দেওবন্দ মাদরাসার পাশেই শতবর্ষী মসজিদ ভেঙ্গে ধুলায় মেশাচ্ছে বিজেপি : কোন আকাবীরের মুখে রা নেই

Reporter Name
    সময় : বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ১:৫৬ অপরাহ্ণ
  • ১২৪ Time View
এফ শাহজাহান : 
ঢাক-ঢোল পিটিয়ে উল্লাস নৃত্য করতে করতে বুলডোজার চালিয়ে দেড়শ বছরের প্রাচীন মসজিদ ভেঙ্গে ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আগে যেখানে হাজারো মুসল্লী নামাজের জামায়াতে শরীক হতেন, এখন সেখানে শুধুই ধু-ধু করছে। আগে যেখানে দিনে পাঁচবার মুয়াজ্জিনের আল্লাহুআকবার ধ্বনিতে পুরো এলাকা মুখরিত হতো,এখন সেখানে শুধুই ধ্বংসস্তুপ।
ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলা কালেক্টরেট চত্বরে অবস্থিত প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো একটি মসজিদ ২০২৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ভোরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে ফেলা হয়।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নামাজের মাদুর, একটা টুপি, পবিত্র কুরআন শরীফের কিছু ছেঁড়া পৃষ্ঠা, ছেঁড়া তসবির দানা। ধুলায় মাখা সাদা কুর্তা-পায়জামা। মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনের ব্যবহার্য কিছু জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারিদিকে।
ধ্বংসস্তূপের কিছু ইটের উপর ১৯০৬, ১৯০৯, ১৯১১ এবং ১৯১৩ সালের উল্লেখ রয়েছে। ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক স্থানীয় ব্যক্তিরা শুধু মসজিদের ধ্বংসস্তুপের চিহ্ন সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছে,এমনকি সেটা যদি পুরোনো ইটও হয়, তাও নিজের কাছে রেখে দিতে চান তারা।
স্থানীয়রা বলছেন, “ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অনেকগুলো কোরআন শরিফ ছিল। আমরা সেগুলো বাড়িতে নিয়ে গিয়েছি আর যেগুলো ছিঁড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে সেগুলো কবরস্থানে দাফন করেছি।”
মসজিদ ভাঙ্গার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে এটি সরকারী জমির ওপরে নির্মিত। তাই মেসজিদ ভেঙ্গে সরকারী জমি উদ্ধার করা হয়েছে। অথচ স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন দান করা জমিতে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল।
ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি জেলার নাম সাহারানপুর। সেই সাহারানপুরেই অবস্থি বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক দারুল উলুম দেওবন্ধ মাদরাসা। মাদরাসার কাছেই কালেক্টরেট কমপ্লেক্সের একটি শতবর্ষী মসজিদ ভেঙ্গে ধুলাই মিশিয়ে দিয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার।
দেওবন্দ মাদরাসার হাজার হাজার ছাত্র-শিক্ষকের চোখের সামনেই এভাবে মসজিদ ভেঙ্গে ধুলাই মিশিয়ে দিলেও মুখ থেকে একটা কথাও বের করেন নি কেউ। দেওবন্দের আকাবীররাও মসজিদ ভাঙ্গা নিয়ে কোন টু শব্দটি করারও সাহস পাননি।
কালেক্টরেট কমপ্লেক্সের ওই মসজিদ নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত উত্তর প্রদেশে বজরং দলের সাবেক আহ্বায়ক বিকাশ ত্যাগীর অভিযোগকে ঘিরে। মুসলিম পক্ষের দাবি যে এই মসজিদ একশো বছরেরও বেশি পুরোনো। দানের জমিতে নির্মিত। আবার প্রশাসনের দাবি, ওই মসজিদ সরকারি জমিতে অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে তাই এর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, মসজিদ কমিটি দাবি করেছে যে সেখানে যে মসজিদ ছিল সেটা ১০০ বছরেরও বেশি পুরানো। ওই জমি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ছিল এবং ওয়াকফ রেকর্ডেও তার উল্লেখ রয়েছে।
এই মামলার সঙ্গে যুক্ত প্রবীণ আইনজীবী পারভেজ জব্বারের কথায়, “দখলমুক্ত করার আদেশ ছিল, ভাঙার নয়। এত তাড়া কীসের ছিল যে শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর দিনই এই পদক্ষেপ নিতে হলো?”
গত বছর ২৪শে মার্চ, ‘দ্য উত্তর প্রদেশ পাবলিক প্রেমিসেস অ্যাক্ট’ বা ‘উত্তর প্রদেশ সরকারি প্রাঙ্গণ (অননুমোদিত দখলদারদের উচ্ছেদ) আইনের’ অধীনে সিটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।
দীর্ঘ শুনানির পর চলতি বছরের ১৭ই জুলাই সিটি ম্যাজিস্ট্রেট ওই মসজিদকে অবৈধ স্থাপনা বলে ঘোষণা করেন এবং জমি দখলমুক্ত করার আদেশ দেন।
মসজিদের পক্ষ থেকে এই আদেশের বিরুদ্ধে জেলা আদালতে পাল্টা মামলা দায়ের করা হয়। প্রায় দেড় মাস শুনানির পর, জেলা জজের আদালত গত ২ সেপ্টেম্বর সেই আবেদন খারিজ করে দেয় এবং সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশই বহাল রাখে। এরপরই উগ্র বিজেপি ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মসজিদ ভেঙ্গে ধুলায় মিশিয়ে দেয়।
দেওবন্দ মাদরাসার লাখো ইমানদারের চোখের সামনে এভাবে একটা মসজিদ ভেঙ্গে ধুলায় মিশিয়ে দিলেও কারো চেতনা নাড়া দেয়নি। তারা দেওবন্দের মতো একটি বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মসজিদটি রক্ষার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাতে পারতেন। সেটা না করলেও মসজিদ ভাঙ্গার পর অন্তত একটা নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতে পারতেন।
দেওবন্দীদের এই চেতনার নামই দেওবন্দীয়্যত। সেই দেওবন্দীয়্যত,কওমীয়্যত আর জমিয়তী চেতনার কারনেই উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সঙ্গে তাদের এতো দহরম-মহরম।
……………………………
এফ শাহজাহান
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
…………………………….

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com