আমেরিকা-ইরান সমঝোতা চুক্তি টিকবে না যে কারণে

Reporter Name
    সময় : মঙ্গলবার, জুন ১৬, ২০২৬, ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ
  • ৮৭ Time View

এফ শাহজাহান :

কম ঠেলায় বিড়াল যেমন গছে ওঠে না,তেমনি কম জ্বালায় ডোনাল্ড ট্রাম্প লেজ গুটাতে বাধ্য হচ্ছে না। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ হেরে গিয়ে সোমবার ভোরে শান্তি সমঝোতা চূড়ান্ত করার ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। আগামী শুক্রবার তা আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাক্ষরিত হবে। তবে এই সমঝোতা কতটা টেকসই হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কেননা, ইসরাইল কখনোই চাইবে না এই সমঝোতা টেকসই হোক। ইরান এভাবে জিতে গেলে ইজ.রাইল মহাবিপদে পড়বে। তাই সমঝোতা চুক্তি ভাঙ্গার জন্য শেয়ালের মতো ওঁৎপেতে আছে ইজ.রাইল ।

ইতমেধ্যই ডোনাল্ড ট্রাম্পের হম্বি-তম্বী আর লম্ফ-ঝম্ফ হঠাৎ ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেছে। সেই সঙ্গে আমেরিকার মোড়লগিরি খতমের আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে বিশ্বব্যাপি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কবর রচিত হওয়ার আলামতও বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্প যুদ্ধের শুরুতেই বেশ দম্ভভরে বলেছিলেন, যুদ্ধ তিন-চার সপ্তাহের বেশি চলবে না। কিন্তু সেই যুদ্ধ চলল সাড়ে তিন মাস ধরে। যুদ্ধ শুরুর পর চতুর্থ সপ্তাহেই ট্রাম্প কাবু হয়ে গিয়েছিলেন। যুদ্ধে ইরানের সঙ্গে কুলাতে না পেরে ট্রাম্পই প্রথম সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়েছেন।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য হয়ে আমেরিকা শুধু একাই লেজগুটাতে বাধ্য হচ্ছে না,সেই সঙ্গে ইসরাইলেরও লেজ গুটানোর ব্যবস্থা করে যাচ্ছে। একারনে চুক্তির কথা শুনেই ক্ষেপে উঠেছেন নেতানিয়াহু।

এই চুক্তিতে নেতানিয়াহু বেশ নাখোশ হয়েছেন। তিনি রেগে গিয়ে বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুক্তিকে মান্যতা দেওয়া ইজ়রায়েলের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে ইজ়রায়েল স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তা-ও স্পষ্ট করে দিয়েছে তারা।

ইজ়রায়েলের নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভিরের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক কোনও সমঝোতার জন্য ইজ়রায়েল কখনও নিজের নিরাপত্তাকে অবহেলা করবে না। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, “ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। ইজ়রায়েল আমেরিকার অন্তর্গত নয়। আমরা একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র।”
এতেকেরে বুঝাই যাচ্ছে যে,এই চুক্তিতে ইজ়রায়েলের সায় নেই এবং এই চুক্তি ভাঙ্গার জন্য ইজ়রায়েলের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে। একারণে আমেরিকার এই সমঝোতা চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে একটি বড় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা উত্তেজনা নিরসনে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে পর্দার আড়ালে বা প্রকাশ্যে বিভিন্ন সময়ে সমঝোতার প্রচেষ্টা দেখা যায়। তবে এই ধরনের যে কোনো ‘যুদ্ধবিরতি’ বা সমঝোতা চুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং মার্কিন নীতির সঙ্গে তাদের মতপার্থক্য কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণকেই জটিল করছে না, বরং যেকোনো সমঝোতার স্থায়িত্বের ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিচ্ছে।

ইসরায়েলের উদ্বেগের উৎস
ইসরায়েলের জন্য ইরান কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, বরং একটি ‘অস্তিত্বসংকট’। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনের মতো দেশগুলোতে তাদের প্রক্সি নেটওয়ার্কের বিস্তারকে ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে। ইসরায়েলের মূল যুক্তি হলো—আমেরিকা যদি ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় বা কোনো ধরণের সমঝোতায় পৌঁছায়, তবে ইরান সেই অর্থ ও রাজনৈতিক বৈধতা ব্যবহার করে ইসরায়েলবিরোধী কার্যক্রমে আরও আগ্রাসী হয়ে উঠবে। ইসরায়েলের কাছে কোনো সমঝোতাই গ্রহণযোগ্য নয় যদি না সেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং প্রক্সি শক্তির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

ছায়াযুদ্ধ ও সমঝোতার ভঙ্গুরতা
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা যুদ্ধবিরতি হলেও তা কার্যত ‘কাগজে-কলমে’ সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি থেকে যায়। এর মূল কারণ হলো ‘ছায়াযুদ্ধ’ (Shadow War)। ইসরায়েল অতীতে বারবার প্রমাণ করেছে যে, আমেরিকা বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসলে তারা নিজেরা চুপ করে থাকে না। সাইবার আক্রমণ, ইরানের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী বা সামরিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে অপারেশন এবং আকাশপথে নজরদারি—এসবই ইসরায়েলের নিজস্ব কৌশলের অংশ।

যখন ইসরায়েল ইরানের ওপর এই ধরনের ‘গ্রে-জোন’ বা ধূসর অঞ্চলের যুদ্ধ চালিয়ে যায়, তখন ইরান বাধ্য হয়ে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়। আর এই প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে আমেরিকা-ইরান যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতার পরিবেশ মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে, আমেরিকার সঙ্গে ইরানের চুক্তি থাকলেও ইসরায়েলের এই অব্যাহত চাপ সমঝোতাটিকে টেকসই হতে দেয় না।

আমেরিকার দ্বিধা : গ্লোবাল বনাম রিজিওনাল স্ট্র্যাটেজি
আমেরিকার বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং ইউক্রেন যুদ্ধ বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে ওয়াশিংটন চায় মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে নিজের সম্পদ ও মনোযোগ সরিয়ে নিতে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ‘অবিচ্ছেদ্য’। ওয়াশিংটন যখন ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়, তখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ইসরায়েলি লবিংয়ের চাপের মুখে তারা মাঝেমধ্যেই দোদুল্যমান অবস্থায় পড়ে যায়। আমেরিকার এই ভারসাম্যহীন নীতিই ইরানকে সংশয়বাদী করে তোলে এবং চুক্তি সম্পাদনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সমঝোতা কেন টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম ?
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার বিশ্লেষণে যেকোনো চুক্তির স্থায়িত্ব নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টি’র ওপর। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে অন্ধকারে রেখে বা তাদের অসন্তোষকে পাত্তা না দিয়ে আমেরিকা কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে না।

প্রথমত :  অবিশ্বাসের দেয়াল

তেহরান মনে করে, আমেরিকা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে যেকোনো চুক্তি বাতিল করতে পারে। এর ওপর ইসরায়েলের অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা এই অবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

দ্বিতীয়ত : প্রক্সি ফ্যাক্টর

ইসরায়েল চায় ইরান তাদের প্রক্সি বাহিনীগুলোকে নিষ্ক্রিয় করুক। কিন্তু ইরান তাদের আঞ্চলিক প্রভাবের মূল স্তম্ভ হিসেবেই এই বাহিনীকে দেখে। এই মৌলিক স্বার্থের সংঘাত নিরসন ছাড়া কোনো যুদ্ধবিরতিই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

আমেরিকা-ইরান যুদ্ধবিরতি যদি কেবল পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং এর বাইরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ইসরায়েলের উদ্বেগের বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকে, তবে সেই চুক্তি কেবল সাময়িক স্বস্তিই দেবে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায়, ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং ইরানের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে যে বিশাল ফারাক, তা দূর করা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কোনো স্থিতিশীল যুদ্ধবিরতি অসম্ভব।

তাই, টেকসই শান্তির জন্য কেবল ওয়াশিংটন-তেহরান আলোচনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত আঞ্চলিক কাঠামো, যেখানে ইসরায়েলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং ইরানের আঞ্চলিক বাস্তবতার সহাবস্থানের একটি উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে। নতুবা, এই যুদ্ধবিরতি হবে কেবল পরবর্তী বড় সংঘাতের আগের একটি সংক্ষিপ্ত বিরতি মাত্র।
………………………………………..
এফ শাহজাহান
ডিফেন্স অ্যানালাইসিস
১৬ জুন ২০২৬
………………………………………..

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com