খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি

Reporter Name
    সময় : মঙ্গলবার, আগস্ট ২৫, ২০২৬, ৩:৩৩ অপরাহ্ণ
  • ৬৬ Time View

এফ শাহজাহান : 

গান-বাজনা নিয়ে পুরনো বিতর্ক অনেকেই নতুন করে উস্কে দিচ্ছেন । কেউ কেউ ব্যক্তিগত মতামত সংগঠনের ওপর চাপাচ্ছেন। কেউ কেউ মন খুলে গান-বাজনা করতে না পেরে হা-হুতাশ করছেন। কেউ আবার অসাধারন সব সঙ্গীত প্রতিভাকে দমিয়ে রাখার জন্য ইসলামী আন্দোলনকে দোষারোপ করে নানাবিধ বয়ান জাহির করছেন।

মাঝে মধ্যেই ফুলে-ফেঁপে ওঠা এই বিতর্ক নিয়ে আম-জনতার তেমন মাথা ব্যাথা না থাকলেও গান-বাজনার শরীয়তি ফায়সালা নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের সুস্পষ্ট ধারণা থাকা খুবই জরুরী।

ইসলামে ‘মাআযিফ ও গিনাহ’ তথা গান-বাজনার বিধান নিয়ে ইমাম, মুজাদ্দেদ, রিলিজিয়াস স্কলার, ফকীহ, মুফাসসির ও মুহাদ্দিসীনদের মধ্যে সুদীর্ঘকাল ধরে মতপার্থক্য চলে আসছে।

গান-বাজনা নিয়ে ইসলামিক স্কলারদের এই মত-পার্থক্যের কারণে বর্তমান মুসলিম বিশ্বে দুটি প্রধান ধারা বিদ্যমান । একদল সতর্কতামূলক অবস্থান হিসেবে সব বাদ্যযন্ত্র এড়িয়ে চলেন। অন্য দল নির্দিষ্ট শালীন সীমারেখার মধ্যে থেকে এর ইতিবাচক ব্যবহারকে বৈধ মনে করেন।

আধুনিক ইসলামিক স্কলারদের মধ্যে বাদ্যযন্ত্র হালাল নাকি হারাম. এ নিয়ে প্রধানত তিনটি ধারা দেখা যায়। আধুনিক যুগের আলেমরা কুরআন, সুন্নাহ এবং প্রাচীন ফকীহদের ইজতিহাদ ও ফিকহি নীতিমালার আলোকে নিজ নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। বিদ্যমান ৩টি ধারা হলো-
(ক) গান-বাজনা হারাম।
(খ) বাজনা ছাড়া শুধু গান হালাল।
(গ) বাজনাসহ গান শর্তসাপেক্ষে হালাল ।

প্রথমত : গান-বাজনা হারাম
চার মাযহাবের অধিকাংশ ফকীহ গান-বাজনা হারাম বা নিষিদ্ধ মনে করেন। তারা প্রচলিত সাধারণ বাদ্যযন্ত্র ও সব ধরনের অশালীন গানকে হারাম মনে করেন।

এাড়াও গান-বাজনা সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ মনে করা আধুনিক স্কলারগণ হলেন-শেখ আব্দুল আযীয বিন বাজ, শেখ আল-আলবানী, শেখ ইবনে উসাইমীন, এবং ভারত-পাকিস্তানের দেওবন্দী ও আহলে হাদীস আলেমরা যেমন: মুফতি তককী উসমানী, মাওলানা ইউসুফ লুধিয়ানভী।

এই ধারার আধুনিক স্কলারদের মতে, শুধু ‘দফ’ বা একমুখী ঢোল ছাড়া অন্য যেকোনো আধুনিক বাদ্যযন্ত্র যেমন: গিটার, পিয়ানো, বাঁশি, ড্রামস ইত্যাদির ব্যবহার করা ও শোনা সম্পূর্ণ হারাম।

তাদের মতে, বাদ্যযন্ত্র মানুষকে আত্মিক বিশুদ্ধতা ও কুরআন পাঠের মনোযোগ থেকে বিচ্যুত করে বাদ্যের নেশায় নিমজ্জিত করে। এর পেছনে তারা যে সব দলীল পেশ করেন তা হলো-

কুরআনের দলীল…………….
সূরা লুকমানের ৬নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানুহুওয়াতায়ালা বলেন-“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য অসার কথা (লাহওয়াল হাদীস) ক্রয় করে এবং আল্লাহ প্রদর্শিত পথকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ হিসেবে গ্রহণ করে।”

ব্যাখ্যা : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতো প্রখ্যাত সাহাবিগণ “লাহওয়াল হাদীস”-এর ব্যাখ্যায় গান ও বাদ্যযন্ত্রকে চিহ্নিত করেছেন।

সহীহ হাদীসের দলীল…………….
সহীহ বুখারীর ৫৫৯০ নং হাদীসে বলা হচ্ছে-“অবশ্যই আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু দলের সৃষ্টি হবে, যারা যিনা-ব্যভিচার, রেশম, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে (আল-মাআযিফ) হালাল মনে করবে।”

ব্যাখ্যা…………………….
বাদ্যযন্ত্রকে মদ্যপান ও ব্যভিচারের মতো কবীরা গুনাহের সাথে একসাথে উল্লেখ করাকে আলেমগণ এর হারাম হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে দেখেন।

অন্যান্য দলীল……………….
অন্য কিছু হাদীসে ঢোল, বাঁশি বা সেতারের মতো যন্ত্র ব্যবহার থেকে সতর্ক করা হয়েছে এবং একে শয়তানের আওয়াজ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

এই মতের পক্ষে বিশ্লেষণ ও যুক্তি………………..
তারা সহীহ বুখারীর সেই হাদীস “আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল বানিয়ে নেবে। এই হাদীসকে তারা ভিত্তি হিসেবে দেখেন। আল-আলবানী (র.) এই হাদীসের সনদকে সম্পূর্ণ সহীহ বলে বিশ্লেষণ করেছেন।

সাদৃশ্যের নিয়ম বা ক্বিয়াস……………..
আধুনিক বাদ্যযন্ত্র বা ইলেকট্রনিক গিটারে যে সুর তৈরি হয়, তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে নিষিদ্ধ থাকা বাদ্যযন্ত্রের চেয়ও বেশি মোহনীয়। ফলে আধুনিক সব বাদ্যযন্ত্র মূল নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত।

(খ) বাজনা ছাড়া শুধু গান হালাল
ইমাম ইবনে তাইমিয়া, আধুনিক অনেক ফকীহ এবং অনেক আলেম মনে করেন, গানের মূল ভিত্তি হলো এর বাক্য বা কথা। তারা এবিষয়ে কুরআন সুন্নাহর যে সব নীতি তুলে ধরেছেন, তা হলো-গান মূলত এক প্রকার কাব্য বা বক্তব্য। এর কথা ভালো হলে গান ভালো, আর কথা খারাপ বা অশ্লীল হলে গান খারাপ।

হাদীসের দলীল………………..
রসূলুল্লাহ (সা.) ভালো ও তাওহীদভিত্তিক কবিতা বা কাসিদা শুনেছেন এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে কবিতা আবৃত্তিকে উৎসাহিত করেছেন।

সিদ্ধান্ত …………………..
কোনো প্রকার বাদ্যযন্ত্র ছাড়া যদি গানের কথা শালীন হয়, সেখানে আকিদাবিরোধী বা অশ্লীল কিছু না থাকে এবং তা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে, তবে তা সম্পূর্ণ জায়েজ।

(গ) বাজনাসহ গান শর্তসাপেক্ষে হালাল
এই মতের প্রধান স্কলারগণ হলেন আল্লামা ইউসুফ আল-কারযাভী, ড. তহা জাবির আল-আলওয়ানী, শেখ ফয়সাল মৌলভী, ড. জায়েদ শাকির, এবং মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল আধুনিক গবেষক।

ইমাম ইবনে হাযম, ইমাম আল-গাজালী এবং আধুনিক যুগের আল্লামা ইউসুফ আল-কারযাভীসহ একদল আলেম মনে করেন, বাদ্যযন্ত্র নিজে থেকে হারাম নয়; বরং এটি ব্যবহারের উদ্দেশ্য ও পরিবেশের ওপর এর বিধান নির্ভর করে।

এই ধারার আধুনিক স্কলারদের মতে, বাদ্যযন্ত্র নিজে হারাম বা সত্তাগতভাবে অপবিত্র নয়। এটি কেবল একটি মাধ্যম বা উপকরণ। গানের বিষয়বস্তু, পরিবেশ ও উদ্দেশ্যের ওপর এর হালাল বা হারাম হওয়া নির্ভর করে।

সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে আংশিক ছাড় প্রদানকারী স্কলারগণ
ড. জাসির আওদা, মোস্তফা আল-জারকা এবং আধুনিক মাকাসিদ কেন্দ্রিক অনেক গবেষক সামরিক গান, জাতীয় সংগীত, শিশুতোষ শিক্ষা ও বিনোদন এবং দাওয়াহর মাধ্যম হিসেবে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।

এই মতের পক্ষে বিশ্লেষণ ও যুক্তি……………..
ইসলামের মৌলিক নীতি হলো,যেকোনো বস্তুর মূল বিধান ‘ইবাহাত’ বা বৈধতা, যতক্ষণ না তা হারাম হওয়ার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়,ততক্ষন তা হালাল।

এই দলীলের দুর্বলতা হলো- ইবনে হাযম (র.)-এর অনুসরণে তারা মনে করেন, বাদ্যযন্ত্র ঢালাওভাবে হারাম প্রমাণের জন্য কোনো ‘অকাট্য ও সহীহ’ হাদীস নেই। তিনি মনে করেন, বুখারীর ‘মাআযিফ’-সংক্রান্ত হাদীসটি ‘মুআল্লাক’ বা সনদ বিচ্ছিন্ন বা শর্তযুক্ত।

শর্তগুলো হলো-গানের কথা অশ্লীল, শিরকি বা কামোদ্দীপক হতে পারবে না। গায়ক/গায়িকা বা পারফর্ম্যান্স বেহায়াপনা ছড়াবে না। এটি সালাত বা ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করবে না। গান বা বাজনা যেন জীবনের মূল লক্ষ্য বা নেশায় পরিণত না হয়।

দফ বা একমুখী ঢোল-এর ব্যতিক্রম। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের সহীহ হাদীসে ঈদের দিন, বিবাহ অনুষ্ঠানে এবং সফর শেষে আনন্দের মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উপস্থিতিতে সাহাবি ও বালিকাদের দফ বাজিয়ে গান গাওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

ইমাম ইবনে হাযম (র.) মনে করেন, বাদ্যযন্ত্র পুরোপুরি হারাম প্রমাণ করার মতো কোনো স্পষ্ট ও সহীহ (ত্রুটিমুক্ত) হাদীস নেই। বুখারীর বহুল আলোচিত হাদীসটিকে তিনি ‘মুআল্লাক’ তথা সনদ বিচ্ছিন্ন হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

প্রয়োজন ও বাস্তবতার নিরিখে কুচকাওয়াজ, মিলিটারির মার্চিং ব্যান্ড বা শিক্ষামূলক কাজে সাউন্ড ইফেক্ট ও বাদ্যের ব্যবহারিক প্রয়োজনকে তারা সাধারণ বিনোদনের থেকে আলাদা করে দেখেন।

গান-বাজনার হালাল-হারাম নিয়ে ইসলামের মৌলিক নীতি
ইসলামে মূল নীতি হলো যেকোনো বস্তুই মূলত হালাল, যতক্ষণ না তা হারাম হওয়ার স্পষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। কেবল বাদ্যযন্ত্রের নিজস্ব কোনো শব্দ হারাম নয়, বরং তা যদি মদ, ব্যভিচার বা অশ্লীলতার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবেই তা হারাম হয়।

ইসলামের ফকীহদের সর্বসম্মত ও গ্রহণযোগ্য মধ্যমপন্থী মতামত অনুযায়ী গান ও বাজনা সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে নিম্নোক্ত শর্তে ভাগ করা যায়।
১. সম্পূর্ণ হারাম
যেসব গানে অশ্লীলতা, শিরক, আকিদাগত বিভ্রান্তি, মদ-ব্যভিচারের উৎসাহ বা পরনারীর বেহায়াপনা থাকে এবং যা মানুষকে সালাত ও দ্বীন থেকে গাফেল করে।
২. জায়েজ বা অনুমোদিত
বিবাহ, ঈদ বা আনন্দের দিনে দফ বাজিয়ে গান গাওয়া। এছাড়া দেশাত্মবোধক, তাওহীদ ও সৃষ্টিজগতের সৌন্দর্য সম্পর্কিত শালীন গান বা বাদ্যযন্ত্র , যা কোনো পাপের দিকে আহ্বান করে না।

‘মাকাসিদুশ শরীয়াহ’ তথা শরীয়াহর উদ্দেশ্য এরকম যে, আধুনিক যুগে মিডিয়া ও সংস্কৃতির বিরাট প্রভাব রয়েছে। ইসলামিক মূল্যবোধ ছড়াতে এবং অনৈতিক মিডিয়ার বিকল্প হিসেবে বাদ্যযন্ত্রযুক্ত শালীন ইসলামি গান, হামদ-নাত বা জাগরণী গান দাওয়াহর কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। এবিষয়ে আপনার সুচিন্তিত মতামত কমেন্টে তুলে ধরতে পারেন।
তথ্যসূত্র………………………………….
১. আল কুরআন।
২. সহীহ বুখারী।
৩. সহীহ মুসলিম।
৪. ইহয়াউ উলূমিদ্দীন-কিতাবুস সামা ওয়াজ ওয়াজদ : ইমাম গাযালী।
৫. ইগাসাতুল লাহফান : ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যাহ (রহ.)।
৬. তাহরিমু আলাতিল লাহভ : শায়খ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী (রহ.)
৭. ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা : আল্লামা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী(র.)
৮. গান-বাজনার হাকিকত : মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.)
৯. ইসলাম ও শিল্পকলা- ড. আল্লামা উসুফ আল কারযাভী।
১০. ইসলামের দৃষ্টিতে গান-বাজনা- মুফতী মুহাম্মাদ আল-আমীন।
১১ . ইসলামের দৃষ্টিতে গান-বাজনা-মুহাম্মাদ খলিলুর রহমান মুমিন।
১২. হালাল ও হারাম ফিল ইসলাম- ড. ইউসুফ আল-কারজাভী।
১৩. গান-বাজনার শরয়ী বিধান- মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.)।
১৪. গান ও বাদ্যযন্ত্রের বিধান-মুফতী ইসমাইল কাসেমী।
১৫. ইসলামে বিনোদনের সীমানা ও গান-বাজনা -ইসলামী ফিকহ একাডেমি।
১৬. ইসলামে বিনোদনের রূপরেখা : মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ
১৭. ইসলাম ও আধুনিক সংস্কৃতি : মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহ.
১৮. Slippery Stone: An Inquiry into Islam’s Stance on Music
১৯. The Islamic Ruling on Music and Singing : Abu Bilaal ২০. Mustafa al-Kanadi: Khalid Baig-https:// islamidawahcenter.com/
https:// Kalamullah.Com
২১. Music in Islam: What’s Allowed ? : Masud Demra
……………………………………………….
এফ শাহজাহান
ফ্যাক্টফিল্টার
২৫ জুলাই ২০২৫
…………………………………………………

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com