তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই কুটনীতির খেলা অনকদূর এগিয়ে গেছে। তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর এপার-ওপার দৌড়া-দৌড়িতে পরিস্থিতি কিছুটা ক্লাইমেক্সে মোড় নিয়েছিলো। এরপর ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর প্রধান পরাগ জৈনের বাংলাদেশ সফরের পর সেই পরিস্থিতি এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে। ঢাকা-দিল্লীর নড়বড়ে সম্পর্ক তাৎক্ষনিকভাবে মেরামতও করা হয়েছে। ফলে সেপ্টেম্বরে তারকে রহমানকে ভারত সফরে যেতেই হচ্ছে।
দিল্লীতে হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও দ্রুত সেই সম্পর্ক জোড়া লাগানো হয়েছে। ফলে এতোদিন তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল,সেটা আর এখন নেই। এখন মত পাল্টাতে বাধ্য হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ভারত সফরের বিষয়ে এতো দিন অনাগ্রহ দেখালেও এখন আর না করতে পারছেন না তারেক রহমান। কারণ, তাকে ভেতরে এবং বাইরে থেকে ভারত সফরে যাওয়ার জন্য ব্যাপকভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
সে কারণে,বাইরে কিছু জানতে দেওয়া না হলেও ভেতরে ভেতরে ভারত সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই সফরেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকে বসতেও রাজি হয়েছেন তিনি।
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দু’বার তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রথম আমন্ত্রণটি ব্যক্তিগতভাবে ঢাকায় তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় জানিয়েছিলেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা।
এবিষয়ে ভারতের কুটনৈতিক বিশেষজ্ঞ অবিনাশ পালিওয়াল মন্তব্য করেছেন, ভারতের দ্বিতীয় আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করা তারেক রহমানের রাজনৈতিক বিচারের ক্ষেত্রে বড় ভুল হবে।
একটি পোস্টে পালিওয়াল বলেন, ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আরও অবনতি ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ, আন্তরিক এবং অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।
গত রবিবার ঢাকায় তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। বৈঠক পরবর্তী ভারতীয় হাইকমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং জনকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে ত্রিবেদী তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শুভেচ্ছা জানান। পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলার ভারতের আগ্রহের কথাও জানান।
তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর ঐদিন রাতেই দিনেশ ত্রিবেদী দ্ল্লিীতে ছুটে গেছেন এবং মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
সেই বৈঠকে তারেক রহমানের দিল্লী সফরের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না তা জানতে চাইলে নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, সাম্প্রতিক বৈঠক ছিল ইতিবাচক ও গঠনমূলক। জয়সওয়ালের কথায়, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যেতে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।’
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও সুর নরম করেছেন। তিনি মঙ্গলবার জানিয়েছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যে কোনও সময়ে ভারত সফরে যেতে পারেন।’ মঙ্গলবার ঢাকায় প্রেস ব্রিফিংয়ে তাঁর দাবি, ‘বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। আলাদা ভাবে দ্বিপাক্ষিক সফরের তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।’
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক প্রসঙ্গে তারেকের উপদেষ্টা জাহেদ আরো বলেন, ‘বন্ধু পাল্টানো যায়, কিন্তু প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না। তার এই কথা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ । এর মাধ্যমে তিনি বলতে চেয়েছেন যে ভারতের আমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই।
বরফ গলা নদীর মতো তারেক রহমানের উপদেষ্ঠা জাহেদ আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে ফিরলে হাসিনাকে পূর্ণ নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা দেওয়া হবে। এটা একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।’ হঠাৎ জাহেদের এই গলে যাওয়ায় প্রমানিত হয় দিল্লীর আমন্ত্নেকে কোনভাবেই অগ্রাহ্য করতে পারছেন না তারেক রহমান।
বর্তমানে BIMSTEC-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে থাকা তারেক রহমানকে ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে আয়োজিত একটি বিশেষ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। ১৪ জুলাই কূটনৈতিক মাধ্যমে সেই আমন্ত্রণ পাঠানো হয়। তবে তারেক রহমান সেই সফরে যাবেন কি না, এখনও সিদ্ধান্তের কথা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি ঢাকা।
বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খালিলুর রহমান সোমবার জানিয়েছেন, সিদ্ধান্ত কবে নেওয়া হবে সেটাও তিনি বলতে পারছেন না।
মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এবিষয়ে ব্রিফিং করেন। সেখানেও তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। মি. জয়সওয়াল বলেছেন- এ নিয়ে কোনো আপডেট থাকলে সেটি তিনি জানাবেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রায় চার মাস পর গত জুনে চিন সফর করেছিলেন তারেক রহমান। এরপরই তার ভারত সফরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ৫ অগস্ট দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্যের জেরেই ঢাকা-দিল্লির মধ্যে তিক্ততা তৈরি হওয়ায় তারেক রহমানের ভারত সফরে অনিশ্চয়তা দানা বেঁধে উঠছিলো।
…………………………………………………………..
এফ শাহজাহান
ক্রাইসিস অ্যানালাইসিস
১৩ জুলাই ২০২৬
…………………………………………………………
Leave a Reply