মামুনার রশীদ :
২০২৪ এর ১ জুলাই থেকে ৫ আগষ্ট পর্যন্ত দেশে কী ঘটেছে এবং আজও ঘটছে – তা জানার জন্য আর ইতিহাসের পাতা ঘাটতে হবে না কারণ আমরা প্রত্যেকেই সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে আছি। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে নয় দফা সেখান থেকে এক দফা এবং ৫ তারিখে সেই বিপ্লবের চূড়ান্ত ঐতিহাসিক ক্ষণ এলো। আওয়ামী লীগ সরকার ছাত্র-জনতার মার্চ টু ঢাকা আন্দোলনে পরাজিত হয়ে, রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে সরকার প্রধান শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন।ছাত্র-জনতার বিজয় হলো।দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতার স্বাদ পেল দেশবাসী।আনন্দ, উল্লাস এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে গঠিত হলো নতুন অন্তর্বর্তী সরকার।সরকারের জুলুম আর নির্যাতনে নিষ্পেষিত নোবেল বিজয়ী ড. মো. ইউনূসকে প্রধান করে গঠিত হলো এই সংকটকালীন সরকার।ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তারুণ্যের প্রতীক হয়ে এই সরকারের অংশ হলো নাহিদ হোসেন ও সজীব ভূঁইয়া।৫ আগষ্ট থেকে শেষ হয় সুদীর্ঘ ১৬ বছরের দুঃশাসনের এক রক্তিম ইতিহাস।
ড.ইউনূসের নেতৃত্বে এই সরকার কতদিন রাষ্ট্র পরিচালনা করবে,কত দ্রুত আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবে,কতটা রাষ্ট্রীয় সংস্কার করবে এবং দেশে শান্তি শৃঙ্খলা আনবে – তা সময় ই বলে দিবে।আমি আজ বলবো শুধু আমার দাবি।আমি একজন শিক্ষা শ্রমিক এবং আমার দাবি ও প্রত্যাশা সবসময়ই শিক্ষাকে কেন্দ্র করে।আমার বিপ্লবী শিক্ষার্থীরা বুকে সাহস নিয়ে,মৃত্যু ভয় উপেক্ষা করে,জীবন দিয়ে,রক্ত ঝরিয়ে,জেল জুলুম সহ্য করে একটা প্রতিষ্ঠিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে যে বিজয় সূচিত করেছে, সেখানে আমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নানাবিধ সংস্কার নিয়েই বলবো।বিগত ১৬টি বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পাঠদান ছাড়াও তাদেরকে ব্যস্ত থাকতে হতো নানা রকম উৎসব নিয়ে। সরকারি ছুটি ১০৪ দিন(শুক্রবার ও শনিবার),রোজার ছুটি,পূজার ছুটি সব মিলিয়ে ১৫০ দিনের উপরেও ছুটি থেকেছে।বাকি ২১৫ দিন! এই ২১৫ দিনের ভেতর আমাদেরকে পালন করতে হয়েছে অসংখ্য দিবস।এসব দিবসের প্রস্তুতি থাকে,শিক্ষার্থী সম্পৃক্ততা থাকে,সময়ক্ষেপণ এবং খরচ -সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে।প্রতিষ্ঠান প্রধান বাধ্য হয়ে কাজগুলো করেন।শিক্ষা অফিস ছিল প্রতিদিনের এসব অনুষ্ঠানের প্রজ্ঞাপনজারীতে ব্যস্ত।যার ফলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকার মানুষের মধ্য চলেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং দিনে দিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান প্রধান সম্পর্কে একটা নেগেটিভ ধারণা তৈরি হয়।
এই উৎসবের যাত্রা শুরু হতো ১ জানুয়ারি থেকেই।বই উৎসব – এলাকার জনপ্রতিনিধি অতিথি হিসেবে থাকবে,ব্যানার,প্যানা তৈরি করতে হবে; বছরের প্রথম দিনেই বই বিতরণের জন্য চলে উৎসব।বই উৎসব মন্দ না! বিগত সরকারের সবচেয়ে সফল একটা কার্যক্রম ছিল প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই বিতরণ।জানুয়ারির ১০ তারিখে পালন করতে হয় বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস।বঙ্গবন্ধু দ্বারা সমৃদ্ধ ইতিহাসের পাতা তবু শিক্ষার্থীদের নিয়ে পালন করতে হয় স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস।আয়োজন, অনুষ্ঠান, অঙ্কন,কবিতা এসবে কেটে যায় দুইদিন।ফেব্রুয়ারিতে পালিত হয় জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসসহ জাতীয় দিবস যেমন স্বাধীনতা দিবস,বিজয় দিবস পালনে আমার কেন,কারই কোনো অভিযোগ বা অনীহা নেই।
মার্চ মাসে কম করে হলেও সাতটি দিবস পালন করতে হয়।২ ফেব্রুয়ারি পতাকা উত্তোলন দিবস ও ভোটার দিবস।বিগত ২০১৪,২০১৯,২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন ভোটারবিহীন ছিল এবং প্রত্যেকটা নির্বাচন ই ছিল প্রহসনের নির্বাচন,ভোটাধিকারের কোনো প্রয়োগ ছিল না অথচ,আমাদেরকে পালন করতে হয়েছে ভোটার দিবস।৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ দিবস,৮ মার্চ নারী দিবস,১৫ মার্চ বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস,আর সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হয়েছে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবসে।শিক্ষার্থীসহ আমাদের সকলে ব্যস্ত থাকতে হয়।শুধু অনুষ্ঠান করলেই হবে না কেক কাটতে হবে,মিষ্টি বিতরণ,শিক্ষার্থীদের নানা প্রতিযোগিতা এবং পুরস্কার।সবচেয়ে বাজে লাগতো যখন কোনো দুর্নীতিবাজ আওয়ামী নেতা অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলেন! সব ই ছিল শুভঙ্করের ফাঁকি।২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস এবং ২৬, মার্চ স্বাধীনতা দিবস তো থাকলোই যদিও এই দু’টো পালনে আমাদের অস্বস্তি লাগে না কারণ এটা আমাদের ইতিহাস ও সার্বভৌমত্বের সাথে সম্পৃক্ত।
আসে এপ্রিল মাস! অসাম্প্রদায়িক বাঙালি চেতনার উন্মেষ ঘটাতে পালন করতে হয় পহেলা বৈশাখ! বাংলা নববর্ষ। সরকার অবশ্য পহেলা বৈশাখের ভাতা দেয় চাকুরেরা খুশি তবে চাপিয়ে দেওয়া অনুষ্ঠানে সকলে অতিষ্ঠ।সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চাপিয়ে দিয়ে হয় না বরং প্রজন্মের হাত ধরে সামনে এগিয়ে আসে।১৭ এপ্রিল মুজিব নগর দিবস।মুজিন নগরের ইতিহাস বইয়ে আছে,ইতিহাসে আছে তবু ইতিহাসের পদ্য পাঠ করতে হয় প্রতিটি অনুষ্ঠানে।মে দিবস,৩১ মে তামাক মুক্ত দিবস।নেশা করা,প্রতিনিয়ত সিগারেট গ্রহণ করা একজন নেতা এসে শিক্ষার্থীদের সামনে বলতে থাকেন,” মাদক থেকে দূরে থাকো” মুখ হাসে আর অন্তর জ্বলে এমন কথায়। ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস।তারপরে আসে দিবসের জননী আগষ্ট। আওয়ামী সরকার ও দলের ভাষায় শোকাবহ আগষ্ট।প্রতিষ্ঠানে সারা মাস ঝুলাতে হবে বঙ্গবন্ধুর ছবি,ম্যুরালে পুষ্পস্তবক, কালো ব্যাজ,পত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্র, টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।১৫ আগষ্ট শোক দিবসকে ঘিরে সারা মাস নানা আয়োজন থাকে।প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী, শিক্ষক মারা গেলেও অনুষ্ঠান চালাতে হবে,নইলে তলব বা এলাকা ভিত্তিক দলীয় লোকদের তোপের মুখে পড়তে হয়।৫ আগষ্ট পালন করতে হয় শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামালের জন্মদিন।২০২৪ এর ৫ আগষ্ট আর পালন করা সম্ভব হয়নি কারণ এইদিনে ছাত্র-জনতা বিপ্লব ঘটিয়ে সরকারের পতন ঘটায়।সেদিন শেখ হাসিনা ক্ষমতার ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।শোকাবহ আগষ্ট পালন করতে করতে সত্যি আগষ্ট যেন আওয়ামী লীগের চির শোকের মাসে পরিণত হয়েছে।মজার ব্যাপার হলো ৮ আগষ্ট ছিল বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার জন্মদিন আর সেদিন এ বছর আর কারও মনে থাকলো না।আট আগষ্ট গঠিত হলো ঐতিহাসিক নবীন-প্রবীণের অন্তর্বর্তী সরকার।এ কেবল নির্মম আগষ্ট আওয়ামী লীগের জন্য।এছাড়াও ১৮ অক্টোবর শেখ রাশেল দিবস পালিত হয় নানা আয়োজনে।৪ নভেম্বর থাকে জাতীয় সংবিধান দিবস।নিজেদের ইচ্ছে মতো সংবিধান প্রণয়ন করে ১৯৭২ সালের গৃহীত সংবিধান দিবস পালন করতে হয়।জনকল্যাণমুখী সংবিধান না হয়ে দলীয় কল্যাণের সংবিধান তাও আবার পালন করতে হয় কোনো সমালোচনা না করে।বিজয়ের মাস ডিসেম্বর আসে এক ঝাঁক দিবস নিয়ে। ১ ডিসেম্বর এইডস দিবস,৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া দিবস,১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার দিবস অথচ গত ১৬ বছরে বাংলাদেশে মানবাধিকার যেভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে তা বিশ্বের কোথাও ছিল না।গুম,খুন,আইনগত হয়রানি আর শেষে এসে আয়নাঘরের লোমহর্ষক বর্ণনা পুরো জাতিকে স্তম্ভিত করেছে।দুঃখজনক সত্যি এটাই যে সবকিছু জেনেও আমাদেরকে বলতে হয়েছে যে বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কখনোই ঘটেনি।১২ ডিসেম্বর পালন করতে হয় স্মার্ট বাংলাদেশ দিবস।ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ আর এই স্মার্ট ফোনের ছেলেমেয়েরা ই স্মার্টলি বিপ্লব ঘটলো।স্মার্ট বাংলাদেশের গঠনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রযুক্তি বিষয় উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ জয় যত উপার্জন করেছেন তা বাংলাদেশের একটা বাজেটের সমান: অবশ্য তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী পলক সাহেবও পিছিয়ে নেই।
অবশেষে আসে ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। দিবস পালন করতে করতে আমরা দিবসের জাতি হয়ে গেছি।
প্রখ্যাত ছড়াকার কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার তাঁর এক কবিতায় বলেন,” কী যাতনা বিষে,বুঝিবে সে কীসে,কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে।” বাংলাদেশের নানা দিবস নিয়ে আজ কেন লিখলাম তা কেবল আমি ই বুঝি কারণ এই দিবস পালনের দংশন আমি খেয়েছি।একটা দিবস হলে কত প্ল্যান,পরিকল্পনা করতে হয়।অনুষ্ঠান সূচি,অনুষ্ঠানমালা,উপস্থাপন, ক্রয় -সবকিছু মিলিয়ে এক ব্যস্ত সময়।আমার ব্যস্ততায় তেমন খারাপ লাগে না কিন্তু যখন দেখি সপ্তাহে প্রায় দুই,তিনটা দিন ক্লাসহীন থাকে,পাঠদান ব্যাহত হয়,ছেলেমেয়ে দিবস পালন হলে স্কুলমুখী হতে চায় না – এসবের জন্য ই আমার এ লেখা।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী খুরশিদ আলমের একটা গানের লাইন ছিল,” দিন যায় কথা থাকে,সে যে কথা দিয়ে কথা রাখলো না,ভুলে যাওয়ার আগে ভাবলো না।”
নতুন সরকার, নতুন চাওয়া,নতুন এক বাংলাদেশ বিনির্মাণের নেতাদের কাছে বলবো দিন যায়,কথা থাকে -এমন যেন না হয়।বিগত সরকারের আমলে আমরা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই দিবস পালনে ক্লান্ত হয়েছি,তা যেন আর ফিরে না আসে তবে রাষ্ট্রীয় দিবস তিনটি পালিত হোক( মাতৃভাষা দিবস,স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস)। নতুন করে আমরা আর দিবস চাপিয়ে না দিই।ইতিহাস ফরমায়েশ দিয়ে চর্চা করতে হয় না।ইতিহাস নিজে নিজেই সূর্যের মতো মেঘ বিদীর্ণ করে উদিত হবে।
যে সংস্কারের মহান প্রত্যয় নিয়ে আজ বিপ্লবী ছাত্র সমাজ এই বিপ্লব সূচিত করেছে তা যেন সত্যি হয়।
কাব্যিক ভাষায় বলি,
” রক্ত দিয়ে,জীবন দিয়ে এলো যে পরিবর্তন
সত্য,সুন্দর আর ন্যায়ে উজ্জ্বল থাক সারাক্ষণ। “
Leave a Reply