আল্লাহর ঘোষণার বিরুদ্ধে আইনমন্ত্রীর পাল্টা বক্তব্য কুরআনের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ

Reporter Name
    সময় : রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ৬:৫২ অপরাহ্ণ
  • ৮৭ Time View
এফ শাহজাহান : 
মহাবিশ্বের মহান প্রতিপালক আল্লাহ সুবহানুহুওয়াতায়ালা স্পষ্ট করে ঘোষণা করছেন, “যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করে না, তারাই কাফির। যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা জালেম। যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা ফাসিক।” [সূরা আল-মায়েদা : ৪৪,৪৫ ও ৪৬ নম্বর আয়াত]
আল্লাহর এই নির্দেশ এবং সতর্কবার্তা অস্বীকার করে কুরআনের আইনের বিরুদ্ধে বিএনপির আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলছেন, সমাজ ও রাষ্ট্র সদা পরিবর্তনশীল। কিন্তু কুরআনের আয়াত পরিবর্তন করা যায় না। তাই সদা পরিবর্তনশীল সমাজ ও রাষ্ট্রের আইন বা সংবিধান হিসেবে কুরআন অকার্যকর, অপ্রাসঙ্গিক, অচল। নাউযুবিল্লাহ। আস্তাগফিরুল্লাহ।
২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানের লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড কর্তৃক প্রকাশিত মরহুম ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের মরণোত্তর স্মারকগ্রন্থ ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিক্স’-এর প্রকাশনা উৎসবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান প্রধান আলোচক হিসেবে এই বক্তব্য দেন।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান মাত্র ২ দিন অগে এই বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ মহান রব দেড় হাজার বছর আগে আইমনমন্ত্রীর এই বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়ে রেখেছেন-আল্লাহ সূরা আল মায়েদা- ৫০ নম্বর আয়াতে বলছেন-‘তবে কি তারা প্রাগ-ইসলামী বা জাহিলিয়্যাত যুগের বিচার-ব্যবস্থা পেতে চায় ? খাঁটি বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য বিচারে আল্লাহ অপেক্ষা আর কে শ্রেষ্ঠতর ?
আল্লাহর সুস্পষ্ট ঘোষণার বিরুদ্ধে এধরনের বক্তব্য প্রদানের ফলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সুস্পষ্ট কুফরী করেছেন। তিনি শুধু কাফিরই হননি, তিনি জালিম এবং ফাসিক হয়ে গেছেন। এটা বলে তিনি প্রকাশ্যে কবীরা গুনাহ করেছেন। তিনি ধর্মচ্যুত নাফরমান হয়ে গেছেন।
যে সমস্ত শাসক,মন্ত্রী,এমপি,বিচারক সজ্ঞানে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের বিধানকে উপেক্ষা করে নিজের পক্ষ থেকে মনগড়া বিধান তৈরি করে দেশ পরিচালনা করছে, তারা কাফির, তাদের বিপক্ষে জিহাদ করা আবশ্যক।
[ মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনি উছাইমীন, ২/১১৮ পৃ.; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১২৮৪৫৩]।
বিচারব্যবস্থা আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক প্রদত্ত বিধান অনুযায়েই পরিচালিত হতে হবে। এটা শরী‘আতের নির্দেশ। এই বিধানকে উপেক্ষা করে মানবরচিত আইন প্রতিষ্ঠিত করা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত ।
[ উছাইমীন, লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, ৬/৩৩ পৃ.; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১১২১৪৪]।
কুরআনের বিধি-বিধান অমান্যকারীদের সম্পর্কে আল্লাহর এই সুস্পষ্ট ঘোষণাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে আপনাকে এর সাতটি পর্যায় গভীরভাবে বুঝতে হবে। সেগুলো হলো-
প্রথমত : যে শাসক,এমপি,মন্ত্রী বা বিচারক বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্ তা‘আলার বিধান বর্তমান যুগে বিচার কার্য পরিচালনার জন্য কোনভাবেই উপযোগী নয় তা হলে সে কাফির। এ ব্যাপারে সকল মুসলিমের ঐকমত্য রয়েছে। কারণ, সে আল্লাহ্ তা‘আলার বিধানকে অস্বীকার করেছে যা নিশ্চিত কুফরি।
দ্বিতীয়ত : যে শাসক,এমপি,মন্ত্রী বা বিচারক বিশ্বাস করে যে, মানব রচিত বিধানই বর্তমান যুগে বিচার কার্য পরিচালনার জন্য অত্যন্ত উপযোগী; আল্লাহ্ তা‘আলার বিধান নয়, চাই তা সর্ব বিষয়েই হোক অথবা শুধুমাত্র নব উদ্ভাবিত বিষয়াবলীতে, তা হলে সেও কাফির। এ ব্যাপারেও সকল মুসলিমের ঐকমত্য রয়েছে। কারণ, সে মানব রচিত বিধানকে আল্লাহ্ তা’লার বিধানের উপর প্রাধান্য দিয়েছে, যা কুফরি।
তৃতীয়ত : যে শাসক,এমপি,মন্ত্রী বা বিচারক বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্ তা‘আলার বিধান যেমন বর্তমান যুগে বিচার কার্য পরিচালনার জন্য উপযোগী তেমনিভাবে মানব রচিত বিধানও, তা হলে সেও কাফির। কারণ, সে সৃষ্টিকে স্রষ্টার সমপর্যায়ে দাঁড় করিয়েছে যা শির্ক তথা কুফরিও বটে।
চতুর্থত : যে শাসক,এমপি,মন্ত্রী বা বিচারক বিশ্বাস করে যে, বর্তমান যুগে আল্লাহ্ তা‘আলার বিধানের আলোকে যেভাবে বিচার কার্য পরিচালনা করা সম্ভব তেমনিভাবে মানব রচিত যে কোন বিধানের আলোকেও বিচার কার্য পরিচালনা করা সম্ভব তা হলে সেও কাফির। যদিও সে এ কথা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্ তা‘আলার বিধানই সর্বোত্তম। কারণ, সে নিশ্চিত হারাম বস্ত্তকে হালাল মনে করছে। যা কুফরিরই অন্তর্গত।
পঞ্চমত : যে শাসক,এমপি,মন্ত্রী বা বিচারক মনে করে যে, বর্তমান যুগের শরীয়ত বিরোধী আদালতসমূহই মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থল; ইসলামী শরীয়ত নয় তা হলে সেও কাফির। কারণ, সেও নিশ্চিত হারাম বস্ত্তকে হালাল মনে করছে। যা কুফরিরই অন্তর্গত।
ষষ্ঠত : যে,চেয়ারম্যান-মেম্বার বা গ্রাম্য মোড়ল মনে করে যে, তার এ অভিজ্ঞতালব্ধ বিচারই মানুষের সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় তা হলে সেও কাফির। কারণ, সেও নিশ্চিত হারাম বস্ত্তকে হালাল মনে করছে। যা কুফরিরই অন্তর্গত।
সপ্তমত : যে শাসক,এমপি,মন্ত্রী বা বিচারক মনে করে যে, আল্লাহ্ তা‘আলার বিধানই বিচারের ক্ষেত্রে একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিধান; অন্য কোন মানব রচিত বিধান নয়। এর পরও সে মানব রচিত কোন বিধানের আলোকে বিচার কার্য পরিচালনা করে যাচ্ছে এবং সে এও মনে করছে যে, আমার এ কর্ম নীতি কখনোই ঠিক হতে পারে না তা হলে সেও বড় পাপী। কারণ, সে নিজ স্বার্থ বা প্রবৃত্তি পূজারী। তবে সে কাফির নয়।
আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্য কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত বক্তব্য নয়। এটি তার দলীয় বক্তব্য। কারণ দল হিসেবে বিএনপি সুস্পষ্টভাবে শরীয়াহ বিরোধী। তারা স্পষ্ট করে বার বার বলে আসছেন যে,তারা ইসলামী শরীয়াহ মানেন না।
সম্প্রতি বিএনপি জাতীয় সংসদে হেবা সংক্রান্ত কুরআন বিরোধী আইন পাশ করার মাধ্যমে স্পষ্টতই কুরআন এবং ইসলামী শরীয়াহর বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।
কাজেই আইন মন্ত্রীর এই বক্তব্য যারা সমর্থন করবেন তারাও কাফির,জালিম এবং ফাসিক। যারা এই বক্তব্যে শোনা এবং বুঝার পরও প্রতিবাদ করবেন না, তারাও কাফির,জালিম এবং ফাসিক।
সূরা মায়েদার ৪৪.৪৫ এবং ৪৬ নম্বর আয়াত মূলত রাজনীতিবিদদের জন্যই আল্লাহপাক নাযিল করেছেন। এই আয়াতে আল্লাহ খুবই স্পষ্ট করে সংসদ সদস্য তথা আইন প্রনয়নকারী, আইনমন্ত্রী, বিচারক ও শাসকদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা ঘোষণা করে বলেছেন যে, তারা যেন ব্যক্তিগত স্বার্থ বা প্রবৃত্তি ত্যাগ করে সর্বদা ন্যায়বিচার ও আল্লাহর নির্দেশিত আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন। যদি তা না থাকেন,তাহলে তরা কাফির,জালিম এবং ফাসিক হয়ে যাবেন।
ইসলামিক স্কলার ও মুফাসসিরগণের মতে, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রধানত দুটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।
(১) যে ব্যক্তি বা শাসক আল্লাহর বিধানকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকার করে, অকার্যকর বলে মনে করে, কিংবা মানব রচিত আইনকে আল্লাহর আইনের চেয়ে শ্রেয় বা সমান বলে বিশ্বাস করে বিচার করে, সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে কাফির হয়ে যায়। এটাকে তারা ‘কুফরে আকবর’ তথা সবচেয়ে বড় কুফরী বলেছেন।
(২) যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধানের সত্যতা ও শ্রেষ্ঠত্ব মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, কিন্তু লোভ, প্রবৃত্তি, ভীতি বা ব্যক্তিগত কারণে আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্য কোনো বিধান অনুযায়ী বিচার করে, সে পূর্ণ ঈমান হারা না হয়ে ‘আমলী কাফির’ বা ফাসিক-জালিম হিসেবে গণ্য হয়। এটা ইবনে আব্বাস রা.-এর মতামত।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে আল্লাহ একই অপরাধে পরপর ৩বার ৩ রকমের কথা বললেন কেনো ? অর্থাৎ-
আল্লাহ প্রথমে বললেন তারা কাফির,
তারপর বললেন তারা জালিম এবং
শেষে বললেন তারা ফাসিক।
(ক) কাফির হওয়ার ব্যখ্যা :
এর সহজ সরল ব্যাখ্যা হচ্ছে, বিচার করার সময় সকল সাক্ষ্য প্রমাণাদির ভিত্তিতে যে দোষী সাব্যস্ত হয়, কিন্তু বিচারক তাকে শরিয়াসম্মত শাস্তি না দিয়ে মানবরচিত আইন ও সংবিধান অনুযায়ী অন্য কোনো শাস্তি দেয় অথবা জেল-জরিমানা করে। আবার সেই বিচারক এ কথা বলে যে, আমরা এ ধরনের অপরাধের জন্য এমন শাস্তিই দিয়ে থাকি।অর্থাৎ এ অপরাধের জন্য এটাই আমাদের শাস্তির নির্ধারিত ও চূড়ান্ত বিধান তাহলে এতে সে আল্লাহর সীমা অতিক্রম করে ফেলায় পরিপূর্ণরূপে কাফির সাব্যস্ত হবে।
(খ) জালিম হওয়ার ব্যাখ্যা
এর উদাহরণও একই। তবে পার্থক্য হলো, এই বিচারক আল্লাহর বিধান মানে এবং ব্যভিচারের শাস্তির ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানকে অস্বীকারও করে না। কিন্তু সে বিচারের সময় শরিয়া-নির্ধারিত শাস্তি প্রদান করে না। কারণ, তার রাজনৈতিক আদর্শ, রাষ্ট্রের সংবিধান,তার রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা,রাষ্ট্রের আইন কুরআনের আইনের পরিপন্থী। তাই তিনি এখানে তার পদমর্যাদা হারানোর ভয়ে বা রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন বিরোধী কাজ মনে করে কুরআনে বর্নিত শাস্তি প্রয়োগ করেন না বা কুরআনের আইন অনুযায়ী বিচারের রায় দেন না। তাহলে এমন বিচারক জালিম হিসাবে বিবেচিত হবে।
(গ) ফাসিক হওয়ার ব্যাখ্যা
তার উদাহরণ হলো, সে শরিয়া অনুযায়ী বিচার করে ঠিকই, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে নিজের সুবিধার জন্য অথবা ভয়ের কারণে সে এমন কিছু অপকৌশল অবলম্বন করে, যাতে নির্ধারিত শাস্তি বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত থাকা যায়।তাহলে এমন বিচারক ফাসিক বলে বিবেচিত হবে।
আইন মন্ত্রীর কথাকে আপাতদৃষ্ঠিতে খুবই নিরীহ মনে হতে পারে। কিন্তু তার বক্তব্যের মূল সুর হচ্ছে সময়ের প্রেক্ষাপটে কুরআন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। অর্থাৎ কুরআন পুরনো হয়ে গেছে (নাউযুবিল্লাহ)। আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় কুরআনের বিধানের কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই (নাউযুবিল্লাহ)।
তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন মানুষের চাহিদা,প্রয়োজন সবই পরিবর্তনশীল। দেড় হাজার বছরের আগের সেই কুরআনের আয়াত যেহেতু পরিবর্তন করা যাবে না,সেহেতু পরিবর্তনশীল সমাজ ও রাষ্ট্রের বিধান প্রনয়নের জন্য কুরআন এখন আর উপযুক্ত নয়।
অথচ পৃথিবীর ইতিহাস কোরআনই একমাত্র আসমানী কিতাব যার হুকুম কিয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে। এবং কিয়ামত পর্যন্ত সকল যুগের চাহিদা অনুযায়ী কোরআন প্রাসঙ্গিক থাকবে। কেয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ট আইন,সংবিধান এবং বিচার ফায়সালার জন্য কুরআনকেই ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
যারা এটা করবে না, তারাই কাফির, তারাই জালিম এবং তারাই ফাসিক।
এতে কোনই সন্দেহ নাই।
এটা জানার পরও যারা কুরআনের বিধি-বিধান অস্বীকারকারীদের
ভোট দিবেন, তারাও কাফির, জালিম এবং ফাসিক হয়ে যাবেন।
…………………………………………….
এফ শাহজাহান
ক্রাইসিস অ্যানালাইসিস
২০সেপ্টেম্বর ২০২৬
…………………………………………….

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©  doiniksatmatha.com