এফ শাহজাহান :
মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যোগদানের সম্ভাবনা খুবই কম। তারপরও এই জোটে বাংলাদেশের যোগদানের আশঙ্কায় ভারতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। মক্কা প্রতিরক্ষা জোটকে ভারত এযাবতকালের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চ্যলেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। তার ওপর আবার এই জোটে বাংলাদেশের ঘণিষ্টতার আশঙ্কা ভারতকে চরম দু:শ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারত এখন বাংলাদেশকে নিয়েও দু:স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে।
মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যোগদান ভারতের জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় একটি বড় ধরনের ভূকৌশলগত এবং সামরিক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। ভারতের তিন দিক থেকে বাংলাদেশ পরিবেষ্টিত থাকায় এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা বাংলাদেশের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করায়, ভারত এই পদক্ষেপকে তাদের “নিরাপত্তা বলয়ে সরাসরি আঘাত” হিসেবে গ্রহণ করবে।
ভারতের ভূকৌশলবিদরা বাংলাদেশকে সর্বদা তাদের নিরাপত্তার ‘বাফার জোন’ হিসেবে দেখতে চান। ফলে বাংলাদেশ মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলে ভারত তা কেবল কূটনৈতিক মতপার্থক্য হিসেবে দেখবে না; বরং তা তাদের সার্বিক সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার জন্য একটি ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করার মতো নিরাপত্তা সংকট হিসেবে বিবেচনা করবে।
সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের সামরিক অভিযানের আশঙ্কাও রায়েছে । ভারত যে কোন মূল্যে বাংলাদেশকে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটেরা বাইরে রাখতে চায় ।
ইউক্রেনের নেটোতে যাগদানের আশঙ্কায় রাশিয়া যেমন যুদ্ধে জড়িয়েছে, ভারতও তেমনি মক্কা নিরাপত্তা জোটে যোগদানের আশঙ্কায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না।
ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মতো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র যদি বহুপাক্ষিক সামরিক জোট বা ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সাথে যুক্ত হয়, তবে ভারত ভূরাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে—তা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যালোচনার দাবি রাখে।
তবে রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযানের মডেলের সাথে ভারত-বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার তুলনা করার আগে ক্ষমতার ভারসাম্য, ভূকৌশলগত নির্ভরতা এবং আঞ্চলিক পরাশক্তির কৌশলগত অবস্থান নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
যদি বাংলাদেশ এই সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হয়, তবে ভারতের জন্য মূলত ৫টি প্রধান নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যেমন-
(১) ‘চিকেনস নেক’ থ্রেট
‘চিকেনস নেক’ হচ্ছে ভারতের ভৌগোলিক দুর্বলতা। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোকে তথা সেভেন সিস্টার্সকে যুক্ত করেছে মাত্র ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’। বাংলাদেশ যদি কোনো প্রতিপক্ষ বা সম্ভাব্য অসংবেদনশীল সামরিক জোটের সদস্য হয়, তবে ভারতের ভয় থাকবে যে কৌশলগত সংকটের সময় উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোকে মূল ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করা সহজ হয়ে পড়বে।
(২) পাক-চীন ‘টু-ফ্রন্ট থ্রেট
মক্কা জোটে পাকিস্তান, তুরস্কের মতো দেশগুলোর প্রভাব ও চীনের সম্ভাব্য ছায়া সমর্থন থাকলে ভারতের পশ্চিম সীমান্তের (পাকিস্তান) সাথে সাথে পূর্ব সীমান্তও (বাংলাদেশ) সক্রিয় সামরিক সামরিক ফ্রন্টে পরিণত হবে।
মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে সৌদি আরব ও তুরস্কের পাশাপাশি পাকিস্তান যুক্ত থাকায় এবং চীনের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশ এতে অংশ নিলে ভারতের চিন্তায় ‘দুই প্রান্ত থেকে ঘেরাও’ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
(৩) মেরিটাইম থ্রেট
ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে একক প্রভাব বজায় রাখা ভারতের অন্যতম প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য। বাংলাদেশে এই জোটের সামরিক ঘাঁটি বা যৌথ নৌ-মহড়া ভারতের নৌ-নিরাপত্তা ও বাণিজ্য পথের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দেবে।
(৪) ইকোনমিক থ্রেট
আগে ভারতকে মূলত চীন ও পাকিস্তান সীমান্তে নজর রাখতে হতো। বাংলাদেশে সামরিক জোটের উপস্থিতি ঘটলে ভারতকে তাদের বিপুল সামরিক সম্পদ, রাডার এবং অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট সিস্টেম পূর্ব সীমান্তে মোতায়েন করতে বাধ্য হতে হবে, যা তাদের সামরিক বাজেট ও সক্ষমতার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে।
(৫) ইনটেলিজেন্স থ্রেট
বাংলাদেশ মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলে ভারতের ইনটেলিজেন্স থ্রেটতৈরি করবে। কারণ, তখন উন্মুক্ত যুদ্ধক্ষেত্রের বদলে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রক্সি বা গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্য রক্ষায় মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক সুবিধা নিয়ে জোটভুক্ত অন্যান্য দেশের সামরিক বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা কার্যক্রম, পারমাণবিক স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ওপর সহজেই পর্যবেক্ষণ চালাতে পারবে।
(৭) সেভেন সিস্টার্স থ্রেট
অতীতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন বিদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী (যেমন উলফা বা নাগা বিদ্রোহীরা) বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবহার করত। বাংলাদেশ এই জোটে যুক্ত হয়ে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক থেকে সরে আসলে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পুনরায় বাংলাদেশে নিরাপদ আশ্রয় পেতে পারে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে।
এই ৭টি প্রধান থ্রেট মোকাবেলায় ভারত এখন থেকেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অস্থিরতা এখন চোখে পড়ার মতো। এজন্য ভারত এখনই সামরিক হামলা চালানোর মতো আগ্রাসী সিদ্ধান্ত না নিলেও সম্ভাব্য ৫টি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। যেমন-
প্রথমত : জিও পলিটিক্যাল বাফার জোন
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত বনাম বাংলাদেশ-ভারত বাস্তবতাভূকৌশলগত সীমানা
রাশিয়ার জন্য ইউক্রেন ছিল নেটো সামরিক জোটের সাথে যোগাযোগের শেষ সরাসরি বাফার জোন। অন্যদিকে, বাংলাদেশকে ভারত তার পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা বলয়ের অংশ মনে করে।
দ্বিতীয়ত : ভারতের সম্ভাব্য নিরাপত্তা কৌশল
সামরিক পদক্ষেপের রূপরেখাভারত যদি অনুভব করে যে এই জোটে যোগদানের ফলে তাদের ‘চিকেনস নেক’ (শিলিগুড়ি করিডোর) বা উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর অখণ্ডতা সরাসরি হুমকির মুখে পড়ছে, তবে তারা তাৎক্ষণিক সামরিক আক্রমণের পরিবর্তে বহুমুখী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে পারে।
তৃতীয়ত : হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার ও অর্থনৈতিক অবরোধ
রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণের আগে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও অবকাঠামো অচল করার কৌশল নিয়েছিল। ভারত বাংলাদেশের ওপর স্থলবন্দর ও ট্রানজিট বাণিজ্যে কড়াকড়ি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে বিধিনিষেধের মতো চরম কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে পারে।
চতুর্থত : সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি
সামরিক সংঘাত না বাড়িয়ে ভারত সীমান্তে স্থায়ীভাবে ভারী অস্ত্র ও অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করতে পারে, যা অঞ্চলে একটি স্থায়ী ‘কোল্ড ওয়ার’ বা থমথমে পরিস্থিতি তৈরি করবে।
পঞ্চমত : বঙ্গোপসাগরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা
মক্কা জোটের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে আন্তর্জাতিক বা অ-আঞ্চলিক নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়বে। এরফলে একদিকে ভারতের নৌ-নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। শুধু তাই নয়, ভারত বঙ্গোপসাগরে নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা চালাচ্ছে সেই নিয়ন্ত্র তাদের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। এই অশঙ্কায় ভারত এখন থেকেই বঙ্গোপসাগরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার তৎপরতা বাড়িয়ে দিবে।
মক্কা নিরাপত্তা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিক আর দিক,ভারতের দাদাগিরি থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশকে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য সেরা রক্ষা কৌশল হলো “ডিটারেন্স” বা প্রতিরোধ তৈরি করা।
অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে এমন বার্তা দেওয়া যে, বাংলাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের মূল্য বা খেসারত হবে প্রতিপক্ষের জন্য অত্যন্ত চড়া এবং অর্থনৈতিকভাবে চরম ক্ষতিকর।
……………………………………..
এফ শাহজাহান
ডিফেন্স অ্যানালাইসিস
২৭ আগস্ট ২০২৬
………………………………………
Leave a Reply