদলেছি, পতাকা বদলেছি, জাতির পিতা বদলেছি। কিন্তু রাষ্ট্র বদলায়নি। নাগরিকেরা চান রাষ্ট্র সংস্কার। তাঁরা চান সংস্কারের রোডম্যাপ। এটি তো আসা উচিত ছিল রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকেই। সেটি পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্র মেরামত না করে নির্বাচন দিলে যাঁরা ক্ষমতায় যাবেন, তাঁরা কী ডেলিভার করবেন ?
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, ‘বিএনপি এখন দোটানায় পড়েছে। তারা যদি জুলাই সনদ প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে ধরে নেওয়া হবে যে তারা সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। এতে তারা বিব্রতকর অবস্থায় পড়বে। আবার যদি সবকিছু মেনে নেয়, তাহলে হয়ে যাবে পরাজিত পক্ষ।’
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির এই নেতিবাচক আচরণে তরুন ভোটররা ক্ষিপ্ত হয়েছেন। তারা এখন প্রশ্ন করছেন, “আপনারা যদি সংস্কারই না চান, তাহলে আপনাদের ভোট দেব কেন ?”
এই প্রশ্নের জবাব বিএনপি এখনো স্পষ্টভাবে দিতে পারেনি। ফলে তরুন ভোটর সহ অনেক ভোটার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সংসদের ভোটও তারা বিএনপির বিপক্ষে দেবেন।
চতুর্থত : আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা
দেশের অধিকাংশ মানুষের আশঙ্কা, বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ দ্রুত ফিরে আসবে। আবারও দেশে অরাজকতা শুরু হবে। জুলাই গণহত্যার বিচার হবে না। পুরনো বন্দোবস্ত ফিরে আসবে। দেশের সম্পদ লুটপাট করে আবারো বিদেশে পাচার করা হবে।
৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের লুটেরা তাদের লুটপাটের সাম্রাজ্য বিএনপি নেতাদের হাতে তুলে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। এরপর থেকে বিএনপি নেতৃত্বের কথা ও কাজে প্রমানিত হয়েছে যে তারা আওয়ামী লীগকে ফেরানোর দায়িত্ব নিয়েছেন। এসব কারেেনই গণমানুষের মনে এই আশঙ্কা দানা বাঁধছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমানকে আওয়ামী লিগকে নিষিদ্ধ ঘোষণার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেছেন, আওয়ামী লিগ প্রসঙ্গে তিনি মতামত দিতে আগ্রহী নন। তবে তিনি নীতিগত ভাবে মনে করেন কোন দলকে নিষিদ্ধ করা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।
তারেক রহমান বলেন,’আজ যদি আপনি কোনও রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেন, তাহলে আগামীকাল আপনি আমাকে নিষিদ্ধ করবেন না এমন নিশ্চয়তা কি আছে?’
আওয়ামী লিগকে নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে কিছু দিন আগেও বিএনপি মহা সচিব বলেছিলেন তাঁরা কোন দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পক্ষপাতী নন। আওয়ামী লিগ তাদের ভুল স্বীকার করলে বিএনপি’র পক্ষে সুবিধা হতো দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মামলা হয়েও থাকে তাহলে তা তুলে নেয়া হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন,‘‘আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, সমস্ত মামলা তুলে নেয়া হবে। যত মামলা আছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, আমরা সমস্ত মামলাগুলো তুলে নেবো’’।
১১ নভেম্বর মঙ্গলবার বিকেলে ঠাকুরগাঁও যুব সংঘ মাঠে শহিদ জিয়া ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালের উদ্বোধন করার পর এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন তিনি। দিনের শেষ এ মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান রুহুল কবীর রিজভী এক বক্তৃতায় বলেছেন, “আওয়ামী লীগের ক্লিন ইমেজের ব্যক্তিরা বিএনপির সদস্য হতে পারবেন, যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে অনেক আগেই দূরে সরে গেছেন।
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হবে কি হবে না, তা বিএনপির বক্তব্যের বিষয় নয়। একথা বলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান। গত ৯ মে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আজ শুক্রবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের কার্টার সেন্টারের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আবদুল মঈন খান এ কথা বলেন।
পঞ্চমত : সন্ত্রাস-সহিংসতা-চাঁদাবজিতে স্বরূপে ফিরে আসা
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭ মাসে দেশে মোট ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫৫০টি বা ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ ঘটনায় বিএনপির সম্পৃক্ততা ছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
২ ফব্রেুয়ারি সোমবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
এটি এখন আর শুধু পরিসংখ্যান নয়। ভোটের মাঠে এই পরিসংখ্যান বিএনপির জন্য দোধারী তলোয়ারের মতো। এই পরিসংখ্যান মানুষকে আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে সেই পুরনো বন্দোবস্ত আর সন্ত্রাসী লুটেরাদের রামরাজত্বের কথা। এটি মানুষকে বিএনপির বিষয়ে মহাবিপদসংকেত দেখাচ্ছে।
ষষ্টত : ভারত তোষণনীতি
বিএনপি বিশ্বাস করে ভারতের সমর্থন না পেলে ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। ভারত রাজি না থাকলে ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে না। আওয়ামী লীগ যেভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনত-স্বাবভৌমত্ব ভারতের হাতে ইজারা দিয়ে ভারতীয় স্বার্থ রক্ষায় নিজেদের বিলীন করে দিয়েছিল, বিএনপিও এখন তাই করতে চাচ্ছে।
অথচ, ভারতের বাংলাদেশের মানুষ সব সময় ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর দেশের মানুষ ভারতীয় হেজিমনির মূলোৎপাটন করতে যখন মরিয়া হয়ে উঠেছে বিএনপি তখন ভারতকে খুশি রাখতে নানান কায়দা-কোশেশ করছে।
বিএনপির নেতারা এর আগেও বাংলাদেশে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ভারতের সহায়তা চেয়েছেন। ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে লন্ডন সফররত বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবিসির স্টুডিওতে গিয়ে শাকিল আনোয়ারকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আমরা যেটা চাই ভারতের কাছে, বাংলাদেশে একটা সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভারত যেন সহায়তা করে। এরপর লন্ডনে থেকে ফিরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বলেছিলেন, বিএনপি ভারতবিরোধী রাজনীতি করবে না।
বাংলাদেশের পুলিশ ও আমলাদের সঙ্গে ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাসের ভাল সম্পর্ক রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল। বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘বিজেপি ডানপন্থী রাজনৈতিক দল। আরএসএসও সেখানে আছে। কিন্তু বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে আমাদের কোন সমস্যা নেই।’
সবমেষে লন্ডনফেরত তারেক রহমান দেশের মাটিতে নেমে মাটির পরশ নিলেও বাংলাদেশের মাটিকে ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত রাখার বিষয়ে একটা টু শব্দও করেন নি। এতে করে দেশের মানুষ বুঝে গেছে যে, বিএনপি এখন আওয়ামী লীগের রিপ্লেসমেন্ট হতে চাচ্ছে। ভারতও সেটাই চাচ্ছে। এই অবস্থায় বিএনপির ভোটব্যাংকে বড় ধরনের টান পড়বে তা সহজেই বুঝা যাচ্ছে।
সপ্তমত : ইসলামী সেন্টিমেন্টের বিরুদ্ধে যাওয়া
দেেশর ইসলামপন্থীদের গণজারণ লক্ষ্য করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইসলামপন্থীদরে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, বাংলদেশেরে রাজনীততিে দক্ষিণপন্থার উত্থান হয়েছে। তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ যেন চরমপন্থা বা মৌলবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে না পারে, সেটিই বিএনপির লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন দলটির তারেক রহমান।
১৭ আগস্ট লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপির সঙ্গে জাতীয় কবিতা পরিষদের মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপির চেয়ারম্যান এবং মহাসচিবের এমন বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বিএনপি বাংলাদেশের ইসলামপন্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এটা বিএনপির জন্য একটা বড় ধরনের ক্ষত সৃষ্টি করেছে। কারণ ৯০ ভাগ মুসলমানের এই দেশে ইসলামপন্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কেউ কখনো টিকে থাকতে পারেনি,ভবিষ্যতেও পারবে না।
বিএনপি শরীয়া আইন চায় না। শরীয়া আইন বিশ্বাসও করে ন। এটা তারা প্রকাশ্যেই বরে বেড়ান।শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে রাজনীতি করতে এসে বিএনপি শরীয়াহ আইনে বিশ্বাস করে না। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন বিএনপি ‘বিএনপি ইসলামী আইনে বিশ্বাস করে না। দলের চেয়ারপার্সনের গুলশানের কার্যালয়ে বসে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এ বক্তব্য দেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা জামায়াতের ব্যাপারে প্রশ্নের সম্মুখিন হই। বিএনপি কিন্তু জামায়াত নয়। বিএনপি শরীয়াহ আইনে বিশ্বাস করে না। বিএনপি মৌলবাদেও বিশ্বাস করে না। জামায়াতের ব্যাপারে আমাদের কোন মোহ নেই।’
অষ্টমত : বিদ্রোহী প্রার্থীর জোয়ারে  আত্মঘাতী রাজনীতি
এবারের নির্বাচনে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনছে বিপুল সংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী। বহু আসনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপি নেতারাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন।
শুরুতে ১১৭ আসনে বিএনপির ১৯০ জনের মতো দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া ঠেকাতে বিএনপি অনেকের সঙ্গে আলোচনা করে। আবার অনেকের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়।রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারও কারও মনোনয়নপত্র বাতিল হয়।
শেষ পর্যন্ত ৭৯টি আসনে অন্তত ৯২ জন বিএনপির নেতা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। কোনো কোনো আসনে বিএনপির একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন। আবার কোথাও কোথাও এক ব্যক্তি একাধিক আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় অনেককে ইতিমধ্যে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। অনেক জায়গায় বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় স্থানীয় কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে। তবু বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনের মাঠ ছাড়েননি। দলের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে ভোটের প্রচার চালাচ্ছেন।
এবিষয়ে বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের অনেকে বলছেন, একাধিক দলীয় নেতা প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির ভোট ভাগাভাগি হবে। এতে অন্য দলের প্রার্থীরা সুবিধা পেতে পারেন। বিএনপির দলীয় প্রার্থীরাও বিষয়টি অস্বীকার করছেন না।
স্থানীয় নেতা-কর্মী ও ভোটাররা বলছেন, এসব ক্ষেত্রে অনেক আসনে বিদ্রোহীদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি অনেক আসনে বিএনপির ভোট কাটাকাটির কারণে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে।এরফলে ভোটারদের কাছে বিএনপি অগোছালো ও অনৈক্যবদ্ধ দল হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। যা আসন্ন নির্বাচনে তাদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হতে পারে।
নবম : ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণধিকৃত ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দেওয়া বিএনপির জন্য নৈতিক ও রাজনৈতিক আত্মঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু শব্দ আছে, যেগুলো জনমনে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে; ঋণখেলাপি তার অন্যতম।
ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়, সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ঝুঁকির মুখে পড়া, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সব কিছুর সঙ্গেই এই শব্দটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। এমন এক বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঋণখেলাপিকে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে, তখন তা শুধু একটি ভুল সিদ্ধান্তই নয়, বরং একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক আত্মঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঋণখেলাপি সংস্কৃতি এক জনঘৃণার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ঋণখেলাপিদের প্রতি ক্ষোভ কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি একটি সামাজিক ক্ষোভ।ঋণখেলাপিদের কারণে ক্ষুদ্র আমানতকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থনীতি দুর্বল হয়। অথচ ঋণখেলাপিরা বার বার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকে। এই প্রেক্ষাপটে কোনো রাজনৈতিক দল যখন ঋণখেলাপিদের প্রার্থী করে, তখন ভোটারদের কাছে সেটি সরাসরি এই বার্তা দেয়,“আমরা এই জঘন্য সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নই।”
ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপির নৈতিক অবস্থান ভেতর থেকেই ভেঙে পড়ছে। ভোটাররা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছেন,বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কি এই ঋণখেলাপিরাই রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধাগুলো অবৈধভাবে হাতিয়ে নিবে না ?
জণগণ আশঙ্কা করছে বিএনপির এই অনৈতিক আচরণে সরকার বদলালেও কি লুটপাটের চরিত্র বদলাবে না। জনমনের এই সন্দেহই নির্বাচনে বিএনপির সবচেয়ে বড় ক্ষতি করছে। এতে করে মধ্যবিত্ত ও শহুরে ভোটাররা বিএনপির কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
এই শ্রেণির ভোটারদের একটি বড় অংশ এতদিন বিএনপির প্রতি নীরব সহানুভূতিশীল ছিল। ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন সেই সমর্থনকে নীরব ভোটবিমুখতায় রূপান্তরিত করছে। যা আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।
ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন তরুণদের কাছে বিএনপিকে উপস্থাপন করছে একটি পুরনো, সুবিধাভোগী রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবে। ফলে তারা বিএনপির পরিবর্তে বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে এবং অধিকাংশ তরুন প্রতিবাদী অবস্থান নেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে।
বিএনপি যেখানে ঋণখেলাপিদের ব্যাখ্যা দিতে ব্যস্ত, জামায়াত সেখানে নৈতিক উচ্চভূমি দখল করে নিচ্ছে। যা ভোটের অঙ্কে বড় ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এই কারণে বিএনপির দলীয় কর্মীদের মধ্যেও নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ ও অনীহা দিন দিন বাড়ছে। যার ফলাফল হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতাকর্মীরা জামায়াতে যোগদান করছে।
ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন শুধু ভোটারদের নয়, বিএনপির তৃণমূল কর্মীদের মধ্যেও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। অনেক ত্যাগী নেতা-কর্মী মনে করছেন আন্দোলনে ছিলেন তারা। মামলা-নির্যাতন সহ্য করেছেন তারা। অথচ মনোনয়ন পাচ্ছেন অর্থশালী ঋণখেলাপিরা। এর ফলাফল হচ্ছে, প্রচারণায় অনীহা, নিষ্ক্রিয় কর্মীবাহিনী। এটি বিএনপির নির্বাচনী শক্তিকে ভেতর থেকেই দুর্বল করছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর প্রভাবটি হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক। অনেক ভোটার এখন বলছে—“সব দলই যদি ঋণখেলাপিদের প্রার্থী করে, তাহলে পরিবর্তন কোথায়?” এই প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর বিএনপি দিতে পারছে না।
বিএনপির এবারের নির্বাচনী পরাজয়ের পেছনে বহু কারণ থাকতে পারে। তবে ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন একটি স্বেচ্ছা-নির্মিত রাজনৈতিক ক্ষত, যা তারা নিজেরাই তৈরি করেছেন।
দশম : তরুণ ভোটারদের কাছে পুরনো বার্তা
জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণরা যে বিষয়গুলো সবচেয়ে ঘৃণা করে, সেগুলো হলো-অর্থনৈতিক বৈষম্য,ক্ষমতার অপব্যবহার,একই মুখ, একই অপরাধ। এতে করে রাজনৈতিক বার্তার সংকট তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ভোটারদের মনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে-“আমরা কেন ভোট দেব ?”একটি সফল নির্বাচনী প্রচারণার জন্য প্রয়োজন একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ন্যারেটিভ, যেখানে ভোটার বুঝবে, কেন সে একটি দলকে ভোট দেবে। বিএনপি এখানে বড় ধরনের ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
বিএনপির প্রচারণা এখনো মূলত: প্রতিপক্ষকে আক্রমন করে কথা বলা। যা মূলত নেতিবাচক রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তারা পরিষ্কারভাবে বলতে পারছেন না যে, ক্ষমতায় গেলে নিজেরা কী করবেন। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের পরিকল্পনা কী ? এই শূন্যতা জামায়াত নিজেদের নৈতিকতা, সংগঠন ও “পরিবর্তনের বিকল্প” হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ করে দিচ্ছে।
একাদশতম : দলীয় কোন্দল ও স্থানীয় সংঘাত
বিএনপির তৃণমূল রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই দলীয় কোন্দল দ্বারা আক্রান্ত। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে একাধিক গ্রুপ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং পুরনো শত্রুতা নির্বাচনী সময়ে আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে প্রার্থী বাছাই নিয়ে সংঘর্ষ। প্রচারণায় পারস্পরিক অসহযোগিতা এবং কোথাও কোথাও প্রকাশ্য বিভক্তি। যা ভোটের অঙ্কে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
পাঁচই অগাস্ট পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অন্তর্কোন্দল দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে বিএনপির তৃণমূলে। সংঘাত- সহিংসতায় পত্রপত্রিকার শিরোনামে উঠে আসছে বিএনপির নেতাকর্মীদের নাম। বিবদমান বিভিন্ন গ্রুপের সংঘর্ষে কেবল এপ্রিল মাসেই দলটির অন্তত সাতজন নেতাকর্মীর মৃত্যুর খবর এসেছে গণমাধ্যমে।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের মাত্র ৮ মাসের মাথায় রাজেনৈতিক অন্তর্কোন্দল বিএনপির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় দ্রুত বাড়ছে দলটির তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে বৈরিতা।
সংঘাত সহিংসতার বিষয়টি স্বীকার করছেন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও। তাদের দাবি,কোন্দলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কারণে সহিংসতার মাত্রা কমে এসেছে। তবে পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দলটির স্থানীয় পর্যায়ের সহিংসতা।
দ্বাদশতম : জোট রাজনীতির অস্পষ্টতা ও কৌশলগত ভুল
বিএনপি দীর্ঘদিন জোট রাজনীতির কথা বললেও বাস্তবে কার সঙ্গে, কোন শর্তে, কীভাবে—এ বিষয়ে স্পষ্টতা আনতে পারেনি। জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে দ্ব্যর্থক অবস্থান বিএনপিকে দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এনসিপির সঙ্গেও তাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।এতে করে ভোটার বিএনপির ওপর পুরোপুরি আস্থা পাচ্ছে না। মধ্যপন্থী ও লিবারেল ভোটার বিভ্রান্ত হচ্ছে। এই কৌশলগত দ্বিধা নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে বিএনপির পরাজয়ের বড় কারণ হতে পারে।
তীরে এসে তরী ডুবতে পারে
বিএনপির সামনে এবারের নির্বাচন ছিল দীর্ঘদিনের আন্দোলনের রাজনৈতিক ফসল ঘরে তোলার সুযোগ। কিন্তু বাস্তবে দলটি এখনো নেতৃত্ব সংকট, সিদ্ধান্তহীনতা ও সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
বিএনপির জন্য শুধুই একটি নির্বাচন নয়। এটি তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক জটিল মোড়। কিন্ত নেতৃত্ব সংকট, বেশুমার বিদ্রোহী প্রার্থী, দলীয় কোন্দল, স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তার অভাব এবং নৈতিক দুর্বলতার মতো ভুলগুলো যদি শেষ মুহূর্তেও বিএনপি সংশোধন করতে না পারে, তাহলে পস্তাতে হবে।
দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থতা মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে। স্থানীয় নেতারা নিজেদের মতো করে রাজনীতি করছেন, যার ফল হিসেবে দেখা দিয়েছে ব্যাপক বিদ্রোহী প্রার্থী, দলীয় কোন্দল এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস।
রাজনীতিতে সুযোগ বারবার আসে না। বিএনপি যদি এই বাস্তবতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এবারের নির্বাচনে পরাজয়ের দায় শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের ঘাড়েই এসে পড়বে। যার ফলে নির্বাচনের দিনে ‘তীরে এসে তরী ডুবতে’ পারে দলটির।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com