আওয়ামী লীগের মিশন যে কারণে কওমী লীগের ঘাড়ে

Reporter Name
    সময় : মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬, ১২:১৯ অপরাহ্ণ
  • ২২৯ Time View
এফ শাহজাহান :
আওয়ামী লীগ আর ‘কওমী লীগ’ দুটোই বাংলাদেশে ভারতীয় অধিপত্যবাদের মুল ক্রীড়নক।
বাংলাদেশের ভারতীয় আধিপত্যবাদ কায়েমে ভারতের ডান হাত হচ্ছে আওয়ামী লীগ আর বাম হাত হচ্ছে কওমী লীগ। আওয়ামী লীগ এখন নির্বাসিত থাকার কারণে ‘কওমী লীগকে’(৭ দলীয় কওমী জোট) মাঠে নামাচ্ছে ভারত।
আওয়ামী লীগ এখন মাঠে নেই। তাই বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলন ঠেকানোর নীল নকশা বাস্তবায়নের জোরালো প্লাটফরমও নেই। এ কারণে কওমী ঘরানার ৭ দলকে নিয়ে ‘কওমী লীগ’ গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলন ঠেকানোর এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’।
এই মিশনের মূল কলকাঠি নাড়ছে ‘আকবীরে দেওবন্দ’।
‘দেওবন্দীয়্যতের’ ‘বাতেনী’ মিশন হচ্ছে ভারত-পাকিস্তান বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলন দমন করার মাধ্যমে অখন্ড ভারতে রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করা।
সেই মিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এই তিন দেশের ইসলামী গণজাগরণ স্তব্ধ করে দিতে যুগে যুগে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসাকে সবচেয়ে মজবুত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
‘দেওবন্দীয়্যতের’ বাংলাদেশী সংস্করণ ‘কওমীয়্যতের’ মিশনও বহু আগে থেকে সেই লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়ে আসছে।
যুগ যুগ ধরে ‘র’ এর রোডম্যাপ অনুযায়ী ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসার মাধ্যমে বাংলাদেশের কওমী মাদরাসাগুলো পরিচালিত হচ্ছে। এদের পেছনে গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। যে কারণে শুরু থেকে বাংলাদেশের কওমী মাদরাসাগুলো সব সময় সরকারের যে কোন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা নিতে অস্বীকার করে আসছে।
সরকারি সাহায্য নিলে সরকারের নজরদারিতে থাকতে হবে। ফলে ‘র’ এর মিশন বাস্তবায়নে ব্যাঘাত ঘটবে। এজন্যই তারা সরকারি সহযোগিতা না নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা ‘র’ এর রোডম্যাপ অনুসরণ করেন।
রামরাজত্ব ভারতের প্রথম এবং প্রধান বাধা জামায়াত। আর জামায়াতকে ঠেকানোর প্রধান অস্ত্র ‘দেওবন্দীয়্যত’ আর কওমীয়্যত’। ‘দেওবন্দীয়্যত’ আর কওমীয়্যত’ মিলে মওদুদীয়্যত খতম করার এই কূটচালের পেছনে রয়েছে ভারতের এক গভীর কূটচাল।
জামায়াতের জন্মলগ্ন থেকেই এই দুই অস্ত্র প্রয়োগ করে বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলন দমন করে আসছে ভারত। শুরুতে রাজনীতি হারাম এই ফতোয়ার মাধ্যমে জামায়াতকে ঘায়েল করতে গিয়ে পরাজিত হয় কওমী লীগ। পরবর্তীতে ভারতের রোডম্যাপ অনুযায়ী বাংলাদেশের রাজনীতিতে কওমীদের অভিষেক ঘটে ।
এরপর নির্বাচন নাজয়েজের ফতোয়া নিয়ে মাঠে নামে বাংলাদেশের কওমী লীগ। সেই মিশনেও তারা ব্যর্থ হয়। একপর্যায়ে কওমী দলগুলো নিজেরাই নির্বাচনের মাঠ দখলের লড়াইয়ে নামে। আর সেই লড়াইয়ের কে কার আগে যেতে পারে সেই প্রতিযোগীতা থেকেই কওমী রাজনীতি ১৪ ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
হেফাজত আমিরের উদ্যোগে সম্প্রতি কওমী ঘরানার ৭টি দলের একত্রিত হওয়ার প্রচেষ্টা এবং জামায়াতবিরোধী একটি অবস্থান তৈরির গুঞ্জন রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করলেও এই পন্থা একেবারেই নতুন নয়। এর আগেও জামায়াতকে ঠেকাতে বহুবার বহু কৌশলে কওমী লীগ গঠিত হয়েছে এবং তারা বার বার তাদের মিশনে ব্যর্থ হয়েছেন।
ভূ-রাজনীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে সাম্প্রতিক এই কওমী লীগ গঠনের পেছনে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর যে ভূমিকা রয়েছে, তা নিচের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠবে ।
প্রথমত : কওমী বনাম জামায়াত: ঐতিহাসিক ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব
কওমী ধারার ইসলামপন্থীদের সাথে জামায়াতে ইসলামীর দূরত্ব নতুন কিছু নয়। কওমী ঘরানার আলেমরা মূলত দেওবন্দী আকিদা বা আদর্শ অনুসরণ করেন, যা জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক দর্শনের । যাকে তারা ‘মওদুদীয়ত’ বলে থাকেন।
দ্বিতীয়ত : আকিদাগত পার্থক্যের বয়ান
দেশের বৃহৎ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ওপর কার প্রভাব বেশি থাকবে, তা নিয়ে এই দুই শক্তির মধ্যে সুপ্ত প্রতিযোগিতা সবসময়ই ছিল। কওমী দলগুলো মনে করে, জামায়াতের রাজনৈতিক দক্ষতার কাছে পরাজিত হয়ে তারা বারবার মাঠের রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়েছেন। এজন্য কওমী ধারার আলেমদের একাংশ জামায়াতকে ধর্মীয়ভাবে মূলধারা থেকে বিচ্যুত ঘোষণা করতেও দ্বিধা করেননি।
তৃতীয়ত : ‘র’ এর ষড়যন্ত্র
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে, বিশেষ করে বাংলাদেশে যেকোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ বা জোট গঠনের পেছনে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর হাত থাকার অভিযোগ আজ নতুন নয়। এটি কোন কাল্পনিক বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বও নয়। বাস্তবেও ভারতের অস্তিত্ত্ব রক্ষা এবং অখন্য ভারতে রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার কঠিণ বাস্তবতাও।
চতুর্তত : জামায়াত ঠেকাও নীতি
ভারতের দীর্ঘদিনের একটি কৌশলগত অবস্থান হলো, তারা বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী বা উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর উত্থানকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে। ফলে জামায়াতের রাজনৈতিক প্রভাবকে দুর্বল বা কাউন্টার (প্রতিহত) করতে পারে এমন যেকোনো দেশীয় শক্তি বা জোটকে ভারত কৌশলগত সহযোগিতা দিবে এটাই স্বাভাবিক ।
ঐতিহাসিকভাবেই ভারত জামায়াতে ইসলামীকে একটি ভারতবিরোধী এবং চরমপন্থী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনৈতিক উত্থান ভারতের জন্য সবসময়ই একটি বড় উদ্বেগের কারণ। তাই জামায়াতের একক আধিপত্য ঠেকাতে ভারতের নীতি-নির্ধারকরা একটি বিকল্প ‘দেশীয় ও জাতীয়তাবাদী’ ঘরানার ইসলামপন্থী শক্তিকে সামনে আনতে চেচ্ছে, এমন ধারণা অস্বাভাবিক নয়।
পঞ্চমত : কওমী কার্ড ব্যবহার
কওমী ধারার দলগুলো ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতবিরোধী এবং তারা মূলত বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক রাজনীতিতে বেশি মনোযোগী। ভারতের স্ট্র্যাটেজিক সার্কেল মনে করতে পারে যে, জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে প্রগতিশীল বা ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর চেয়ে কওমী ধারার ইসলামপন্থীরা অনেক বেশি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।
ষষ্টত : ইসলামী ভোটে বিভাজন
যদি কওমী দলগুলো আলাদা একটি শক্তিশালী জোট গঠন করে, তবে তা ইসলামপন্থী ও ডানপন্থী ভোটারদের বড় একটি অংশকে জামায়াতের ক্যাম্প থেকে সরিয়ে নেবে। ভোটের এই বিভাজন আলটিমেটলি জামায়াতের শক্তিকে সংকুচিত করবে, যা আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে ভারতের কৌশলগত অবস্থানের অনুকূলে যায়।
সপ্তমত : অস্তিত্ব ও স্বকীয়তা রক্ষা
বিগত বিভিন্ন নির্বাচনে বা আন্দোলনে জামায়াতের সাথে আসন সমঝোতা বা জোটে যাওয়ার ফলে কওমী দলগুলোর নিজস্ব ভোটব্যাংক ও পরিচয় হুমকিতে পড়েছিল। নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতেই তারা নিজস্ব জোট গড়তে চাইছে।
নবমত : হেফাজতে ইসলামের প্রভাব
অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও হেফাজতে ইসলামের বড় একটি অংশ কওমী আলেমদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। রাজনৈতিক দলগুলোর এই মোর্চা মূলত হেফাজতের আড়ালে কওমী শক্তিকে একটি একক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা করছে। যাতে তারা জাতীয় রাজনীতিতে বড় দরকষাকষির জায়গায় থাকতে পারে এবং জামায়াতকে ঠেকাকে আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।
দশমত : বিভাজন ও নিয়ন্ত্রণ কৌশল
ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে যদি বিভাজন তৈরি করা যায় এবং জামায়াতের বিরুদ্ধে একটি বড় কওমী মোর্চা খাড়া করা যায়, তবে তা সামগ্রিকভাবে ইসলামপন্থী ভোটব্যাংককে খণ্ডিত করবে। এই ধরনের সমীকরণ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হওয়া অসম্ভব নয় ।
কওমী দলগুলোর জামায়াতবিরোধী জোট গঠনের পেছনে একদিকে যেমন রয়েছে তাদের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ আদর্শিক ও নেতৃত্বগত দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে রয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা।
তবে এই প্রক্রিয়ার পেছনে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর মতো বিদেশি সংস্থার প্রভাব থাকার তত্ত্বটি ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এটি মূলত বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি চালেরই একটি অংশ।
…………………………………….
এফ শাহজাহান
ক্রাইসিস অ্যানালাইসিস
২১ জুলাই ২০২৬
……………………………………..

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com