জামায়াতকে ঠেকাতে ভারতের ‘দেওবন্দী মিশন’

Reporter Name
    সময় : বুধবার, আগস্ট ১২, ২০২৬, ৮:৫৬ অপরাহ্ণ
  • ৭৯ Time View
এফ শাহজাহান :
চব্বিশের জুলাই বিপ্লব প্রমান করেছে যে, ইসলামপন্থীরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারনের মূল চালিকাশক্তি। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী এখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রমান করছে যে, এখানকার ইসলামপন্থীরাই খাঁটি বাংলাদেশপন্থী। তাই
বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের এই অদম্য শক্তির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে ভারত এবার ‘দেওবন্দী মিশন’মাঠে নামিয়েছে।
বাংলাদেশের বাদবাঁকী ‘রাম-বাম জাতীয়তাবাদীরা’ ভারতপন্থী। এরা মূলত ‘সেক্যুলার ইসলামিস্ট’। এরা ইসলামকে শুধুমাত্র মসজিদ-মাদরাসার জিনিস মনে করে। এরা নামাজ-রোজাও করে আবার সুদ-ঘুষও খায়। এরা শবে-বরাতের রাতে গোসল করে মসজিদেও যায়, আবার থার্টি ফাস্ট নাইটে চাঁদাবাজির টাকায় মদ-জুয়া মউজ-মাস্তিও করে।
ক্ষমতায় যেতে এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে এরাই পুরাপুরি ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এরা মনে করে, ভারতকে খুশি রাখতে না করলে টিকে থাকা যাবে না। বাংলাদেশের ক্ষমতালোভী এই রাজনৈতিক ধারা এবং ডিপস্টেটের পুরাটাই এখন ভারতপন্থী।
এ কারণেই ভারতের সবচেয়ে বড় মাথাব্যাথা বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির বিকাশমান ধারা। এই ধারাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দূর্বল করে দেওয়াই ভারতের ‘প্রাইম এজেন্ডা’
ভারত জানে যে, বাংলাদেশকে করদরাজ্য বানাতে সবচেয়ে বড় বাধা ইসলামপন্থীদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক শক্তি। এই অবস্থায় সেখানকার পলিটিক্যাল ইসলামিস্ট এবং ট্রাডিশনাল ইসলামিস্টদের ঐক্য গড়ে উঠলে বাংলাদেশে ইসলামী বিপ্লব অনিবার্য।
তাই পলিটিক্যাল ইসলামিস্ট এবং ট্রাডিশনাল ইসলামিস্টদের মধ্যেকার দূরত্ব বাড়াতে চায় ভারত। এই দুই ইসলামী শক্তির মধ্যে যতদিন বিরোধ লাগিয়ে রাখা যাবে, ততদিন ভারত নিরাপদে বাংলাদেশকে করদরাজ্য বানিয়ে রাখতে পারবে।
বাংলাদেশের ইসলামী বিপ্লবকে সবচেয়ে বড় হুমকী মনে করে ভারত। কারণ, অখণ্ড ভারতে রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার একমাত্র বাধা ইসলামী বিপ্লব এবং বাংলাদেশের ইসলামপন্থী জনতার অদম্য শক্তির সমন্বয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পলিটিক্যাল ইসলামের সবচেয়ে বড় শক্তি জামায়াতে ইসলামী। অপরদিকে বাংলাদেশে ট্রাডিশনাল ইসলামের সবচেয়ে বড় শক্তি কওমী ঘরানার ইসলামপন্থীরা। তাই জামায়াত ও কওমীদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ানোকেই আধিপত্য বিস্তারের মূল মন্ত্র মনে করে ভারত।
ভারত হিসাব-নিকাশ করে নিশ্চিত হয়েছে যে, বাংলাদেশের ইসলামপন্থী এই দুই শক্তির ঐক্য গড়ে উঠলে কোনভাবেই ইসলামী বিপ্লব ঠেকানো যাবে না। আর বাংলাদেশে ইসলামী বিপ্লব ঠেকানো না গেলে অখণ্ড ভারতে রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায় করা সম্ভব হবে না।
সে জন্য বাংলাদেশের পলিটিক্যাল ইসলামিস্ট এবং ট্রাডিশনাল ইসলামিস্টদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে ভারত। সেই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কওমী আলেমদের দূরত্ব বাড়াতে গোয়েন্দা মিশনের পাশাপাশি ‘দেওবন্দী মিশন’ কাজ করছে।
জামায়াতে ইসলামী এবং কওমী আলেমদের বিরোধ উস্কে দিয়ে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিকভাবে কোনঠাসা করার ‘দেওবন্দী মিশন’ এখন বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে । মিশন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ভারতের ঐতিহাসিক দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসার মুহতামিম মুফতি আবুল কাসেম নোমানীকে চলতি আগস্ট মাসের শুরুতে চার দিনের সফরে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে ভারত।
মুহতামিম মুফতি আবুল কাসেম নোমানীর বাংলাদেশ মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিলো বাংলাদেশের কওমী আলেমদেরকে জামায়াতের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিয়ে ইসলামপন্থীদের বৃহত্তর ঐক্যে ফাটল ধরানোর মাধ্যমে ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্টকে দুর্বল করা এবং বাংলাদেশকে করদরাজ্য বানানোর পথ প্রশস্ত করা।
গত ৪ আগস্ট ঢাকায় পৌঁছানোর পর মুফতি আবুল কাসেম নোমানী রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার কওমি মাদ্রাসা ও ইসলামি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন এবং শীর্ষ স্থানীয় ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
এসব মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি কওমী আলেমদের উদ্দেশ্যে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে নানা বিষোদগার উস্কে দিয়েছেন। জামায়াতের সংশ্রব এড়িয়ে চলার ওপর জোর দিয়েছেন। জামায়াতের আকীদা বিশ্বাস নিয়েও কওমী আলেমদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন।
বিশেষ করে মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদীর বিরুদ্ধে প্রচন্ড ঘৃণা প্রকাশ করে বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। জামায়াতের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেছেন, কওমী আলেমরা যাতে জামায়াতের সঙ্গে মিশতে না পারে, সেজন্য সকলকে সব সময় সজাগ থাকতে হবে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, জামায়াতের লোকজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাত হলে সালাম-কালাম করা যাবে কিন্তু তাদের সঙ্গে মেশা যাবে না।
মুফতি আবুল কাসেম নোমানীর মতবিনিময় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া একজন কওমী আলেম নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সম্প্রতি কওমী অঙ্গনের বেশ কিছু আলেমের জামায়াতে যোগদানের বিষয়ে তিনি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন এবং ভবিষ্যতে যাতে এধরনের ঘটনা আর না ঘটে সেজন্য সবাইকে সতর্ক করেন।
জামায়তের সঙ্গে কয়েকটি ইসলামী দলের জোট ভেঙ্গে দেওয়ার ওপরে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন। বিশেষ করে ১১ দলীয় জোট থেকে যাতে ইসলামপন্থী দলগুলো বের হয়ে যায়,সে বিষয়ে কড়া মোটভেশন দিয়েছেন।
৫ আগস্ট রাজধানীর ফার্মগেটের খামারবাড়িস্থ কেআইবি কমপ্লেক্সে মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত ইলমি সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মুফতি আবুল কাসেম নোমানী। একই দিন মিরপুরের আরজাবাদে জামিয়া হুসাইনিয়া ইসলামিয়া মাদরাসায় উলামায়ে কেরামের উদ্দেশে বিশেষ নসিহত এবং সন্ধ্যায় বসুন্ধরার মারকাজুল ফিকরিল ইসলামিতে ইসলাহি বয়ান করেন।
সফরকালে তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আধ্যাত্মিক ও তাত্ত্বিক প্রোগ্রামের আড়ালে রাজনৈতিক প্রোগ্রামে যোগ দেন। যার মধ্যে ৬ আগস্ট বগুড়া ও যশোর সফর এবং ৭ আগস্ট রাজধানীর আফতাবনগরে খতমে নবুওয়াত কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন।
৬ আগস্ট তিনি হেলিকপ্টারযোগে বগুড়া ও যশোর সফর করেন। বগুড়ার জামিল মাদরাসায় তিনি উত্তরাঞ্জলের কয়েক হাজার কওমী আলেমের সমাবেশে বক্তব্য দেন। যশোরে ‘তাহাফফুজে ফিকরে আকাবির’ শীর্ষক সমাবেশে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার পর ঢাকায় ফিরে উত্তরায় উলামা ও আইম্মা কাউন্সিলের উদ্যোগে ‘দেওবন্দের ঐতিহ্য ও খিদমত’ শীর্ষক সম্মেলনে নসিহত করেন।
৭ আগস্ট শুক্রবার রাজধানীর আফতাবনগরে ‘খতমে নবুওয়াত কনফারেন্সে যোগ দেন তিনি। খতমে নবুওয়াত সংরক্ষণ কমিটি বাংলাদেশের উদ্যোগে রাজধানীর বাড্ডার আফতাবনগরে অবস্থিত আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া ইদারাতুল উলুম মাদরাসা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে বক্তব্য দেন।
শুক্রবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজ আদায় ও বয়ান শেষে বিকেল সাড়ে ৪টায় ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন।
মুফতি আবুল কাসেম নোমানীর এই ‘দেওবন্দী মিশনের’ পরপরই হেফাজত আমীরের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাক্ষাৎ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সেই সঙ্গে ভারতের প্রধান বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং ‘র’ এর প্রধান পরাগ জৈনের বাংলাদেশ সফরও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
………………………………….
এফ শাহজাহান
ক্রাইসিস অ্যানালাইসিস
১২ জুলাই ২০২৬
………………………………….

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com