কোটা সংস্কারের আন্দোলন চলাকালে ঢাকার সাভারে গুলিবিদ্ধ হয়ে গত ২০ জুলাই নিহত হোন রিকশাচালক রনি প্রামাণিক(৩০)। পরদিন তাঁর মরদেহ বগুড়ার শিবগঞ্জের পঞ্চদাশ গ্রামে ধর্মীয় রীতিমতো দাফন করা হয়৷ উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন রনির মৃত্যুতে এখন অথৈসাগরে ভাসছে পুরো পরিবার। ঘটনার সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও থামেনি স্বজনদের শোক-আহাজারি।
“হামার দুনিয়াতে আর কেউ থাকলোনা। ছোল ঢাকায় রিক্সা চালিয়ে প্রতি সপ্তাহে পাঁচ’শ টাকা পাটাতো। তা দিয়ে ওষুধ কিনছি। হামাক কছলো(বলছিলো) মা তোমাক বাড়ি করে দিমো। হামাগেরে আর কোনো কষ্ট থাকপিল্লয় (থাকবেনা)। সেই ছোল কেও ওরা পাখির মতো গুলি করে মারলো।”
শনিবার বিকালে রনির গ্রামের বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার বুড়িগঞ্জ ইউনিয়নের পঞ্চদাস গ্রামে গেলে এভাবেই বিলাপ করতে দেখা যায় মা শাহানা বেওয়াকে(৫৫)।
এসময় তিনি কান্না করতে করতে বলেন, ‘ঘরে একটা চাউলও নাই। হামি একন কি করে খামো। হামাক এখন ভিক্ষে করে খাওয়া লাগবি। হায়রে কপাল হামার। আল্লাহ হামার কেউ থাকলো না।’
রিকশাচলক ছেলের পাঠানো টাকায় ওষুধ আর দু’বেলার খাবার জুটতো স্বামী হারা শাহানা বেওয়ার। দেশে সহিংসতা চলছে জেনে ছেলেকে রিকশা নিয়ে বের হতে বারণও করেছিলেন হতভাগা এই মা। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে মা শাহানা বেওয়া এখন পাগল প্রায়। কখনও বা নিজের ঝুপড়ি ঘরে আবার কখনও মাটিতে বসে ছেলের স্মৃতি স্মরণ করে বিলাপ করে যাচ্ছেন তিনি।
পঞ্চদাশ গ্রামের মৃত দিলবর প্রামাণিকের ছেলে রনি মিয়া স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে ঢাকার সাভারে পরিবারসহ ভাড়া বাসায় থেকে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
পরিবারের সদস্যরা জানায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনে কমপ্লিট শাটডাউনে দু’দিন রিকশা বন্ধ থাকায় ঘরে ওষুধ ও চাল-ডাল ছিল না। তাই, সন্তানদের পেটে খাবার তুলে দিতে গত ২০ জুলাই দুপুরে রনি রিকশা নিয়ে সাভার বাসট্যান্ড এলাকায় যান দুটো টাকা রোজগারের আশায়। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেখানে সহিংসতার মাঝে পরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হোন রনি।
প্রতিবেশি ও স্বজনদের দাবি, রনির মৃত্যুর সঠিক বিচারের পাশাপাশি সরকার অসহায় এই পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ালে তাঁর বৃদ্ধ মা ও স্ত্রী দুই শিশু সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে পাবে।
পঞ্চদাস গ্রামের বাসিন্দা বাবলু সরকার জানান, চার বছর আগে রনির বাবা মারা গেছেন। তাঁর মা শাহানা খাতুন সরকারি খাসজমিতে ঝুপড়ি ঘর তুলে খুব কষ্টে বসবাস করছেন। মানুষের দুয়ারে সাহায্য চেয়ে তাঁর জীবিকা চলে।
রনির স্ত্রী সাথী বেগম জানান, ছোট ছেলের গায়ে খুব জ্বর জ্বর ছিলো। ওর বাবার শরীরও ভালো ছিলোনা না। আন্দোলনের কারনে দু’দিন রিকশা চালাতে না পারায় ঘরে চাল-ডাল ছিল না। ওষুধ কেনার টাকাও ছিলোনা। এ জন্য সকাল ৯টার দিকে মহাজনের কাছ থেকে রিকশা নিয়ে বের হয়। দুপুর ১২টার দিকে এক প্রতিবেশী ফোন করে জানান, তোমার স্বামীর বুকে গুলি লাগছে। এখন হাসপাতালে আছে। শোনা মাত্র ইভানকে কোলে নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে স্বামীর নিথর দেহ দেখতে পাই। তাঁর বুকেপিঠে অসংখ্য গুলির চিহ্ন ছিলো।
স্থানীয় বুড়িগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম চঞ্চল জানান, অসহায় পরিবারটির দায়িত্ব সরকার নিলে তাঁর বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও দুই ছেলে বেঁচে থাকার পথ পাবে। আমি ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবো।
Leave a Reply