ঈদুল আযহাতে সূরা কাওসারের প্রাসঙ্গিকতা: একটি ভিন্ন বয়ান

Author বাপ্পা আজিজুল :
    সময় : সোমবার, জুন ১৭, ২০২৪, ৭:৪১ অপরাহ্ণ
  • ৬৩৭ Time View

إِنَّآ أَعْطَيْنَٰكَ ٱلْكَوْثَرَ
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنْحَرْ
إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ ٱلْأَبْتَرُ
তরজমা: নিশ্চয় আমি আপনাকে কাওসার দান করেছি। অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কোরবানী করুন। যে আপনার শত্রু, সেই তো লেজকাটা, নির্বংশ।

মৌলিক পরিচয়: সূরা কাওসার। ৩০ পারায় (আম্মা ইয়াতাসা-আলুন) ১০৮ নং সূরা। মক্কায় অবতীর্ণ (অনেকে মাদানি বললেও এটি মাক্কী জীবনের শেষ অধ্যায়ে নাযিলকৃত)। নাযিলের ক্রম অনুসারে ১৫ নং সূরা। সূরা আদিয়াতের পরে ও তাকাসুরের পূর্বে এটি নাযিল হয়। রুকু ১, আয়াত ৩, শব্দ ১০, হরফ ৪২টি। ১ম আয়াতের ‘কাওসার’ শব্দ থেকে নামকরণ। মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আসুন আগেপিছের সূরার সাথে বয়ান ও প্রেক্ষিতের সাদৃশ্য দেখে নেয়া যাক-
আগে-পরের সূরার সাথে সম্পর্ক: পূর্বের সূরা কুরাইশ ও মাউনে কুরাইশদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ, নিরাপত্তার বর্ণনার পাশাপাশি তাদের দম্ভ ও নেতিবাচক চরিত্রকে হাইলাইট করা হয়েছে। তারা ইব্রাহিম আ.এর লিগ্যাসি ভুলে গেছে। কাবা’র রাজনৈতিক নেতৃত্বে থাকলেও আধ্যাত্মিকভাবে সেখানে ঘটিয়েছে বিকৃতি ও বিচ্যুতি। যেহেতু মুহাম্মদের সা. ছেলেপুলে নেই, তাই সেতো এই কাবার নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হবে এবং বংশানুক্রমে তাঁর পক্ষ থেকে সেটি বহন করারও কেউ নেই। তাই মুহাম্মদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার, সে তো আবতার বা শেকড়চ্ছিন্ন। কুরাইশ নেতারা মনে করেছিল বাইতুল্লাহ’র দায়িত্ব তাদের স্পেশাল রক্ষাকবচ। আল্লাহর প্রিয় বান্দা তারাই। তাই তো আবরাহার কবল থেকে তারা রক্ষা পেয়েছে। সূরা মাউনে তাদের সমুদয় অসৎ কর্মের শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। সূরা কাওসারে কুরাইশ নেতাদের কাছ থেকে নেতৃত্বের ঝাণ্ডা মুহাম্মদ সা. ও তাঁর অনুসারীদের হস্তগত হওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে। এরপরের সূরা কাফিরুনে কুরাইশ নেতাদের সাথে মুসলিমদের বিরোধ, আকিদা ও কর্মপদ্ধতিগত বৈসাদৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। কাফিরুনের শেষ আয়াত- ‘তোমাদের দ্বীন তোমাদের জন্য, আমাদের দ্বীন আমাদের জন্য’ এর মাধ্যমে কাফিরদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বর্তমানে অনেকেই আয়াতটিকে সেক্যুলার বা অন্য মতের সাথে ইসলামের পারস্পরিক স্বীকৃতি দান ও মেনে নিয়ে অর্থাৎ আপসকামিতার ক্ষেত্রে ব্যবহারের অপপ্রয়াস চালান। ব্যাপারটি মোটেও তা নয়। বরং এর মাধ্যমে কুফফারের সাথে চূড়ান্ত সংগ্রামের ইশতেহার ঘোষিত হয়েছে।

মূল আলোচনা:এবার কাওসারের ৩ টি আয়াতের মর্মোদ্ধার করা যাক। ১ম আয়াত ‘নিশ্চয় আমরা আপনাকে কাওসার দান করেছি’। বাংলায় ‘প্রেজেন্ট পারফেক্ট টেনসে’ অনুবাদ করা হলেও আয়াতটি আরবিতে অতীতকালের ভাষ্যে বর্ণিত হয়েছে। এটি আরবি ভাষার একটি রীতি এবং কুর’আনে এর অসংখ্য উদাহরণ আছে। মূলত ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতির নিশ্চয়তা কিংবা অবশ্যম্ভাবিতা বুঝানোর জন্য এমন শব্দ চয়ন করা হয়েছে, যদিও ঘটনাগুলো ভবিষ্যতে ঘটবে। এই আয়াতটি তাই একটি ভবিষৎবাণীও। মানে এটা সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।

সিদ্ধান্তটি কী? কাওসার দানের সিদ্ধান্ত। তাহলে কাওসার জিনিসটা কী? এর ব্যাখ্যায় অধিকাংশ তাফসিরকারক ‘জান্নাতের একটি নদী/নহর/ঝর্ণা/পুকুর’ যার একটি প্রতীকী ক্ষুদ্র রূপ বিচার দিবসে বিদ্যমান থাকবে যাকে ‘হাউজে কাওসার’ বলা হয়। সেখানে অসংখ্য পানপেয়ালা থাকবে। রাসুল সা. সেটির অধিকারী হবেন তিনি তাঁর উম্মতদের মধ্যে হক্কপন্থীদের সেটি থেকে পান করাবেন। এই মত দিয়েছে আয়িশা, ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর, আনাস রা., আতা, মুজাহিদ, আবুল আলিয়া র.।

কাওসার শব্দের বুৎপত্তি ‘কাসরাত/কুসরুন’ শব্দ থেকে যার অর্থ সম্পদের আধিক্য, সীমাহীন প্রাচুর্য, ভালো যা কিছু আছে ইত্যাদি। তাহলে আয়াতটির অর্থ দাঁড়ায় ‘আমি আপনাকে সীমাহীন প্রাচুর্য বা নেয়ামতের আধিক্য দান করেছি। কাওসার শব্দটি অনেকটা বাংলায় বিশেষণের বিশেষণ বা অতিশায়নের মতো। আল্লাহর রাসুল সা.কে দেয়া সকল নেয়ামত কাওসারের অন্তর্ভুক্ত। নট অনলি জান্নাতের নহর অর হাউজে কাওসার। এগুলো তো বটেই সাথে অন্য সব। এই মতের পক্ষে ইবনে আব্বাস, সাঈদ ইবনে যুবায়ের রা. এবং মুজাহিদ, কাতাদা ও ইকরিমা র.। এছাড়া ইবনে আব্বাস কাওসারের আরেকটা অর্থ করেছেন ‘কুর’আন’। অর্থাৎ নিশ্চয় আমরা আপনাকে কুর’আন দান করেছি।

আবুল আ’লা তাঁর তাফসিরে, কাওসারের অর্থ সমুদয় কল্যাণকর বিষয়াদি হিসেবে রাসুল সা. উন্নত নৈতিক গুণাবলি, নবুয়ত, কুর’আন, জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির নেয়ামত, দাওয়াতের সাফল্য, উম্মতের একটি শক্তিশালী দল, তাওহীদের প্রতিষ্ঠা ও দ্বীনের বিজয় জীবদ্দশায় প্রত্যক্ষ করা, কিয়ামত পর্যন্ত রাসুল সা.এর নাম উচ্চকিত হওয়া, ফাতিমার মাধ্যমে বংশীয় ধারা ইত্যাদির উল্লেখ করেছেন। আমার কাছে আরও মনে হয়, রাসুলুল্লাহ সা. এর মুজিযা, ইসরা-মিরাজ, যুদ্ধ জয়, শাহাদাত বরণ, হাশরের মাঠে শাফায়াত করার ক্ষমতা লাভ প্রভৃতিও কাওসারের তালিকায় যুক্ত হতে পারে।

পূর্ববর্তী তাফসিরসমূহে কাওসারের যে তিনটি অর্থ বর্ণিত হয়েছে সেগুলোকে আমরা ২ শ্রেণিতে ভাগ করতে পারি-
১. দুনিয়ার কাওসার (যাবতীয় কল্যাণের আধিক্য, উন্নত চরিত্র, নবুয়ত, কুর’আন, জ্ঞান, প্রজ্ঞা…)
২. আখিরাতের কাওসার ( হাউজে কাওসার এবং জান্নাতের কাওসার, দুটি প্রায় কাছাকাছি অর্থাৎ জলাধার)
যাবতীয় কল্যাণের আধিক্য দ্বারা যদিও দুনিয়া ও আখিরাতের কাওসার দুটোকেই ব্যাখ্যা করা যায়।

ইমাম ফারাহি ও আমিন আহসান ইসলাহি কাওসারের অর্থ করেছেন বাইতুল্লাহ অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের প্রতিশ্রুতি। সূরার প্রেক্ষাপট, আগেপিছের সূরার সাথে সম্পর্ক, সালাফদের বর্ণনা, আয়াতের শব্দ ও বর্ণনাগত ভাষ্য এবং ইংগিত বিবেচনা করলে তাদের এই মতকে যথেষ্ট যৌক্তিক মনে হয়। কেন? আসুন ব্যাখ্যা করি-

১. কিয়ামতের দিন মানুষ হাউজে কাওসারের কাছে কেন যাবে? বুকফাটা তৃষ্ণা নিয়ে। কিয়ামত দিবস ও হাশরের ময়দানের ভয়াবহতা ও পরিণামের কথা চিন্তা করুন। কাওসারের জল তাদের পরিতৃপ্ত করবে। নতুন সঞ্জিবনী দেবে। জান্নাতের নহর-কাওসারের উদ্দেশ্য বা ব্যবহারও সমপর্যায়ের। এখন বলুন, দুনিয়ার জীবনে মুমিনের তৃষ্ণা কী? আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন বা আল্লাহকে পাওয়া। এখন হজের কথা কল্পনা করুন। লক্ষ লক্ষ মানুষ কাবাকে কেন্দ্র করে জমায়েত হয়েছে, আবর্তিত হচ্ছে যেমন কিয়ামতে কিংবা জান্নাতে তৃষ্ণা নিবারণের জন্য কাওসারের চারধারে বৃত্তাকারে একত্রিত হবে। হজ শেষে তারা প্রশান্ত অন্তরে তৃপ্তি ও নতুন সঞ্জিবনী নিয়ে ঘরে ফিরবেন।

২। সহিহ বুখারিতে রাসুল সা. আমাদের মসজিদসমূহকে নদী বা নহরের সাথে তুলনা করেছেন। যেটির সারাংশ হল- যদি কারও বাড়ির পাশে নদী বা জলাধার থাকে, সে যদি দৈনিক ৫ বার সেখানে অবগাহন করে, তাহলে তার দেহে কী ময়লা থাকতে পারে? তেমনি যে দৈনিক ৫ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে আদায় করবে, আল্লাহ তার অন্তরের নাপাকি দূর করে দেবেন। বলা বাহুল্য, কাবা হল আমাদের মসজিদসমূহের ইমাম এবং নিজেও মসজিদ। তাই বাইতুল্লাহ শুধু মুমিনের আল্লাহকে পাওয়ার তৃষ্ণা নিবারণই করে না, শারীরিক ও আধ্যাত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ করে। সেদিক থেকেও বাইতুল্লাহ কাওসারের প্রতীক হয়ে ওঠে।

৩. হজের জমায়েত খেয়াল করুন, এখানে কিন্তু মুসলিমদের সংখ্যাধিক্য ঘটে। একক স্থানে উপাসনার সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে অন্য যেকোন ধর্মের চেয়ে এটি অনেকগুণ বেশি। হাজি সংখ্যার দিকে থেকেও এটি কাওসার শব্দের অর্থের প্রতিফলন। আবার কিয়ামতের দিনে আল্লাহর রাসুল অন্যান্য নবির উম্মতের তুলনায় আমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ববোধ করবেন যাদের নিয়ে তিনি হাউজে কাওসারে একত্রিত হবেন। দুটোকে রিলেট করে দেখুন।

৪. রাসুল সা. বলেছেন, কিয়ামতের দিন তিনি তাঁর উম্মতের দেহে অযুর স্থানের নুরের চমক বা চিহ্ন দেখে হাউজে কাওসারের নিকট সনাক্ত করবেন। এটা তাদের ক্ষেত্রেই হবে যাদের অন্তর হবে পরিশুদ্ধ। যারা বাইতুল্লাহতে মকবুল হজ করে পরিশুদ্ধ অন্তরে মৃত্যুবরণ করবে তাদের জন্য এটি একটি উপমা বা উদাহরণ।

৫. এই বাইতুল্লাহ বা মক্কা বিজয়ের পরে এবং আরও স্পেসিফিক করে বললে আল্লাহর রাসুলের বিদায় হজের পরেই মুসলিম উম্মাহ’র অগণিত সংখ্যা ও শক্তিবৃদ্ধি হয়। তাই বাইতুল্লাহর উপর প্রভাব প্রতিষ্ঠা তথা মক্কা বিজয়ের প্রতিশ্রুতিই হল দুনিয়ার কাওসার।

৬. সূরা ইমরানের ৯৫ আয়াতে মক্কা ও বাইতুল্লাহকে আল্লাহ প্রভূত কল্যাণের আধার হিসেবে অভিহিত করেছেন যা কাওসারের সম্পূরক।

“নিঃসন্দেহে মানুষের জন্য সর্বপ্রথম যে ইবাদাত গৃহটি নির্মিত হয় সেটি বাক্কায় (মক্কা) অবস্থিত। তাকে কল্যাণ ও বরকত দান করা হয়েছিল এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়াতের কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছিল।”

বাক্কা শব্দের অর্থ বিশ্লেষণে আপনারা জেনে থাকবেন, বাক্কা মানে বুদবুদ। পানির প্রচণ্ড ঘূর্ণনের কারণে এর কেন্দ্রে যে বুদবুদ বা ফেনা তৈরি হয় সেটিই বাক্কা। এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে কাবা শরীফ শুধু দুনিয়ার আধ্যাত্মিক কেন্দ্রই নয় বরং ভৌগলিক কেন্দ্র যেখান থেকে ভূপৃষ্ঠের মাটির উৎপত্তি। এছাড়া রাসুল সা. এর হাদিস থেকে এটিও জানা যায় বাইতুল্লাহ বা কাবা বরং সাত আসমানের উপরে অবস্থিত ‘বাইতুল মামুর’ এর প্রতিলিপি যাকে কেন্দ্র করে ফেরেশতারা তাওয়াফ করে।

৭. আখিরাতের কাওসার সংক্রান্ত যেসকল হাদিস পাওয়া যায় সেগুলোর বর্ণনা একত্র করলে কাওসারের যে অবয়ব ও বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় তা হল-
কাওসারের চারপাশের কিনারা বা পাড় মুক্তাখচিত। তলদেশ বা ফ্লোর গঠিত রুবি, উন্নত শৈবাল দিয়ে। কাওসারের পানি দুধের চেয়ে সাদা, মধুর চেয়ে মিষ্টি, মিশক এর চেয়ে সুঘ্রাণ, বরফের চেয়ে শীতল। পানপাত্রটি হবে তারকার ন্যায় ঝলমলে। এখানে যে পাখিরা ঘুরবে তাদের ঘাড় দেখতে জবাইকৃত পশুর গলা সদৃশ।

আচ্ছা চোখ বন্ধ করুন। হাউজে কাওসার বা জান্নাতের এই কাওসারের চিত্রটি কল্পনা করুন। এবার হজের চিত্রটি চিন্তা করুন। একটু উপর থেকে দেখুন। যেমন এখন ড্রোন ক্যামেরা ব্যবহার করে উপর থেকে নিচের ভিউ পাওয়া যায়। মিলিয়ে নিন। সমগ্র দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাছাই করা বিশুদ্ধ হৃদয়ের লক্ষ লক্ষ হাজি যখন তাওয়াফ করছেন, নামাজ পড়ছেন তখন এই জমিন বা ফ্লোরটা কী রুবি কিংবা শৈবালের চেয়ে উত্তম ও মূল্যবান নয়? হাজিরা সুগন্ধি ব্যবহার করছেন তা কী মিশকের চেয়ে কম? হাজিদের তাঁবু যেন মণিমুক্তা খচিত কাওসারের পাড়! যে ঘরে কুর’আন তিলাওয়াত হয়, আল্লাহর স্মরণ হয়, আসমানবাসীর কাছে তা এতটা উজ্জ্বল হয় যেমন দুনিয়াবাসীর কাছে আসমানের তারকা দেদীপ্যমান হয়। তাহলে এই তাঁবুগুলো বা হাজিদের রেসিডেন্স কী কাওসারের পানপেয়ালার সাথে তুলনীয় নয়? এরপর সারিবদ্ধ জবাইকৃত উটের দিকে লক্ষ্য করুন যা ইয়াওমুম নাহারের দিনে হজের শেষে কুরবানি করা হয়। এই উটের ঘাড়ের সাথে কাওসারের কাছে সারিবদ্ধ থাকা পাখিদের উপমা হুবহু মিলে যায়। সুবহানাল্লাহ! এ যেন আলমে মিছাল বা একটি আরেকটির স্বরূপ জগত। মিরর ইমেজ।

৮. কেউ হয়ত মনে করতে পারেন, আমরা জোর করে হজের সাথে, বাইতুল্লাহ’র সাথে দৃশ্যপট মেলানোর চেষ্টা করছি। না ভাই। সূরা কাওসারের ২য় আয়াতে কিন্তু এখনো আসিনি। ২য় আয়াত- ‘কাজেই আপনি নিজের রবের নামে নামাজ পড়ুন ও কুরবানি করুন’। দেখুন, ২য় আয়াতে ইঙ্গিত স্পষ্ট। প্রত্যেক অধিকার, পুরস্কারের নেপথ্যে কিন্তু দায়িত্ব-কর্তব্য থাকে। এই যে ১ম আয়াতে কাওসারের ওয়াদা করা হল, সেটা পাইতে হইলে আপনাকে এই দুইটা কাজ বা শর্ত আদায় করতে হবে। এখন বাইতুল্লাহ’র সাথে সালাত ও কুরবানির সম্পর্ক কী? ঐ যে বলছিলাম, কুরাইশরা কাবার অনেক দায়িত্ব পালন করলেও এতে শিরক আছে, নামায নাই, হজের নিয়ম-কানুন চেঞ্জড, কুরবানি করছে দেবদেবীর নামে, তাদের বেদীতে, ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ (যা এক ধরণের বিশেষ কুরবানি- এর মধ্যে যাকাত, সদাকা, হাদিয়া, আল্লাহর রাস্তায় ব্যয়, ইয়াতিমদের ভরণপোষণ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত) নাই। তাহলে আল্লাহর রাসুলকে কাওসার পাইতে চাইলে তাঁর এগুলো প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে হবে। হজ উপলক্ষে সালাত (সালাত এক ধরণের যিকর, সালাত দু’আ অর্থে ও অন্য সকল ফর্ম অব যিকর) এবং সকল ধরণের কুরবানির (আর্থিক, শারীরিক, মানসিক) সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়। আর সেটা বাইতুল্লাহতে বা বাইতুল্লাহকে কেন্দ্র করেই।

৯. এবার ৩য় আয়াতের সাপোর্টিং এভিডেন্স দরকার। ১ম দুটি আয়াত একত্রে নাযিলের কিছুকাল পরে শেষ আয়াতটি নাযিল হয়। এসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জটি আপনারা জানেন। আরবের কবি-চিন্তকেরা বলতে বাধ্য হয়- লাইসা হাযা কালামুল বাশার। এটা মানুষ রচিত কোন কালাম নয়। আগের ২ আয়াত নিয়ে ততদিন নানাবিধ ব্যবচ্ছেদ কুরাইশরা করে ফেলেছে। এই ব্যাখ্যাগুলোও তাদের কাছে পরিষ্কার। তাদের হাত থেকে ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক এমনকি রাজনৈতিক আধিপত্য ও নেতৃত্ব মুহাম্মাদের সা. হাতে চলে যাবে। এটাই তো মূল দ্বন্দ্ব। বাইতুল্লাহ হাতছাড়া হয়ে গেলে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে তারা। ঘরে এবং বাইরে। সিরিয়া, ইয়ামেনের বাণিজ্য হারাতে হবে। সামাজিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তাও হারাতে হবে। কিন্তু কথা হল মুহাম্মদ সা. এই নেতৃত্ব কিভাবে ধরে রাখবে? শেষ আয়াতটি এই প্রশ্নের জবাব। আবার নিন্দার জবাবের পাশাপাশি কুরাইশ কাফিরদের নির্বংশ করে দেয়ার ভয়াবহ হুমকি। ‘নিশ্চয় আপনার শত্রুরাই শেকড়হীন’। আরবিতে আবতার তাকে বলে যার মৃত্যুর পড়ে নাম নেয়ার কেউ থাকে না। রাসুলুল্লাহ’র রক্তবংশ এবং ইলম ও রুহানি উত্তরাধিকারী কিয়ামত পর্যন্ত বিরাজমান হবে যার টার্নিং পয়েন্ট বা মকসুদ পূরণ হয়েছে বাইতুল্লাহ উদ্ধার, মক্কা বিজয় ও বিদায় হজের মাধ্যমে। কারণ বিদায় হজে ১ লাখ সাহাবিদের মধ্যে কয়েক হাজারই ব্যাক করেছেন। বাকিদের যার সওয়ারের মুখ যেদিকে তিনি সেদিকে বিচরণ করে দুনিয়াব্যাপী ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন।

শেষকথা: পরিশেষে দীর্ঘ আলোচনার সামারি- আল্লাহ কুর’আনে আমাদের চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা করতে বলেছেন। আমাদের উচিত একটু পড়াশোনা করা। সূরা কাওসার। ছোট্ট একটি সূরা। অনেকে এর অর্থও জানি না জানলেও তাফসির জানি না। যারা তাফসির টুকটাক জানে, তারা শুধু কাওসার একটি নহর যা আখিরাতে রাসুল সা.কে দেয়া হবে। কাওসার দেখতে এরকম, তার পানি এরকম। এজন্য নামাজ ও কুরবানি করতে হবে। কাফিরেরা আবতার বা শেকড়চ্ছিন্ন। এতটুকু জেনে জীবন পার করে দিচ্ছি। নামাজ পড়ি, হজ করি, কুরবানি করি কিন্তু সূরা কাওসারের মূল স্পিরিট জানি না। ঈদুল আযহা যায়-আসে। সূরা কাওসার যে হজ, কুরবানির সাথে এতটা প্রাসঙ্গিক, কোনদিন কারও খুতবায় শুনি না।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com