রেলওয়ে বস্তির অন্ধকার কুঠুরিতে বেড়ে ওঠা শিশুদের আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়ছে পথের দিশা ভাসমান স্কুল

Reporter Name
    সময় : বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ৬:৪০ অপরাহ্ণ
  • ৪৫ Time View

এফ শাহজাহান
বগুড়ার রেলওয়ে বস্তির পলিথিনে মোড়া অন্ধকার কুঠরিতে বেড়ে ওঠা শিশুদের আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়তে এক অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে পথের দিশা ভাসমান স্কুল। গত ১০ বছরে বস্তির শত শত শিশুকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে একদল স্বেচ্ছাসেবী। আর তাদের এই কাজে পাশে দাঁড়িয়েছেন সমাজের হৃদয়বান কিছু মানুষ। এরফলে বস্তির শিশুদের হাতে বই-খাতা তুলে দিয়ে এক অসাধ্যকে সাধন করে চলেছের পথের দিশা ভাসমান স্কুলের সদস্যরা।

বগুড়া রেলস্টেশনের পশ্চিম পাশে রেললাইনের গা ঘেঁষে পলিথিনে মোড়ানো অন্ধকার ঝুপড়িতে জন্মানো মেয়েটির নাম আলো। অন্ধকারে বেড়ে ওঠা সেই আলোর জীবন আর দশটা ছিন্নমুল শিশুর মতই ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা যায়নি। বস্তির অন্ধকারে জন্মানো সেই আলোই এখন সমাজে ‘আলো’ ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে। আলো এখন লেখা-পড়া শিখে অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

বস্তির ছিন্নমুল দম্পতির মেয়ে ‘আলো’ এখন স্থানীয় একটি হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। এর আগে ২০২১ সালের শিশুকল্যাণ ট্রাস্ট বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে আলো। তখন সে ৩য় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পঞ্চম শ্রেণি পাশের পর আলো স্বপ্ন দেখছে শহরের ভালো কোন স্কুলে ভর্তি হওয়ার। এরপর উচ্চ শিক্ষা শেষ করে শিক্ষক হয়ে সমাজের পিছিয়ে পড়া শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে আলো।

বগুড়ার হাড্ডিপট্রি রেল স্টেশন বস্তির ছিন্নমুল শিশুরা ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসছে। তারা বই খাতা নিয়ে পড়তে যাচ্ছে স্কুলে। ছোটরা বর্নপরিচয় নিয়ে পড়তে আসছে আর বড়রা গ্রুপ স্টাডি করছে। তাদের চোখেমুখে আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন।

কেউ স্বপ্ন দেখছে সমাজে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। কেউ স্বপ্ন বুনছে অনেক বড় অফিসে অনেক টাকা বেতনের চাকরি করে মা-বাবার মুখে হাসি ফুটানোর, আবার কেউ স্বপ্ন বুনছে উদ্যোক্তা হয়ে অন্যদের চাকরি দেওয়ার।সমাজের অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত, ছিন্নমুল এসব শিশুদের সেই স্বপ্ন দেখার কারিগর হিসেবে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন পথের দিশা ভাসমান স্কুলের উদ্যোক্তার।

‘আলো’ শুধু একাই নয়। ওর সঙ্গে ওদের বস্তির আরো ৪০ জন ছেলে মেয়ে লেখাপড়া শিখছে। প্রথমে ওদের শিক্ষার হাতেখড়ি দিচ্ছে পথের দিশা ভাসমান স্কুলে। প্রি-স্কুলিং এবং ১ম,২য় ও ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষার পর পথের দিসা ভাসমান স্কুল কর্তৃপক্ষ ওদের ভর্তি করে দেয় নিকটস্থ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে পরবর্তী শিক্ষাজীবন নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়ার জন্য সার্বিক সহযোগিতা ও দিক নির্দেশনাও দেয় পথের দিশা ভাসমান স্কুল কর্তৃপক্ষ।

জন্মের পর থেকেই অনবরত ট্রেনের হুইসেল আর ঝিকঝিক শব্দে বেড়ে ওঠা রেলওয়ে বস্তির শিশুরা শৈশবে এসেই সর্বনাশা মাদকের কবলে পড়ে। নীল-কালো পলিথিনে মোড়ানো বস্তির অন্ধকার ঝুপড়িতে জন্ম নেওয়া এসব শিশুর শৈশব,কৈশর যৌবন হারিয়ে যায় সেই অন্ধকারের অতল গহ্বরে।
শিক্ষার আলো তো দূরের কথা, কোনমতে বেঁচে থাকার পথের দিশাও নেই তাদের কাছে ছিলো না। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের অভিশাপে জর্জরিত আর অন্ধকারের নাগরদোলার ঘুরপাকে বন্দি এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়ার উদ্যোগে সফল হয়েছে বগুড়ার পথের দিশা ভাসমান স্কুল নামের একটি সামাজিক সংগঠন।

বস্তির ছিন্নমুল এবং ভবঘুরে শিশুদের ভবিষ্যৎ জীবনকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার লক্ষ্যে ২০১৪ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককে ঘিরে বগুড়ায় একটি সংগঠনের জন্ম হয়। বিশিষ্ট সাংবাদিক,ছড়াকার ও সংগঠক মোস্তফা মোঘল বন্ধুদের সাথে নিয়ে“ ফেসবুক ফ্রেন্ডস্ সোসাইটি বগুড়া” নামের এই সংগঠন গড়ে তোলেন। তরুণ চিকিৎসক ডা: আব্দুস সামাদ এবং ইমরান রাশেদের নেতৃত্বে সংগঠনটি অল্পদিনের ব্যবধানে সামাজিক কর্মকান্ডে ব্যাপক সুনাম অর্জন করে। তখন থেকেই তরা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের টেকসই শিক্ষা এবং তাদেরকে সমাজের মূল ধারায় ফিরে আনার বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে থাকেন।

২০১৬ সালে ফেসবুক ফ্রেন্ডস্ সোসাইটি বগুড়া’র তৎকালীন সমাজকল্যাণ সম্পাদক চিকৎিসক ইমরান রাশেদের নেতৃত্বে “পথের দিশা ভাসমান স্কুল”নামে বস্তির সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য শহরের চেলাপাড়ায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ফেসবুক ফ্রেন্ডস্ সোসাইটি বগুড়া’র সার্বিক তত্বাবধানে পরিচালিত চেলোপাড়ার স্কুলটি পরবর্তীতে বগুড়া রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিম পাশে অবস্থিত বস্তিতে স্থানান্তর করা হয়।

প্রথমে ৮-১০ জন ছিন্নমুল শিশুকে নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা পথের দিসা ভাসমান স্কুলের বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০০ জন ছাড়িয়ে গেছে।এখানে মূলত প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার হাতে-খড়ি দেওয়া হয়। এরপর তাদেরকে নিকটস্থ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। সেখানে তারা স্কুলের পড়ার পাশাপাষি পথের দিশা ভাসমান স্কুলে এসে কোচিং করে। এভাবে শতাধিক শিশু এখন ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ছে। ভবিষ্যতে এরা মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে যাতে উচ্চ শিক্ষায় যেতে পারে সেজন্য কাজ করছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

সরকারি বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাশ্রমে বস্তির শিশুদের শিক্ষাদান কার্যক্রম চলে। এছাড়াও নির্দিষ্ট ২জন শিক্ষক শিশুদের শিক্ষাদান করেন। এদের মধ্যে ১৫ জন ছেলে এবং ৩৮ জন মেয়ে।বর্তমানে পথের দিশা ভাসমান স্কুলের নার্সারি শ্রেণিতে পড়ছে ২০জন শিক্ষার্থী প্রথম দ্বিতীয়য় ও তৃতীয় শ্রেনিতে পড়ছে আরো ২০ জন শিক্ষার্থী ।

ভাসমান স্কুলের আশা মণি, মিথিলা আক্তার, ঈশা মণি,রোজা মণি, শিহাব উদ্দিন, রুমানা, আবির হোসেন, ছড়া আক্তার, জুঁই আক্তার, শিশির আহম্মেদ, সুমাইয়া আক্তার তামসী, কাজলী আক্তার, সুজন মিয়া, ফাতিমা হাওলাদার, রিদয়ের সঙ্গে এই প্রতিনিধির কথা হয়। শিক্ষার্থীরা বলে তারা সবাই খুব আনন্দের সঙ্গে এখানে লেখাপড়া শিখতে পারে। তাই তাদের পড়তে ভালো লাগে। তারা বড় হয়ে কে কী হতে চায় সেই স্বপ্নের কথাও জানালো।
পথের দিশার মেধাবী শিক্ষার্থী আলো জানায়,লেখাপড়ার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। আমার সঙ্গে আরে যারা পথের দিশায় পড়ছে, তাদের কারোই কোনদিন স্কুলে যাওয়ার কোন সুযোগ হতো না। পথের দিশা আমাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছে। আমিও বড় হয়ে শিক্ষক হতে চাই। এরকম শিশুদেরকে লেখাপড়া শেখাতে চাই। যাতে তারা সমাজে অনেক বড় কিছু হতে পারে। আমার সহপাঠিরা কেউ ডাক্তার ইঞ্জনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

পথের দিশা ভাসমান স্কুলের আলোকিত শিক্ষার্থী আলোর মা বলেন,আমার মেয়ের বৃত্তি পাওয়া তো দূরের কথা লেখাপড়া শেখাবো তা কোনদিন স্বপ্নেও ভাবিনি। আমার মেয়ে এখন সমাজের আর দশজনের সঙ্গে সরকারী প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ছে। সমাজের আরো ১০ জন ছেলে মেয়ের সঙ্গে উঠাবসা করছে।এটা ভাবতে আমার স্বপ্নের মত লাগে।

আরেক আলোকিত শিক্ষার্থী আশামণির মা বলেন,আমাদের দিন আনা দিন খাওয়া সংসার। একদিন কাজ না করলে অনাহারে থাকতে হয়। আমরা ছেলে-মেয়েদের লেখা-পড়া শেখানোর কথা চিন্তাও করতে পারি না। পথের দিশার ভাইয়েরা আমাদের সন্তানদের যেভাবে লেখাপড়া শেখাচ্ছে তাতে করে আমরা আশায় বুক বেঁধেছি। আমরা আশা করছি এই আন্ধার জগত থেকে একদিন বের হতে পারবো।

পথেরে দিশা ভাসমান স্কুলের শিশুদের নিয়ে বার্ষিক ক্রীড়াপ্রতিযোগিতার আয়োজন, শিশু শিক্ষার্থীর মায়েদের অংশগ্রহণে শীতকালীন পিঠা উৎসব, পথের দিসা ভাসমান স্কুলের শিক্ষার্থীদের বার্ষিক বনভোজন এবং অভিভাবকদের নিয়েও বনভোজনের আয়োজন করেন উদ্যোক্তারা। এসব আয়োজনে শিশুদের এবং অভিভাবকদের ভালো খাবার পরেবেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন ইভেন্টে বিজয়ীদের সুন্দর সুন্দর পুরস্কারেরও ব্যবস্থা করা হয়।
পথের দিশা ভাসমান স্কুল পরিচালনা কমিটি সভাপতি, শ্রেষ্ট চেয়ারম্যানের পদকপ্রাপ্ত বগুড়া সদর উপজেলার ফাঁপোড় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মহররম আলী এই প্রতিবেদককে জানান, সোস্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় বন্ধুদের সংগঠিত করে এমন একটি জটিল ও কঠিন কাজ যে সহজে সম্পন্ন করা যায়, তার উদাহরন সৃষ্টি করেছে পথের দিশা ভাসমান স্কুল। আমাদের প্রথম উদ্যোগ ছিল ফেসবুক বন্ধুদের নিয়ে গঠিত ‘ফেসবুক ফেন্ডস সোসাইটি’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলা। এই সংগঠনের উদ্দেশ ছিল স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক কাজ করা।
তিনি আরো বলেন, ‘ফেসবুক ফেন্ডস সোসাইটির’ মাধ্যমে প্রথম দিকে আমরা রক্তদান,দুস্থ অসহায় মানুষদের চিকিৎসাসেবা ও ওষুধের ব্যবস্থা করা, গরীব অসহায় মানুষদের আত্মনির্ভরশীল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রিকশা ভ্যান এসব কিনে দেওয়া, গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ নানা কাজ করেছি। ফেসবুক ফেন্ডস সোসাইটির সদস্যরা নিজেরাই চাঁদা তুলে ফান্ড গঠন করে আমরা এসব কাজ করতাম।

মহররম আলী বলেন সামাজিক কাজ অব্যাহত রাখার একপর্যায়ে আমাদের সংগঠনের সদস্যরা বস্তির সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের টেকসই শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের কর্মসংস্থানের জন্য স্থায়ী কিছু করার প্রস্তাব করেন। সেই সুত্র ধরেই আমরা ‘পথের দিশা ভাসমান স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেছি। বগুড়া রেলওয়ে বস্তির ৪০ জন শিশুকে আমরা আমাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান কর্মসুচিতে অন্তর্ভুক্ত করেছি। আমরা এদের উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সহায়তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নিয়েছি। এদেরকে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং এদের কর্মস্থানের ব্যবস্থারও পরিকল্পনা রয়েছে।

পথের দিশা ভাসমান স্কুল পরিচালনা কমিটির সাধারন সম্পাদক,শিক্ষানবিশ আইনজীবী,বিশিষ্ট সমাজসেবক শামীম আহমেদ বলেন, ছিন্নমুল শিশুদের শিক্ষার্যক্রমকে আমরা একটা স্থায়ী প্রাতিষ্টানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছি। পর্যায়ক্রমে বগুড়ার সকল ছিন্নমুল,শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত শিশুদেরকে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।

পথের দিশার পরিচালক,বিশিষ্ঠ সাংবাদিক,ছড়াকার,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক,সমাজসেবক মোস্তফা মোঘল এই প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ছিন্নমুল শিশুদের শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা খুবই জটিল এবং কঠিন একটা কাজ। এই শিশুরা একদিকে যেমন মাদকের কবলে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে,অন্যদিকে তেমনি শিশুশ্রমে নিযুক্তির ঝুঁকিতেও থাকে। এদের অভিভাবক শিক্ষার পরিবর্তে এদেরকে উপার্জনের কাজে লাগাতেই বেশি আগ্রহী। তাই শিশুদের স্কুলে আনার জন্য এদের অভিভাবকদের ম্যানেজ করাটা মস্তবড় ঝামেলার কাজ। অভিভাবকদের সন্মতি ছাড়া কোন শিশুকে স্কুলে আনাও যায় না। এদের মধ্যে আবার নানা ভয়,আশঙ্কা, অবিশ্বাসও কাজ করে। ছিন্নমুল পরিবারের শিশুদের স্কুলমুখী করার ক্ষেত্রে আরো নানা বাধা রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে চরম ধৈর্য ও পরিশ্রমের মাধ্যমে আমরা অনেক বাধা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। সামনের দিনগুলোতে আমরা বগুড়ার সকল ছিন্নমুল শিশুকে শিক্ষাকর্মসুচির আওতায় আনার লক্ষ্যে কাজ করছি।

সামাজিক আনন্দ-উৎসবে মূল ধারায় মিশতে শিখছে বস্তির শিশুরা
বগুড়া রেলওয়ে বস্তির পলিথিন মোড়ানো ঝুপড়ি ঘর থেকে বের হয়ে আসা ৪০ জন শিশুর একটা দল আনন্দ উল্লাসে আত্মহারা। ঈদের চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের চোখে-মুখেও যেনো চাঁদের হাসি ফুটে উঠেছে। কারণ, সমাজের মুল ধারার শিশুরা যেমন নতুন পোশাকে ঈদ উদযাপন করে,তেমনি তারাও এখন নতুন পোশাকে ঈদ উদ্যাপন করবে। ঈদের নতুন পোশাক পেয়ে তাই তারাও উল্লাসে মেতেছে। অনাহারে অর্ধাহারে থাকা এই শিশুদের শুকনো মলিন মুখগুলো যেনো ঈদের চাঁদের মতই আনন্দে ঝলমল করছে।

ঈদ কিংবা যে কোন তিথি পার্বনে বগুড়া হাড্ডিপট্টি রেলওয়ে বস্তিতে গেলে দেখা যায় ছিন্নমুল শিশুদের আনন্দের এই ঢেউ এসে লেগেছে বস্তির অন্ধকার ঝুপড়ি ঘরগুলোতেও। ‘পথের দিশা ভাসমান স্কুলের’ পক্ষ থেকে ছিন্নমুল শিশু শিক্ষাথীদের অভিভাবকদের জন্য ঈদ সামগ্রী বিতরণের ফলে বস্তির ঝুপড়িগুলোতেও বিরাজ করে ঈদের আনন্দ।এরফলে বস্তির শিশু শিক্ষার্থীরা যেমন নিয়মিত স্কুলে যাওয়া এবং লেখাপড়ার প্রতি মনেযোগী হচ্ছে,তেমনি তাদের অভিভাবকদের মধ্যেও নিজেদের সন্তানদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। নানা উপলক্ষকে সামনে নিয়ে বিচিত্রসব কর্মসুচি পালনের মাধ্যমে ছিন্নমুল শিশুদের টেকসই শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে পথের দিশা ভাসমান স্কুলের কর্তৃপক্ষ। যেমন তারা শিশুদের শিক্ষার প্রতি যত্নবান হওয়ার জন্য মায়েদের উদ্বুদ্ধ করতে নিয়মিত ‘মা সমাবেশ’ করছেন । মূল ধারার স্কুলের মত পথের দিশা ভাসমান স্কুলেও বছর জুড়ে বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন করা হচ্ছে। শীতকালে শিক্ষার্থীদের মাঝে শীতের কাপড় বিতরন করা হচ্ছে। প্রতিবছর একবার শিক্ষা সফর এবং বস্তির মায়েদের নিয়ে প্রতিবছর নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব নারীদিবস পালন করা হয়। এসব কিছুই করা হচ্ছে ছিন্নমুল শিশুদেরকে সমাজের মূল ধারায় ফিরে আনার জন্য।

ছিন্নমুল শিশুরা শুধু অনানুষ্ঠানিক এবং পরবর্তীতে মূল ধারার শিক্ষাগ্রহনেরই সুযোগ পাচ্ছে না ; তারা পথের দিশা ভাসমান স্কুলে এসে নিজেদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশেরও সুযোগ পাচ্ছে। একারনে তারা নিয়মিত স্কুলে আসতে আগ্রহী হচ্ছে। এতে করে তারা যখন মুলধারার শিশুদের সঙ্গে মেশার সুযোগ পাচ্ছে তখন নিজেদের বিকশিত করার তাগিদ অনুভব করছে। এভাবেই বগুড়ার ছিন্নমুল শিশুদের সমজের মুলধারায় ফিরে যাওয়ার একটা মানসিক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবনতাও তৈরি হয়েছে।

পথের দিশা ভাসমান স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং পুরষ্কার বিতরণের মাধ্যমে শিশুদের মানসিক,শারীরিক এবং সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। শিশু শিক্ষার্থীদের আনন্দ বিনোদনের জন্য বিভিন্ন উৎসব উদযাপন,বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আয়োজন,বার্ষিক বনভোজন,ফল উৎসব,পিঠা উৎসব, মেহেদী উৎসব এবং শিক্ষাসফরের মত কর্মসুচী হাতে নেওয়ায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং শেখার প্রতি আকৃষ্ট করা সম্ভব হচ্ছে। শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের একসঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের ফলে তাদের ভেতরের পারিবারিক বন্ধনটাও আরো মজবুত হচ্ছে।

শুধু ঈদ কিংবা ধর্মীয় তিথি পার্বনেই নয়,বছর জুড়ে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালনেও মেতে ওঠেন এই বস্তির শিশুরা। বার্ষিক বনভোজন,শিক্ষাসফর থেকে শুরু করে বিজয় দিবস,আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কিংবা আন্তর্জাতিক নারী দিবসও নানা উৎসব আয়োজনে বেশ জাকজমকের সঙ্গে পালিত হয় পথের দিশা ভাসমান স্কুলে।

পথের দিশা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে অনুপ্রানিত হয়ে সমাজের প্রতিষ্ঠিত গুনীজন, সমাজসেবক,দানশীল ও গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ ছিন্নমুল শিশুদের শিক্ষা ও তাদেরকে সমাজের মূল ধারায় ফিরে আনার এসব কর্মসুচি বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও পথের দিশা ভাসমান স্কুলের এসব কর্মসুচি বাস্তবায়নে সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছেন। এরফলে ছিন্নমুল শিশুদের শিক্ষা-বিনোদন-ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীল বিকাশের ক্ষেত্র প্রসারিত হচ্ছে।

এভাবে একদিকে শিক্ষা সহায়তা আর অন্যদিকে ক্রীড়া বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে শিশুদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করার ফলে পথের দিশা ভাসমান স্কুলের প্রতি একটা ভালোবাসা,আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি হয়েছে ছিন্নমুল শিশুদের অভিভাবকদের মনে। অন্যদিকে শিশুরাও তাদের কাঙ্খিত শিক্ষা-বিনোদন ও আনন্দের আশ্রয়স্থল খুঁজে পেয়েছে এখানে।

পথের দিশা স্কুলে লেখা-পড়ায় হাতেখড়ি দেওয়া এবং বর্তমানে বগুড়া জুবিলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষাথী শিহাব উদ্দিন জানান, পথের দিশা স্কুলে আসতে আমাদের খুবই ভালো লাগে। এই স্কুলের জন্যই আজ আমি ক্লাস ফোরে পড়ছি। এখন আমরা স্বপ্ন দেখছি আরো অনেক লেখাপড়া শিখে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে মা-বাবার কষ্ট দূর করবো।

শিক্ষাথী মিথিলা আক্তারের মা নূরজাহান জানান,আমাদের সামনে কোন ভবিষ্যতের স্বপ্ন ছিলো না। পথের দিশা ভাসমান স্কুলের স্যারেরা শুধু আমাদের সন্তানদেরকেই আলোকিত করছে না;তারা আমাদেরকেও সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এজন্য আমরা তাদের প্রতি এবং তাদের কাজে কর্মে যারা সাহায্য সহযোগিতা করছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

‘পথের দিশা ভাসমান স্কুলের’ পরিচালক, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ছড়াকার মোস্তফা মোঘল এই প্রতিবেদককে জানান, ছিন্নমুল শিশুদের শুধু লেখা পড়া শেখালে সেটা তেমন কোন সুদূর প্রসারী ফল বয়ে আনবে বলে আমরা মনে করি না। আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষার পাশাপাশি এদেরকে সমাজের মূল ধারায় ফিরে আনতে না পারলে বাস্তবে তেমন কোন পরিবর্তন আসবে না। এমনকি সেই শিক্ষাটাও পরবর্তীতে তাদের তেমন কোন কাজে আসবে না। সেই বাস্তবতার উপলব্ধি থেকেই আমরা ছিন্নমুল শিশুদের সমাজের মুল ধারায় ফিরে আনার জন্য স্কুল চালানোর পাশাপাশি এসব উৎসব উদযাপন এবং বিভিন্ন দিবস পালনের ব্যবস্থা করছি।

পথের দিশা ভাসমান স্কুল পরিচালনা কমিটি সভাপতি,সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মহররম আলী বলেন,আমাদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ছিন্নমুল শিশুদেরকে সমাজের মূল ধায়ায় ফিরিয়ে আনা। সেই কাজে সফল হওয়ার জন্য যা যা করার আমরা তার সবই করার চেষ্টা করছি। আমাদের আরেক উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠিত মানুষদেরকে আমাদের এই কাজে সম্পৃক্ত করা। সেই কাজে আমরা বেশ সফল হয়েছি। ছিন্নমুল শিশুদের ভাগ্য পরিবর্তনে এবং তাদের আলোকিত ভবিষ্যৎ বিনির্মানে সমাজের দানশীর ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসছেন। তাদের আর্থিক সহায়তা এবং মানসিক সম্পৃক্ততা আমাদেরকে প্রবলভাবে উৎসাহিত করছে।

স্বেচ্ছাসেবকদের শ্রম আর শুভাকাঙ্খীদের সহায়তায় সম্ভব হচ্ছে স্বপ্নপূরণ
সরকারি কোন সাহায্য সহযোগিতা নেই।শুধু নিজেদের বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে স্বেচ্ছাশ্রম আর দানশীল ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তায় ছিন্নমুল শিশুদের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করছে ‘পথের দিশা ভাসমান স্কুল’। বগুড়ার প্রায় আড়াই হাজার ছিন্নমুল শিশুর ‘আলোকিত ভবিষ্যতের স্বপ্নযাত্রায়’ সামিল করা এবং তাদেরকে সমাজের মূল ধারায় ফিরে আনার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি।

শুধু শিশুরাই নয়, ছিন্নমুল শিশুদের অভিভাকরাও নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের পথ দেখতে পাচ্ছেন। বস্তির অন্ধকার গলি থেকে বের হয়ে তারাও আলোকিত ভবিষ্যতের আশায় উজ্জীবিত হচ্ছেন।
২০১৬ সাল থেকে দীর্ঘ ১০ বছর ‘পথের দিশা ভাসমান স্কুলের সকল কর্মকান্ড গভীর ভাবে অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ করেছেন এই প্রতিবেদক। সেই পর্যবেক্ষনেই উঠে এসেছে বগুড়ার ছিন্নমুল শিশুদের অন্ধকার জীবনের অভিশাপ থেকে বের করে আলোকিত ভবিষ্যতের স্বপ্নযাত্রায় সামিল করার এক নিরলস প্রয়াসের প্রামান্য চিত্র।

পথের দিশা ভাসমান স্কুলের পরিচালক সাংবাদিক মোস্তফা মোঘল জানান, আমাদের বিভিন্ন কর্মসুচি বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা করেন এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যাঁরা তাদের পরিচয় প্রকাশে আগ্রহী নন। অনেকেই আছেন যারা নিরবে নিভৃতে মানুষের সেবা করতে আগ্রহী। আমাদের কর্মকান্ড নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে তারা নিজেরাই আগ্রহী হোন ছিন্নমুল শিশুদের পাশে এসে দাঁড়াতে। আমরা এই কাজ করতে গিয়ে দেখেছি,সমাজে এমন অনেক লোক আছেন যারা নি:স্বার্থভাবে মানুষের সেবা করতে চান।

পথের দিসা ভাসমান স্কুলের বিভিন্ন কর্মসুচি বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা দেন বগুড়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল গাফফার।কেনো এবং কী উদ্দেশ্যে সহায়তা করেন জানতে চাইলে তিনি জানান,সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা স্বেচ্ছায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখি। ছিন্নমুল শিশুদের আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য ‘পথের দিসা ভাসমান স্কুল’ যেভাবে কাজ করে তাতে আমি আশাবাদী যে ভবিষ্যৎহীন এইসব শিশুদের একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মান করা সম্ভব হবে। তাদের কর্মসুচিগুলো এতোটাই বাস্তবসন্মত যে এগুলো শিশুদের মানসিক বিকাশে খুবই কার্যকর। আমার বিশ্বাস আজকের এইসব ছিন্নমুল শিশুই একদিন তাদের ভাগ্য বদলিয়ে তাদের পরিবারকেও আলোকিত করতে পারবে। সেই আশাবাদ থেকেই ‘পথের দিসা ভাসমান স্কুল কে আর্থিক সহায়তা দিই।

পথের দিসা ভাসমান স্কুলের কার্যক্রমে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন বগুড়ার কিছু ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, সমাজসেবক, তরুন উদ্যোক্তা এবং স্বেচ্ছাসেবকগণ। বগুড়ার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও ছিন্নমুল শিশুদেরকে সমাজের মুল ধারায় ফিরে এনে তাদের আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com