এখনকার `হাইপার রিয়ালিটি’র পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় যোগ্যতা এবং সবচেয়ে দামি দক্ষতা কোনটি ? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুব সহজেই আপনি দিতে পারবেন বলে মনে হয় না।
‘রিয়ালিটি’ বা বাস্তবতার যুগ পার করে আমরা কিছুদিন আগেও ‘ভার্চুয়াল রিয়ালিটি’ বা ‘কল্প বাস্তবতার’ যুগে বাস করতাম। এখন আমরা সেই যুগ অতিক্রম করে বর্তমানে ‘হাইপার রিয়ালিটি’ বা ‘অতি বাস্তবতার’ যুগে ঢুকে পড়েছি। এই ‘হাইপার রিয়ালিটি’ যুগের সবচেয়ে দামি যোগ্যতা তালাশ করা তাই বেশ কঠিন। শিল্প-সাহিত্যের ‘ম্যাজিক রিয়ালিট’ তথা ‘যাদু বাস্তবতা’কেও ছাড়িয়ে গেছে এখনকার ‘হাইপার রিয়ালিটি’।
গোটা পৃথিবী একাই কিনতে পারার মতো বিশ্বের শীর্ষ ধনী ‘ইলন মাস্ক’ কয়েক বছর আগে হঠাৎ করে তার সন্তানদের স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। আর কখানো স্কুলেই পাঠাবেন না বলে ঘোষণা দিলেন।
কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, আমেরিকায় এখনকার স্কুলে যা শেখানো হচ্ছে তা দিয়ে গত ১শ বছর আগের পৃথিবী জানা সম্ভব। এই শিক্ষা দিয়ে এখনকার পৃথিবী চালােনো সম্ভব নয়। এখন এমন কিছু শেখা দরকার, যা দিয়ে আগামী ১শ বছর পরের পৃথিবী চালানো যায়।
ইলন মাস্ক একাই নন। বিশ্বের সেরা সব টেক জায়ান্টরাও তাদের সন্তানদের প্রচলিত স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। ইলন মাস্ক ‘অ্যাড অ্যাস্ট্রা, নামের নতুন একটা স্কুল খুললেন। ইলন মাস্কের সেই স্কুল পরে ‘ অ্যাস্ট্রানোভা’ নামে যাত্রা শুরু করলো। যারা তাদের বাচ্চাদের প্রচলিত স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন, তারা তাদের সন্তানদের ইলন মাস্কের সেই অ্যানস্ট্রানোভা স্কুলে ভর্তি করালেন।
ইলন মাস্কের আজব কিসিমের সেই স্কুলে শ্রেণি ভেদাভেদ নেই। প্লে-নার্সারি কিংবা ওয়ান-টু ক্লাসের কোন সিস্টেম নেই। ৪ বছর থেকে ৫০ বছরের শিক্ষার্থীরা একই ক্লাসে ভর্তি হতে পারেন। সেখানকার পড়াশোনার ভিত্তিই হচ্ছে স্টেম। অর্থাৎ সায়েন্স,টেকনোলজি,ইঞ্জিনিয়ারিং আর ম্যাথমেটিক্স।
সেই স্কুলে নাই কোন ক্লাস। নাই কোন পরীক্ষা। কিংবা গরু-ভেড়ার রচনা মুখস্ত করার নেই কোন ঝামেলা। ঐতিহ্যবাহী মুখস্থ-নির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোডিং, এথিক্স এবং সমস্যা সমাধানের হাতে-কলমে প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিক্ষাদানকে প্রধান্য দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এক গাদা যন্ত্রপাতি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজ করেন। বিভিন্ন প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করেন। ওপরের ক্লাসে উঠতে গেলে প্রজেক্ট ওয়ার্ক করতে হয়। যার প্রজেক্ট সাকসেস হয়,সেই ওপরের ক্লাসে উঠতে পারে এবং আরো উচ্চতর প্রযুক্তির অনুশীলণ করে। আরো নতুন নতুন প্রজেক্ট রান করায়।
আমরা যখন ‘দ্বিগু’-আর ‘বহুব্রীহি’ সমাসের মারফিরিঙ্গি মুখস্ত করা নিয়ে মাসের পর মাস বইয়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকি, ইলন মাস্কের স্কুলের শিক্ষার্থীরা তখন ড্রোন বানায়। আমাদের স্কুলের বাচ্চারা যখন ‘সম্প্রদান কারক’ আর ‘অপাদান কারকের’ জট খুলতে বছরের পর বছর ধরে ঘাম ঝরায়,অ্যাডঅ্যস্ট্রা স্কুলের বাচ্চারা তখন ব্যালেস্টিক মিসাইল আর এয়ার-টু এয়ার মিসাইল টেকনোলজি আয়ত্ব করে।
সেই সুদূরের আমেরিকা আর ইলন মাস্কের কথা না হয় বাদই দেন। আমাদের সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশি ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকেও যদি একবার তাকান, তাহলে আপনি চমকে উঠবেন।
জাদবপুর বিশ্বদ্যিালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের দিকেও যদি তাকান, তাহলে বুঝতে পারবেন, পৃথিবী কোথায় যাচ্ছে আর আমরা কোথায় যাওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছি।
সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক প্রবেশিকা পরীক্ষার একটি প্রশ্ন নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। সে পরীক্ষায় যে সব প্রশ্ন এসেছে তা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে যে প্রশ্নগুলো এসেছে তা হলো-
ক. সাহিত্যে-পড়া বা সিনেমায়-দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী নারী-চরিত্র কে ?
খ. তোমার ছোটবেলাকার ইচ্ছেগুলো, খামখেয়ালগুলো
গ. ‘পথের পাঁচালী’র দুর্গার সঙ্গে তোমার এক কাল্পনিক ট্রেন-সফর
ঘ. উত্তমকুমার ‘বনাম’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
ঙ. প্রিয় সাহিত্যিকের উদ্দেশ্যে লেখা তোমার খোলা-চিঠি
চ. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সুখের কথা, ভয়ের কথা
ছ. যে-বইটি তোমার প্রিয়জনকে উপহার দিতে চাও
জ. সাহিত্যিকের আড্ডা: বৈকুণ্ঠ মল্লিক, লালমোহন গাঙ্গুলী, সত্যজিৎ রায়
ঝ. যে-জঙ্গল কেটে ফেলা হচ্ছে তার পাখিদের কথোপকথন
ঞ. ঈশ্বরকে যদি গুটিকয় প্রশ্ন করার সুযোগ পেতে…
এবার আমাদের ঢাকা,রাজশাহীসহ বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্নাতক ১ম বর্ষে ভর্তি পরীক্ষার দিকে তাকান। বছরের পর বছর সকাল সন্ধ্যা আট-দশটা টিচারের কাছে প্রাইভেট পড়া আর নামী-দামী কোচিং সেন্টারে জীবন বরবাদ করা জিপিএ গোল্ডেন পাওয়া শিক্ষার্থীরাও যখন বাংলাদেশের এসব বিশ্বিবিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাস নম্বর তুলতেও ব্যর্থ হয়, তখন হয়তো আপনার মনে হয়, ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রটা কেমন ছিলো ?
হ্যাঁ, আপনি যদি সেই ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রগুলোর দিকে তাকান, তাহলে নির্ঘাত মনে হবে আইনস্টাইনের পক্ষেও এতো কঠিন ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
অথচ এতো জটিল ভর্তিপরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়ে যারা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে অনার্স-মাস্টার্স করে বের হচ্ছেন, তার কী যোগ্যতা আর দক্ষতা নিয়ে বের হচ্ছেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে তারা কী করছেন ? অর্থাৎ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরা আউটপুট কেমন হচ্ছে ? বড় বড় পাবলিক বিশ্বদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হওয়া এইসব লাখ লাখ বেকারের ভবিষ্যৎ গন্তব্যই বা কোথায় ?
এখন হয়তো বুঝতে পারছেন ইলন মাস্ক কেনো তার সন্তানদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এতোক্ষনে হয়তো বুঝেছেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক প্রবেশিকা পরীক্ষার সেই অদ্ভুৎ প্রশ্নপত্রের আসল উদ্দেশ্য কী ?
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পাটাতনে দাঁড়িয়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই হাইপার রিয়ালিটির পিচ্ছিল পৃথিবীতে যখন আপনি সবচেয়ে দামী যোগ্যতা তালাশ করতে যাবেন, তখন দেখবেন ‘প্রশ্ন’ করতে পারার যোগ্যতাই হচ্ছে এখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় এবং দামি দক্ষতা। হ্যাঁ, পৃথিবীর সব দামি যোগ্যতা আর দক্ষতাকে পেছনে ফেলে একোরে সামনে উঠে এসেছে ‘প্রশ্ন’ করার দক্ষতা।
অথচ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের ‘প্রশ্ন’ করতে শেখায় না। উল্টা শিক্ষকরা প্রশ্ন করেন আর শিক্ষার্থীরা সেই প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে শিক্ষকের সামনে উগরে দেয়।
প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকদের প্রশ্ন মুখস্ত করতে হয়,আর শিক্ষার্থীদের ‘উত্তর’ মুখস্ত করতে হয়। শিক্ষক শিক্ষার্থীর এই মুখস্থ প্রতিযোগিতার দৌড়ে আসল যে যোগ্যতা, সেই ‘প্রশ্ন’ করার দক্ষতাই তৈরি হওয়ার সুযোগ পায় না।
…………………………………………..
এফ শাহজাহান
ফ্যাক্ট ফিল্টার
৭ জুলাই ২০২৬
…………………………………………..
Leave a Reply