বিএনপি ক্ষমতায় বসেই জামায়াতকে নির্মুল করার ফিকির শুরু করে। এখন তারা জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার জিকির তুলেছে। বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে জামায়াতকে নির্মুল করতে বিএনপির এই ফিকির এবং জিকিরের পেছনে রয়েছে ভারতের প্রচন্ড চাপ। সেই সঙ্গে দ্রুত পলাতক আওয়ামী লীগকে দেশে ফেরানোর জন্যও বিএনপির ওপর ভারতের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।
এ কারণেই জুন মাসের শেষের দিকে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সরকার দলীয় অনেক সংসদ সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলেছেন।
বাংলাদেশের মাটি-পানিতে বেড়ে ওঠা ভারতপন্থী সকলেরই কমন শত্রু জামায়াতে ইসলামী। ‘হেফাজতে ইসলাম’ কিংবা ‘বরবাদে ইসলাম’ সবাই জামায়াতের নির্মুল চায়। কারণ, বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্য কায়েমের সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র বাধা এখন জামায়াত।
ভারতের চাপের কারণেই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল জামায়াতকে নির্মুল করার ঘোষণা দেন । ভারতের ইশারাতেই বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মুখ থেকে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা বের হয়।
এই একই কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পলাতক হাসিনাকে ফেরাতে এবং আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে ভারতপন্থীরা এখন বেপরোয়া হয়ে উঠছেন।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এবং ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। পতিত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের প্রতি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের নমনীয় অবস্থান বা তাদের রাজনীতিতে ফেরার পরোক্ষ সুযোগ তৈরি করার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
বিএনপি কেন আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন না করে উল্টা রাজনীতিতে তাদের টিকে থাকা বা ফেরার বিষয়টিকে কৌশলগতভাবে বিবেচনা করছে, তার পেছনে গভীর কিছু রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে।
প্রথমত : ভারতকে খুশি করা
ভারতকে খুশি না রাখলে বাংলাদেশের ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবেনা-এমনটাই বিশ্বাস করেন বিএনপির অনেক নতি নির্ধারক। আওযামী লীগকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা না করলে ভারত বিএনপির প্রতি নাখোশ হবে। ভারতকে খুশি রাখতেই আওয়ামী লীগকে ফেরানো জরুরী হয়ে পড়েছে বিএনপির জন্য।
দ্বিতীয়ত : আওযামী লীগ এবং হিন্দুদের ভোটের প্রতিদান
আওয়ামী লীগকে ফেরানোর আশ্বাস দিয়েই নির্বাচনে হিন্দু ভোটার এবং আওয়ামী লীগের ভোটারদের একচেটিয়া ভোট নিয়েছে বিএনপি। নির্বাচনের পর সেই ওয়াদা পূরনের জন্য এখন আওয়ামী লীগকে ফেরাতে অস্থির হয়ে উঠেছে বিএনপি।
তৃতীয়ত : জামায়াতে ইসলামীর উত্থান ঠেকানো
জামায়ত সবার জন্যই গলার কাঁটা। শুধু বিএনপি-আওয়ামী লীগ নয়। ভারতের আধিপত্য বিস্তারের জন্যও সবচেয়ে বড় বাধা জামায়াত। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী যতই শক্তিশালী হবে ভারতের জন্য বাংলাদেশকে গ্রাস করা ততই কঠিণ হবে। অপর দিকে জামায়াতের কারণে দেশটাকে লুটে-পুটে খাওয়া বিএনপি-আওয়ামী লীগ উভয়ের জন্যই কঠিণ হয়ে যাবে। একারণে জামায়াতকে নির্মুল করা ভারত,বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ সবার জন্যই স্বস্তিকর।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর দ্রুত রাজনৈতিক উত্থান। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর দেশের সংসদে ও রাজপথে জামায়াত একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
চতুর্থত : এনসিপিকে নিশ্চিহ্ন করা
এনসিপির উত্থান বিএনপির জন্য অস্বস্তিকর। এনসিপি দেশের তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের দিকে টানতে থাকলে বিএনপির জন্য ক্ষতিকর। এজন্য তারা জামায়াতের মতো এনসিপিকেও নির্মুল করতে চায়। আওয়ামী লীগকে এখনই ফিরিয়ে আনতে না পারলে এনসিপি ক্রমেই শক্তি অর্জন করে বিএনপির মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এজন্য তারা এখনই আওয়ামী লীগকে মাঠে নামিয়ে এনসিপিকে উচ্ছেদ করার একটা খেলা খেলে চাচ্ছে।
পঞ্চমত : ভাগ করে খাওয়া
বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয় দলের একটাই চাওয়া। তারা এই দুই দল মিলে দেশটাকে পালাক্রমে ভাগ করে খাবে। একবার আওয়ামী লীগ,একবার বিএনপি। মাঝখানে আর কেউ যাতে না আসতে পারে সেজন্য বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে একটা মনস্তাত্ত্বিক ঐক্য অতীেতেও ছিলো এখনো আছে।
ষ্ষ্ঠত : দ্বিমুখী মেরুকরণ বজায় রাখা
বিএনপি ঐতিহ্যগতভাবে একটি ডান ঘরানার দল হলেও তারা চায় দেশের মূল রাজনৈতিক মেরুকরণটি যেন বিএনপি বনাম আওয়ামী লীগ এই দ্বিমুখী অবস্থায় থাকে। আওয়ামী লীগ পুরোপুরি মাঠ থেকে হাওয়া হয়ে গেলে লিবারেল বা ধর্মনিরপেক্ষ ভোটব্যাংক এবং বিশাল এক কর্মী বাহিনী জামায়াত বা অন্য কোনো শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিএনপির একক আধিপত্যের জন্য হুমকি।
সপ্তমত : ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষা
আওয়ামী লীগের একটি বড় শক্তির জায়গা ছিল প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং পশ্চিমা কিছু প্রভাবশালী মহলের সাথে তাদের দীর্ঘদিনের বোঝাপড়া। বিএনপি ভালো করেই জানে যে ভারতের সীমান্তঘেঁষা একটি দেশে আওয়ামী লীগের মতো বিশাল একটি রাজনৈতিক শক্তিকে রাতারাতি পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে বিএনপি নিজেদের একটি “উদার, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল” দল হিসেবে প্রমাণ করতে চায়। আওয়ামী লীগের প্রতি অনানুষ্ঠানিক বা পরোক্ষ নমনীয়তা দেখালে তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করে। এজন্যই আওয়ামী লীগকে ফেরাতে চায় বিএনপি।
অষ্টমত : শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও আমলাতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষা
রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শুধু রাজনৈতিক দল নয়, পুলিশ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং আমলাতন্ত্রের গভীর সহযোগিতা প্রয়োজন। গত ১৫ বছরে দেশের প্রতিটি স্তরে আওয়ামী লীগের সমর্থক বা সুবিধাভোগী তৈরি হয়েছে। বিএনপি যদি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সবাইকে শত্রু ভাবাপন্ন করে তোলে, তবে প্রশাসনে ও মাঠে তীব্র অসন্তোষ বা চোরাগোপ্তা অস্থিরতা লেগে থাকবে, যা নতুন সরকারের পক্ষে অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন করে তুলবে। তাই রাজনৈতিক সহনশীলতার পরিবেশ তৈরি করে শাসনব্যবস্থাকে মসৃণ রাখাই বিএনপির বর্তমান লক্ষ্য।
বিএনপি আসলে আওয়ামী লীগকে ভালোবেসে বা তাদের আগের কর্মকাণ্ডকে ক্ষমা করে দিয়ে ফেরাতে চাচ্ছে না। এটা মূলত কৌশলগত ভারসাম্য” সৃষ্টির প্রয়াসের জন্য তাদের করতে হচ্ছে।
জামায়াতের একক উত্থান রোধ করা, নিজেদের বহুদলীয় ইমেজ ধরে রাখা,ভারতকে খুশি রাখা এবং আন্তর্জাতিক মহলকে সন্তুষ্ট করার জন্যই বিএনপিকে পলাতক আওয়ামী লীগের ফেরার পথ করে দিতে হচ্ছে।
………………………………………
এফ শাহজাহান
ক্রাইসিস অ্যানালাইসিস
৩০ জুন ২০২৬
……………………………………….
Leave a Reply