মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ-ইরান-আফগানিস্তান : ভারতীয় আধিপত্যবাদ খতমের জটিল কারেন্টজাল

Reporter Name
    সময় : রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬, ৭:২৬ অপরাহ্ণ
  • ৪৩ Time View
এফ শাহজাহান :
মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার চরম সংকটজনক মুহূর্তে গত ৭ আগস্ট শুক্রবার সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় স্বাক্ষরিত হয়েছে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের হাত ধরে গঠিত এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিকে সামরিক বিশ্লেষকরা ইতিমধ্যেই ন্যাটো আদলের এক নতুন নিরাপত্তা কাঠামো বা ‘ইসলামিক ন্যাটো’র সূচনা বলে উল্লেখ করছেন। যা ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রচন্ড ঝঁকুনি দিতে সক্ষম হয়েছে।
ত্রিদেশীয় এই প্রতিরক্ষা চুক্তির পরই সারাবিশ্বের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা নড়ে চড়ে বসেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আর যৌথনিরাপত্তায় এই জোট এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। নয়া বিশ্বব্যবস্থার পলিসি মেকারদের টেবিলেও এখন এই চুক্তি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে।
চুক্তির ধারাগুলোতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, উক্ত তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর বাইরের যেকোনো সামরিক আগ্রাসন বা হামলাকে বাকি দুটি দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এই তিন অক্ষের মূল সামর্থ্য হলো, সৌদি আরবের আর্থিক পুঁজি ও অর্থায়ন, তুরস্কের অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও ড্রোন সক্ষমতা, এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি ও সুবিশাল পদাতিক বাহিনী।
চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে নানা কৌতূহল তৈরি হয়েছে । মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বিশেষ করে ইরান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশে এতে যোগদান করতে পারে কিনা কিংবা তাদের যোগদানের সম্ভাবনা কতটুকু সেটা ক্ষতিয়ে দেখা হয়েছে এই আলোচনায়।
কোন না কোনভাবে মক্কা চুক্তিতে নতুন করে এই তিন দেশের যোগদানের ফলে দক্ষিণ এশিয়ায়র ভূ-রাজনৈতিক চিত্র কীভাবে পাল্টে যেতে পারে; এবং এর প্রতিক্রিয়ার পরিনতি কী রূপ নিতে পারে, সেটাও এখন আলোচনার বিষয়।
উম্মাহর চেতনায় বিশ্বাসীরা আকাঙ্খা করেন যে, ত্রিদেশীয় এই প্রতিরক্ষা জোটে ইরান আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশও যোগদান করুক। এই আকাঙ্খা একটি নিখাদ কল্পনাবিলাস মনে হলেও এটি অবহেলার বিষয় নয়। বরং এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই অঞ্চলে ভারতের অযাচিত দাদাগিরি এবং আধিপত্যবাদ খতমের একটা যাদুকরী কারেন্টজাল হিসেবে মক্কা চুক্তিকে মূল্যায়ন করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
যদিও ইরান শিয়া শাসিত বিপ্লবভিত্তিক বিশ্ববীক্ষার প্রতিনিধি, যা সুন্নি প্রধান সৌদি আরবের ঐতিহ্যবাহী রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরীতধর্মী। তবুও এই জোটে ইরানের অন্তর্ভুক্তি নতুন এক সম্ভানার পূর্বাভাস দিচ্ছে।
চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর তেহরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্বিক মুসলিম ঐক্যের আহ্বান জানালেও ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি স্পষ্ট জানিয়েছে যে, সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক অক্ষ কখনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।
এরপরও সম্প্রতি এই সামরিক জোটে ইরানকে যোগদানের আমন্ত্রন জানানো হয়েছে। ফলে অনেক বৈপরিত্য থাকলেও মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে ইরানের যোগদানের সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করার সুযোগ নেই।
তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের মক্কা নিরাপত্তা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পথ প্রায় রুদ্ধ। পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাত ও দ্বিপক্ষীয় শত্রুতা চরমে উঠেছে। চুক্তির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা সদস্য পাকিস্তানের সাথে ডুরান্ড লাইন নিয়ে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের তীব্র সামরিক উত্তেজনা ও সীমান্ত সংঘাত চলমান রয়েছে। এসব কারণে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে আফগানিস্তানের যোগদানের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম থাকলেও মুসলিম উম্মাহর পূনর্গঠনের স্বার্থে এই জোটে আফগানিস্তানের অন্তর্ভুক্তি ভিন্নমাত্রা যোগ করবে।
মক্কা নিরাপত্তা চুক্তিতে বাংলাদেশ নিয়ে হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত চমৎকার এবং গতিশীল। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে এবং বাংলাদেশ সরকারের নীতি-নির্ধারকদের সূত্রে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে যে, বাংলাদেশ জাতীয় স্বার্থ এবং অর্থনৈতিক-নিরাপত্তা সমীকরণ বিবেচনায় এই অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কাঠামোর দিকে ইতিবাচকভাবে তাকাচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়নে মক্কা চুক্তির সাথে অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগতভাবে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তার মানে বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই এই প্রতিরক্ষা জোটের অংশীদার হতে প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের কোটি কর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সৌদি আরবের থেকে কম মূল্যে বা সুবিধাজনক শর্তে জ্বালানি সুবিধা পাওয়া এবং পাকিস্তানের মাধ্যমে তুরস্কের উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম যেমন: বেয়ারেকটার ড্রোন, নৌ-প্রযুক্তি সহজলভ্য করা বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নের জন্য লাভজনক।
তবে বাংলাদেশ সংবিধানে শান্তির পক্ষে নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির কথা বলা হয়েছে। ফলে ‘আক্রান্ত হলে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর’ কড়া সামরিক ন্যাটোর মতো শর্তে বাংলাদেশ হয়তো নীতিগতভাবে সই করবে না, কিন্তু পর্যবেক্ষক পদ বা ‘ডিফেন্স অ্যান্ড ইকোনমিক পার্টনার’ হিসেবে এতে যুক্ত হতে পারে বাংলাদেশ।
যদি ভৌগোলিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে ইরান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর সাথে সম্পর্কিত হয়, তবে দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ নতুন এক রূপ পরিগ্রহ করবে।
এই অঞ্চলে ভারতের একক আধিপত্যবাদ ক্ষতমে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি কারেন্টজালের মতো ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। এছাড়াও মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সংযুক্ত হলে দক্ষিন এশিয়ার রাজনীতিতে ৬টি গুনগত পরিবর্তন সাধিত হবে।
প্রথমত : ভারত ভৌগোলিক ও স্ট্র্যাটেজিকভাবে ঘেরাও হয়ে যাবে
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ভারত ঐতিহাসিকভাবে নিজেকে অঞ্চলের আধিপত্যশীল শক্তি হিসেবে মনে করে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান যদি একই ব্লকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হয়ে যায়, তবে ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা মারাত্মক ধাক্কা খাবে। পূর্ব ও পশ্চিম উভয় সীমান্তে ভারতের ওপর কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ তৈরি হবে। এতে নয়া দিল্লির ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ এবং ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতি সম্পূর্ণ দুর্বল হয়ে পড়বে।
দ্বিতীয়ত : নতুন আঞ্চলিক মেরুকরণ
এই জোটে ইরান-আফগানিস্তান-বাংলাদেশ যুক্ত হলে বহু বছর ধরে অকার্যকর থাকা ‘সার্ক’ আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি মৃত সংগঠনে পরিণত হবে। দক্ষিণ এশিয়া দুটি ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়বে। সৌদি পুঁজি ও তুর্কি প্রযুক্তির প্রতি আকৃষ্ট পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং নেপাল ও মালদ্বীপের মতো বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলো একটা ব্লকে এবং ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং ভুটানের মতো দেশগুলো এর বিপরীত ব্লকে অবস্থান নিবে। এত করে ভারতীয় আধিপত্যবাদ মরাত্মক চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।
তৃতীয়ত : বৃহৎ শক্তিগুলোর নতুন প্রক্সি গ্রাউন্ড
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণের কেন্দ্রবিন্দু হবে চীন ও রাশিয়ার কৌশলগত জয়। পাকিস্তান ও তুরস্কের মাধ্যমে চীন পরোক্ষভাবে এই মক্কা জোটকে স্বাগত জানাবে। বাংলাদেশ এতে যুক্ত হলে বঙ্গোপসাগরে চীন ও তুর্কি ডিফেন্স ব্লকের বড় উপস্থিতি তৈরি হবে। ফলে এই অঞ্চল বৃহৎ শক্তিগুলোর নতুন প্রক্সি গ্রাউন্ডে পরিনত হবে।
চতুর্থত : যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির ভারসাম্যমূলক নীতি
মক্কা চুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটন আপাতত ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও এই জোটের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত দুর্বল হয়ে পড়লে আমেরিকা নতুন করে শক্তি সামঞ্জস্য আনতে বাধ্য হবে।
পঞ্চমত : ভারতের একচেটিয়া দাদাগিরি খর্ব হবে
বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে প্রতিরক্ষা আধিপত্যবাংলাদেশে যদি এই চুক্তির ছায়া পড়ে, তবে বঙ্গোপসাগরের জলসীমায় তুর্কি-সৌদি-পাকিস্তানি যৌথ নৌ-মহড়া, সামুদ্রিক রুট পর্যবেক্ষণ এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পাবে। এতে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারে ভারতের একচেটিয়া প্রভাব খর্ব হবে।
ষষ্ঠত : আন্তসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের অবসান
আঞ্চলিক উগ্রবাদ ও নিরাপত্তা ইস্যুর স্থানান্তরযদি আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে মক্কা চুক্তি যৌথভাবে কাজ করে, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ কমাতে পারে।
‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ মধ্যপ্রাচ্য অতিক্রম করে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত টেবিলেও এখন বড় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ইরান ও আফগানিস্তানের ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এই জোটে ঢোকার সুযোগ নগণ্য হলেও, বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় কূটনৈতিক পরীক্ষার ক্ষেত্র।
“সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়” বাংলাদেশকে তার বহুল আলোচিত এই নীতিও অক্ষুন্ন রাখতে হবে। এর পাশাপশি মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বৈরিতা বাড়লেও চীন-সৌদি-তুরস্কের ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার অবারিত সুযোগ পাওয়া যাবে।
সব দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের উচিত হবে পূর্ণ সামরিক বা প্রতিরক্ষামূলক শর্তে সরাসরি যুক্ত না হয়ে ‘অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা প্রযুক্তিগত অংশীদার’ হিসেবে মক্কা চুক্তির অংশ হওয়া। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশ তার জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিরাপত্তা এবং ভূ-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে সমর্থ হবে।
…………………………………..
এফ শাহজাহান
ডিফেন্স অ্যানালাইসিস
২৩ আগস্ট ২০২৬
………………………………….

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com